সিলেক্টিভ প্রতিবাদ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প

কাকন রেজা

সিলেক্টিভ প্রতিবাদ এবং পুনর্বাসন প্রকল্প
ছবি: সংগৃহীত

নাদিম মাহমুদ নামের একজনের লেখা আমার নিউজ-ফিডে এলো। খুব অপরিচিত নন। তার ওপর ওনার নামের আগে ‘ড’-এর নিচে ‘ডট’ আছে। অর্থাৎ ডক্টরেট। যেখানে মেহেদী হকের আঁকা নাহিদ ইসলামের কার্টুন নিয়ে কথা বলছিলেন তিনি। সেখানে কথা বলতে গিয়ে বাকস্বাধীনতার বিষয়ে আলাপ তুললেন। বললেন, যারা এত দিন বাকস্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছে তারা মেহেদী হকের কার্টুনের বিরুদ্ধচারণ করছে। নাদিম মাহমুদ নয়, এমন কথা বেশ কয়েকজনই বলছেন এবং তারা সবাই বিগত রেজিমের সুবিধাভোগী।

আজব আলাপ। বাকস্বাধীনতার মানে কী? কার্টুন এঁকে যেমন সমালোচনা করা যায়, নিন্দা করা যায়। তেমনি সেই কার্টুন নিয়ে সমালোচনা, নিন্দা করা যায়। এটাই বাকস্বাধীনতা। মেহেদি হক জুলাইয়ে বসে জুলাইয়ের শহীদ আবু সাঈদ নিয়েও কার্টুন এঁকেছেন। সেই কার্টুনে জুলাইকে তিনি ভয়ংকর রূপে উপস্থাপন করেছেন। এটি বরং ধৃষ্টতা। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে এদেশের সব দল-মতের মানুষ ফ্যাসিস্ট রেজিমের বিরুদ্ধে একাট্টা হয়েছিল। গত ১৬ জুলাইয়ে ১৫টির অধিক ছাত্র সংগঠনের যে বক্তব্য, তাতেও প্রমাণ হয়েছে, মত-পথ যাই হোক আজ পর্যন্ত তারা বিগত রেজিমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। সুতরাং একটা ফ্যাসিস্ট বলে জনস্বীকৃত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর পক্ষে মেহেদি হকের এহেন কর্মকাণ্ড জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করতেই পারে। নাদিম মাহমুদ, মাহবুব আজীজ, পান্না, আনিস আলমগীরদের যেমন ফ্যাসিজমের আইকন আক্রান্ত হলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তেমন ক্ষোভ তো জুলাইয়ের পক্ষের মানুষদেরও থাকতে পারে। সুতরাং মেহেদি হকের কাজের সমালোচনা হতেই পারে। মানুষের ক্ষোভও থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নাদিম মাহমুদের টাইম-লাইনে উঁকি দিলাম। বুঝলাম উনি ফ্যাসিস্ট রেজিমের সফট-পাওয়ার। উনি জুলাইকে দেখেন ছুরি হিসেবে। তার কথায় জুলাই সমাজ ও রাষ্ট্রটাকে কয়েক খণ্ড করে দিয়েছে। এই আলাপকে কী বলবেন, ছাগলামো, না বাকশালীয় চিন্তা? অর্থাৎ তার চিন্তায় সবাইকে একপন্থি হতে হবে এবং সেটি দিল্লিপন্থি (যা তিনি উহ্য রেখেছেন)। জুলাই এসেছেই তো বহুমতকে প্রতিষ্ঠা করতে। জুলাইয়ের কারণেই আজ সংসদে বিতর্ক হয়, মমতাজের গান হয় না। নূরের কবিতা হয় না। বিতর্কের মধ্য দিয়েই সত্যটা উঠে আসে। কোরআনে খোদ খোদাতায়ালাই বলেছেন, কোরআনকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করতে। যেখানে খোদা তাঁর ঐশী বাণীকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে নিরুৎসাহিত করছেন, সেখানে এই অজ্ঞরা একটি দলীয় মতের অন্ধ অনুসরণ করছে। বিপরীতে আবার তারাই নিজেদের প্রগতিশীল বলে! কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!

এটি একটা মাত্র কেসস্টাডি এবং তাও আবার সংক্ষিপ্ত। এ ধরনের ‘চিন্তক’ যদিও ‘চিন্তক; বলে কোনো শব্দ বাংলায় নেই। যেমন নেই এসব ‘চিন্তক’দের চিন্তার সারবত্তা। কেন নেই বলি, ওনার টাইম লাইনে ‍উনি আফসোস করেছেন, বিশেষপন্থি (দিল্লিপন্থি) শিক্ষকদের নিয়ে। এ নিয়ে তার আবার একটা ‘টকশো’ও রয়েছে পান্না’র সঙ্গে। না, এতে আপত্তি নেই। কেউ যদি অকারণে প্রতিহিংসার শিকার হন, তাহলে সেটি অন্যায়। এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিত, জায়েজ। কিন্তু যদি সেই প্রতিবাদ সিলেকটিভ হয়, তাহলে নাজায়েজ। নাদিম সাহেবের এই প্রতিবাদ নাজায়েজ। কারণ তিনি, বিগত রেজিমে শিক্ষকদের সঙ্গে যে অবিচার, অন্যায় হয়েছে তার প্রতিবাদ করেননি। সে অর্থেই তার বর্তমান প্রতিবাদ সিলেকটিভ এবং সে কারণেই তা নাজায়েজ। জানি, আমার এই ‘জায়েজ-নাজায়েজ’ শব্দ নিয়েও কথা হবে। এখানেও সাম্প্রদায়িকতা খোঁজা হবে। বলা হবে, বাংলা শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। করা হয়েছে ইসলামি পরিভাষা থেকে নেওয়া শব্দ। অবশ্য এরা বাংলা শব্দ সম্পর্কেও সামান্য ধারণা রাখে না। সুতরাং অজ্ঞরা সাম্প্রদায়িকতা খুঁজুক এবং বলুক।

বহু পথ ও মত নিয়েই গণতান্ত্রিক সমাজ। জানি, এখানেও অনেকে প্রশ্ন তুলবেন, তাহলে আওয়ামী লীগের পথ ও মত অনুপস্থিত থাকবে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর জানিয়েছেন বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জার্মানি। এ বিষয়ে আওয়ামীপন্থি পোর্টাল বিডিনিউজে ২৫ সালের ৫ মে নাৎসি পার্টি কেন এবং কীভাবে নিষিদ্ধ হয়েছিল, তা নিয়ে নিজস্ব বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছিল। লিখেছিলেন সাঈদ ইফতেখার আহমেদ। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হিসেবে লেখক বলেছিলেন, নাৎসিবাদ ছিল বর্ণবাদ, ঘৃণা, সামরিকতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের চরম সমন্বয়। প্রশ্ন হলো, বিগত ফ্যাসিস্ট রেজিম এর কোনোটাকে ধারণ করেনি। বর্ণবাদের কথা বলতে গেলে, ফ্যাসিস্ট রেজিমে এক পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক সমাবেশে দেওয়া ভাষণের কথা মনে পড়ে যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা যাবে না। যারা বিরোধী তারা চুপচাপ থাকবে, মুখবন্ধ করে থাকবে। না হলে হাত ভেঙে দেওয়া হবে, নয়তো জেলে ঢোকানো হবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বক্তব্য এখনো ঘুরছে। সুতরাং, ফ্যাসিস্ট ও তার সমর্থকরা সবাইকে সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গের মানুষ মনে করত। আর ঘৃণার কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কী পরিমাণ ঘৃণা যে সেই ফ্যাসিস্ট রেজিম উৎপাদন করেছে, তা তাদের সুপ্রিমোর প্রতিটি কথা থেকেই বোঝা যায়। সেই ঘৃণা উৎপাদন করতে গিয়েই তার মতবিরুদ্ধ সবাইকে রাজাকার বলেছিলেন তিনি এবং সে কথাই বিপ্লবের বারুদে স্ফুলিঙ্গ হয়ে দেখা দিয়েছিল। সামরিকতন্ত্র বলতে, সব বাহিনীকে ফ্যাসিস্ট রেজিম নিজেদের মতো ব্যবহার করেছে তাদের সময়ে। গুম-খুন, নির্যাতন, হামলাÑসবকিছুতেই সব বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। আর একনায়কতন্ত্র নিয়ে তো কথাই নেই। ‘আমি ষোলো কোটি লোককে খাওয়াই’, এই সংলাপের পর একনায়কন্ত্র বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। সবকিছুতেই আমি, এই আমিত্বই ছিল ফ্যাসিস্ট রেজিমের মূলমন্ত্র। অনুগত না হলে শাস্তি অবধারিত। সুতরাং তাদের এসব অবদান কীভাবে অস্বীকার করবেন!

গণহত্যার শিকার মানুষের সংখ্যা জার্মানিতে বেশি। হলোকাস্টের কথা বিশ্ব জানে। কিন্তু সাভারের আশুলিয়ায়ও কিন্তু হলোকাস্টের একটি নমুনা দেখা গিয়েছে চব্বিশের জুলাইয়ে। মৃত এবং আহত অবস্থায় তরুণ বিপ্লবীদের দেহ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল দেড় দশক চেপে বসা সেই ফ্যাসিস্ট রেজিম। নির্যাতিতদের সংখ্যা ছিল অগণিত। বিরোধীদের হত্যা-নির্যাতন গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে শিল্পে পরিণত হয়েছিল। সুতরাং নাৎসি পার্টি যে কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে কারণ চিন্তা করলেই কেন পথ ও মতের নরম আলাপে ফ্যাসিজমের পুনর্বাসন সম্ভব নয়, তা বোঝা যায়। সুতরাং পুনর্বাসনের সব আলাপ যে অসার তা জার্মানি ১৯৪৫ সালেই জানিয়ে দিয়েছে। শুধু জার্মানি নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই ফ্যাসিস্ট রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে আইন করে।

মেহেদি হক যে কাজটি করছেন, তা মূলত আইনবিরুদ্ধ। আনিস আলমগীর, পান্না, আজীজ, শাওনরা যা করছেন তাও বর্তমান আইন স্বীকৃত নয়। যেমন : স্বীকৃত নয় বাংলাদেশে আইসিস বা আল-কায়েদার কার্যকলাপ। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টের ধারায় তেমনিভাবে ফ্যাসিজমের পক্ষে মত উৎপাদনও আইনস্বীকৃত নয়। জাতিসংঘ যেভাবে আইসিস বা অন্যান্য উগ্রবাদী সংগঠনকে মানবাধিকারবিরোধী বলেছে, গত ফ্যাসিস্ট রেজিমের নিয়ন্ত্রকদের একইভাবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব সংস্থাটি। জাতিসংঘের ফ্যাক্টস-ফাইন্ডিংয়ে বিষয়টি জলবৎ তরলং। এদিকে যারা পুনর্বাসনের আলাপে নিশ্চুপ আছেন, তাদেরও দায় কম নয়। তাদের দায় বরং বেশি। সুতরাং যারা যা করছেন, সবই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করেই করা উচিত।

লেখক : কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন