হালাল সনদ ও খাদ্যনিরাপত্তা

হালাল সনদ ও খাদ্যনিরাপত্তা

আমাদের হালাল খাবারের ভাবনা মোটামুটি দুটি বিষয়কেন্দ্রিক : পশুটি নিয়ম মেনে জবাই হয়েছে কি না, আর খাবারে শূকরের মাংস বা অ্যালকোহল আছে কি না। এর বাইরে আমরা খুব একটা প্রশ্ন করি না।

অথচ দেশে খাবারের মানের চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যের ১ হাজার ৭১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৫৭১টিতে, অর্থাৎ প্রতি তিনটির একটিতে, সমস্যা ধরা পড়ে : কোনোটিতে ভেজাল, কোনোটিতে দূষণ, কোনোটির পুষ্টিমান নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম। নমুনাগুলো ঝুঁকি বিবেচনায় বাছাই করা হয়েছিল বলে এ হার দেশের সব খাবারের চিত্র নয়; তবে নিঃসন্দেহে এটি একটি সতর্কসংকেত।

বিজ্ঞাপন

হলুদের কথা ধরা যাক। গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন, রঙ আরো উজ্জ্বল দেখাতে শুকনো হলুদ পালিশ করার সময় তাতে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সিসাযুক্ত রঞ্জক লেড ক্রোমেট মেশানো হতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিসার কোনো মাত্রাই নিরাপদ নয়।

আশার কথা, হলুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বদলেছে। পরবর্তী এক গবেষণায় দেখা গেছে, গণমাধ্যমে প্রচার, ব্যবসায়ীদের সচেতন করা এবং বিএফএসএর অভিযান ও জরিমানার ফলে দেশের সবচেয়ে বড় হলুদের পাইকারি বাজারে শনাক্তযোগ্য মাত্রায় সিসাযুক্ত নমুনার হার ২০১৯ সালের ৪৭ থেকে ২০২১ সালে শূন্যে নেমে আসে। এতে বোঝা যায়, কঠোর প্রয়োগে ফল মেলে; কিন্তু নজরদারি ঢিলে হলে বিপদ আবার ফিরে আসতে পারে।

হলুদে সাফল্য এলেও সিসার বিপদ এখনো কতটা ঘরের কাছে, তা বোঝা যায় চলতি বছর প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫-এ। এতে দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশের প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যগত হস্তক্ষেপের আন্তর্জাতিক সীমা। ঢাকা বিভাগে এ হার ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি তিন শিশুর প্রায় দুজন।

সমস্যা শুধু সিসায় সীমাবদ্ধ নয়। ভেজালবিরোধী অভিযান আর নানা গবেষণায় খাবারে পাওয়া গেছে কীটনাশক ও অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও রঙ, এমনকি ক্রোমিয়ামের দূষণ। যে জিলাপি আমাদের অনেকের পছন্দ, বিভিন্ন জেলায় নজরদারিতে তাতেও ‘হাইড্রোজ’ মেশানোর ঘটনা ধরা পড়েছে। হাইড্রোজ আসলে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, যা বস্ত্রসহ বিভিন্ন শিল্পে রঙ হালকা বা সাদা করতে ব্যবহৃত হয়।

এসবের খেসারত দিচ্ছে দেশের মানুষ। পদার্থ, মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের ধরনভেদে এসব দূষক স্নায়ুতন্ত্র ও কিডনির ক্ষতি করতে পারে, কিছু ক্ষেত্রে বাড়াতে পারে ক্যানসারের ঝুঁকিও। সবচেয়ে বড় খেসারত দিচ্ছে শিশুরা; তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপর এর প্রভাব হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন হলো, পশু নিয়ম মেনে জবাই হয়েছে কিংবা শূকরের মাংস বা অ্যালকোহল নেই বলেই কি স্পষ্টত ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত কোনো খাবার হালাল হতে পারে?

পবিত্র কোরআন খাবারের ক্ষেত্রে শুধু হালাল হওয়াকে যথেষ্ট বলেনি, তাইয়্যিব হওয়ার শর্তও দিয়েছে। সুরা বাকারার ১৬৮, সুরা মায়েদার ৮৮ ও সুরা নাহলের ১১৪ নম্বর আয়াতে ‘হালালান তাইয়্যিবান’, অর্থাৎ বৈধ ও কল্যাণকর খাবারের কথা বলা হয়েছে। এ দুটি গুণ একটি আরেকটির বিকল্প নয়; দুটিই একসঙ্গে থাকতে হবে। সমকালীন গবেষণা ও হালাল মানদণ্ডে ‘তাইয়্যিব’ ধারণাকে পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধতা, নিরাপত্তা, গুণগত মান ও পুষ্টিগুণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ইসলামি আইনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষতি না করার নীতি; নিজের বা অন্যের ক্ষতি করা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। জীবন, বুদ্ধি ও প্রজন্মের সুরক্ষা শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্যগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ১৯৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’

মহানবী (সা.) একবার বাজারে খাদ্যশস্যের একটি স্তূপে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন, ওপরটা শুকনো হলেও ভেতরটা ভেজা। তিনি বললেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ ভেজা শস্য আড়াল করাকেও যেখানে প্রতারণা বলা হয়েছে, সেখানে আজকের ভেজাল, দূষণ ও ত্রুটি গোপন করাকে কীভাবে দেখা উচিত, তা বোঝা কঠিন নয়।

অবশ্য সবকিছুকে এক পাল্লায় মাপা যাবে না। কোন পদার্থ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, কী মাত্রায় আছে, কতদিন ধরে শরীরে যাচ্ছে এবং কে খাচ্ছে, এসব বিবেচনায় নিয়েই বিচার করতে হবে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রমাণে যখন দেখা যায়, কোনো পণ্য উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করছে কিংবা তাতে দূষণ নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে, তখন সেটিকে হালাল বলার সুযোগ থাকে না; হালাল সনদ বা বাজারে বিক্রির ছাড়পত্রও তার প্রাপ্য নয়।

ওআইসির অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান ইসলামি দেশগুলোর মান ও মাপবিদ্যা ইনস্টিটিউট (এসএমআইআইসি) স্পষ্ট করে বলেছে, অনিরাপদ খাবার হালাল হতে পারে না।

দেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ২০০৭ সাল থেকে হালাল সনদ দিয়ে আসছে। সংস্থাটির ২০২৩ সালের সনদ নীতিমালায় পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি ও আকস্মিক পরিদর্শনের বিধানও রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এসএমআইআইসির মান অনুসরণ করে ২০২২ সালে নিজস্ব হালাল সনদ দেওয়া শুরু করে। ২০২৫ সালে সংস্থাটি জাতীয় হালাল ল্যাবরেটরি চালু করে, যেখানে পিসিআর প্রযুক্তিতে শূকরের ডিএনএ শনাক্ত করা যায়। আর নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব বিএফএসএর। দেশের স্বীকৃত পরীক্ষাগারগুলোতে কিছু ভারী ধাতু, কীটনাশক ও পশুপাখির ওষুধের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার ব্যবস্থাও আছে।

দায়িত্বের প্রশ্নেও সম্প্রতি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এসেছে। গত ২৩ আগস্ট সরকারের কার্যবিধিমালা (রুলস অব বিজনেস) সংশোধন করে হালাল মান ও সনদসংক্রান্ত বিষয় ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধিতে যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বিএসটিআই, বিএফএসএ ও পরীক্ষাগারগুলোর ভূমিকা কীভাবে একসূত্রে গাঁথা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে বর্তমান অবস্থার জন্য শুধু নিয়মকানুনের অভাব নয়, বিদ্যমান বিধানের ফাঁক, দায়িত্বের অস্পষ্টতা, সমন্বয়হীনতা, কারিগরি সীমাবদ্ধতা আর দুর্বল প্রয়োগও দায়ী। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দরকার একটি সমন্বিত জাতীয় হালাল নিশ্চয়তা কাঠামো, যেখানে সনদসংক্রান্ত সব কাজ হবে এক ছাদের নিচে। হালাল সনদকে হতে হবে এমন ভরসার প্রতীক, যা দেখে ক্রেতা চোখ বুজে বিশ্বাস করতে পারেন, পণ্যটি হালাল ও স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা, এমনকি রেস্তোরাঁ পর্যন্ত খাদ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিটি ব্যবসার জন্য এমন সনদ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। সনদ পেতে হলে হালালের শর্ত পূরণের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তার মানদণ্ডেও উত্তীর্ণ হতে হবে, পুষ্টি ও ঝুঁকিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে হবে এবং অভিন্ন ডিজিটাল নিবন্ধন তালিকায় নাম তুলতে হবে।

এমন কাঠামোকে বিশ্বাসযোগ্য করতে ন্যূনতম তিনটি কাজ জরুরি। প্রথমত, দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। সনদপ্রক্রিয়ায় আলেমদের পাশাপাশি খাদ্যবিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত নিরীক্ষকদের যুক্ত করতে হবে, যাতে ধর্মীয় বিচার-বিবেচনা আর পরীক্ষাগারের প্রমাণ একই ভাষায় কথা বলে।

দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এমন পরীক্ষাব্যবস্থা দরকার, যা শূকরের মাংস বা অন্য নিষিদ্ধ উপাদানের পাশাপাশি ভারী ধাতু, কীটনাশক, পশুপাখির ওষুধের অবশিষ্টাংশ ও নিষিদ্ধ রঙও শনাক্ত করতে পারে।

তৃতীয়ত, কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একবার সনদ দিয়ে দায় সারলে চলবে না। দরকার নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি, ঝুঁকিভিত্তিক পরীক্ষা, বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে পণ্যের উৎস শনাক্তের ব্যবস্থা।

যাচাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে ভোক্তার হাতেও। পণ্যের মোড়কে আর রেস্তোরাঁর প্রবেশপথে কিউআর কোড থাকলে ক্রেতা মুঠোফোনে স্ক্যান করে সনদ ও এর পেছনের পরীক্ষার ফলের অর্থ দেখে নিতে পারবেন। প্যাকেটজাত পণ্যে হালাল চিহ্নের পাশাপাশি সহজবোধ্য পুষ্টিমান রেটিংও থাকা উচিত। এসব বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের বিশাল আলেমসমাজকে যুক্ত করা যেতে পারে।

এমন ব্যবস্থার পক্ষে অর্থনৈতিক যুক্তিও আছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি গত জুলাইয়ে জানান, ২০২৫ সালে হালাল পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলারের; অথচ বাংলাদেশের হালাল পণ্য রপ্তানি মাত্র ৮৫ কোটি ডলারের। তবে বিদেশি ক্রেতার আগে নিজেদের হালাল সনদব্যবস্থার ওপর দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। পরীক্ষাগারের প্রমাণনির্ভর কঠোর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে ‘হালাল সার্টিফায়েড ইন বাংলাদেশ’ কথাটি হয়ে উঠতে পারে হালাল ও মানসম্মত পণ্যের গ্রহণযোগ্য নিশ্চয়তা।

লেখক: মালয়েশিয়ার ইনসেইফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফেলো

ই-মেইল: mezbah.u.ahmed@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন