সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব

ড. ইউসুফ জারিফ

সিভিল সোসাইটি ও আমলাতন্ত্রের দ্বন্দ্ব

আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের কয়েকটি বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখা জরুরি, না হলে তারা কার্যকর নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হবেন। রাজনীতিবিদদের ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তঃসংযোগ সম্পর্কে খুব স্বচ্ছ জ্ঞান রাখা প্রয়োজন। ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে আমরা যে অস্থিরতা এবং ভঙ্গুরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, সম্ভবত এটি এ জন্য যে, আমরা বাগাড়ম্বরের বাইরে প্রকৃত জ্ঞানী ও ধী-শক্তি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ তেমন একটা পাইনি। আমাদের রাজনীতিবিদরা অন্য অনেক বিষয়ের মতো আমলাতন্ত্র বিষয়েও গভীরে যান না। আমলা বলতে তারা একদল অনুগত (দলীয় রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত) কর্মী বুঝেন, যারা কোনো প্রশ্ন বা বিশ্লেষণ ছাড়া তাদের হুকুম তামিল করবেন। সেটি রাষ্ট্র বা জনগণের জন্য ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন। আমলাতন্ত্র বলতে তারা রাষ্ট্রের নীতি-পদ্ধতি-শাসনব্যবস্থা-অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ও দক্ষ কোনো পেশাদার শ্রেণির চিত্র কল্পনা করতে পারেন না।

১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হলো, তখন বল্লভ ভাই প্যাটেলের মতো নেতৃত্ব ভারতকে অখণ্ড রাখার স্বার্থে পেশাদার আমলাতন্ত্র গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং সেই আলোকে ভারত সরকার আমলাতন্ত্রকে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমরা যখন স্বাধীন হলাম, তখন আমলাতন্ত্রে ‘আমার লোক’ খোঁজা শুরু হলো। আমলাতন্ত্রে পেশাদারিত্ব, পেশার সম্মান, দেশ গড়ার সুযোগ-এসব বৈশিষ্ট্য অবসানে যা করার প্রয়োজন, আমরা তার সব করলাম। মনে হয় একটি নতুন দেশ নিজেকে ধ্বংস করার সব আয়োজন শেষ করে ফেলে। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা আমলাতন্ত্র এবং নির্বাচনব্যবস্থা, দুটোরই, একটা মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিলাম। যার দায় আজও বহন করছি। ভারত ১৯৫১-৫২ সালে সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি মানদণ্ড তৈরি করে, যার সুফল ভারতীয় জনগণ আজও, এমনকি বিজেপি শাসনামলেও, পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কেন পাশ্চাত্য সুবিধাভোগী সিভিল সোসাইটি সবসময় আমলাতন্ত্রের বিরোধিতা করে এ নিয়ে আমাদের নির্মোহ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এই রাজনৈতিক-অর্থনীতি বোঝার ওপর আমাদের রাজনীতি ও দেশের গতি-প্রকৃতি অনেকটা নির্ভরশীল।

আমলাতন্ত্র বিষয়ে বাংলাদেশে মানসম্পন্ন গবেষণায় সাহিত্য নেই বললেই চলে। রাষ্ট্র নির্মাণে একটি পেশাদার ও সুষ্ঠু আমলাতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা গবেষণা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা অনেকে, এমনকি পেশাগত বিদ্বেষ থেকে আমলাতন্ত্রের দোষত্রুটি নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু কী কারণে বাংলাদেশে আমলাতন্ত্র একটি মানসম্পন্ন পেশা হিসেবে গড়ে উঠতে পারল না, সে বিষয়ে কোনো নির্মোহ আলোচনা বা গবেষণা দেখা যায় না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমলাতন্ত্রের ভেতর থেকেও তেমন কোনো জোরালো আলোচনা আসেনি। ফলে জনগণ আমলাতন্ত্র নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে থেকেছে। রাজনীতিবিদদের অজ্ঞতা, জনগণের বিভ্রান্তি এবং আমলাদের হীনম্মন্যতার সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্যের আজ্ঞাবহ ও কলোনাইজড সিভিল সোসাইটি আমলাদের বিরুদ্ধে সবসময় জনমত তৈরির সুযোগ নিয়েছে।

আমলাতন্ত্র সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর উন্নয়ন অর্থনীতির ভূগোল পাঠ করা জরুরি। জাপান দিয়ে শুরু করে এশিয়ান টাইগারখ্যাত অর্থনীতিগুলো (প্রথমে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান; পরে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন এবং এখন ভিয়েতনাম) হচ্ছে পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর পরে সবচেয়ে সফল ও টেকসই অর্থনীতি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এসব অর্থনীতির উন্নয়ন মডেল বিশ্লেষণ করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে। সবার আগে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, চালমারস জনসন একটি গ্রাউন্ড ব্রেকিং গবেষণা করেন, যা ১৯৮২ সালে MITI and the Japanese Miracle : The Growth of Industrial Policy, 1925-1975 নাম প্রকাশিত হয়। জনসন স্পষ্ট করে বলেছেন, জাপানের অভূতপূর্ব উন্নয়নে আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে, Ministry of International Trade and Industry (MITI)-তে কর্মরত আমলাদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি আমলাতন্ত্রের ভূমিকাকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন, তিনি আমলাতন্ত্রকে শুধু আমলাতন্ত্র না বলে অর্থনৈতিক আমলাতন্ত্র (Economic bureaucracy) বলেছিলেন। পরে পিটার ইভানস তার সাড়া জাগানো Embedded Autonomy গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আমলাতন্ত্র কীভাবে নির্মোহভাবে ব্যক্তি খাতকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উন্নয়ন নিয়ে শত শত গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রায় সব গবেষণায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, একটি পেশাদার আমলাতন্ত্র, যারা দক্ষতায় উঁচুমানের (মেধাভিত্তিক) এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ, তারা জাতীয় উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা পালন করেছে। বিশ্বব্যাংক ১৯৯৩ সালে ‘The East Asian Miracle’ গবেষণায় দেখিয়েছে, এসব দেশে কীভাবে আমলাতন্ত্রকে কাজে লাগিয়েছে এবং কার্যকর করেছে। সম্প্রতি আফ্রিকার রুয়ান্ডা খুব দৃঢ়ভাবে সুশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে। সেখানেও আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদায়ন এবং দলীয় রাজনীতিমুক্ত থাকা সফল আমলাতন্ত্রের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অভিজ্ঞতা আমাদের গবেষণা সাহিত্যে আসেনি। এই না আসাটা অনেকটা পরিকল্পিত। দেশ স্বাধীনের পরে শুধু রাজনৈতিক শ্রেণি আমলাতন্ত্রকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি; বরং প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। তারা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি এবং একদলীয় সরকার গড়ে তোলার নামে আমলাতন্ত্রকে একটি দলীয় ক্যাডার বাহিনী করার তত্ত্ব দ্বারা মোহাবিষ্ট ছিলেন। এসব অবিমৃশ্যকারী পদক্ষেপ শুরু থেকে আমলাতন্ত্রকে একটি অবহেলিত বিষয়ে পরিণত করে। পরে বিভিন্ন সামরিক শাসক এবং সামরিক বাহিনী সমর্থিত সরকার আমলাতন্ত্রকে প্রান্তিক করার সব প্রচেষ্টা চালায়। এর ফলে শাসক গোষ্ঠী আমলাতন্ত্রকে অধীনস্থ কর্মীর বেশি কিছু ভাবতে রাজি নয়।

১৯৯০ সালে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে উপনিবেশবাদী সিভিল সোসাইটির ব্যাপক প্রসার ঘটে। এ প্রসারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও জড়িত। বার্লিন দেয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি দক্ষিণে তাদের মডেলের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার কর্মসূচি রপ্তানি করে। তাই এ সময় পাশ্চাত্য দেশে দেশে এনজিও ও সিভিল সোসাইটিকে কো-অপ্ট করে, যারা এজেন্ট হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। পাশ্চাত্যের দেশগুলো অকাতরে এসব এনজিও/সিভিল সোসাইটিকে (এজেন্ট) আর্থিক সহায়তা দেয়। ফলে একটি এলিট ক্লাসের জন্ম হয়, যারা মানসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পরিপূর্ণভাবে উপনিবেশিত। দেশীয় সংস্কৃতি-মূল্যবোধের বিপরীতে অবস্থান করে, এসব এনজিও/সিভিল সোসাইটি সমাজে বিভক্তিকে স্থায়ী রূপ দেয়। বিশেষ করে, তথাকথিত সেক্যুলার শক্তির আশকারায় তারা সব ক্ষেত্রে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা এসব এনজিও/সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিদের প্রথমবারের মতো শাসক শ্রেণির অংশীদার করে। এ ধারায় তারা ১৯৯৬, ২০০১, ১/১১, ২০০৮, ২০২৪-সহ সব বিশেষ সরকার ব্যবস্থায় প্রধান কুশীলব হয়ে ওঠে। ১/১১ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে সিভিল সোসাইটির একটি বিরাট অংশ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির সহায়তায় বড় ভূমিকা রাখে। তাদের কারণে দেশ গণতন্ত্রের ধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে ২০০৮ সালে একটি দানবীয় সরকারের অধীনে যায়, যা ২০২৪ সাল পর্যন্ত অটুট থাকে।

শাসনব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালনের সুযোগ সিভিল সোসাইটির মধ্যে রাজনৈতিক প্রবণ হওয়ার ইনসেনটিভ তৈরি করেছে। বিভিন্ন আপৎকালীন সময়ে সিভিল সোসাইটি যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রধান অনুঘটক হিসেবে টিকে থাকতে পারে, সে জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে একটি নতজানু ও অপেশাদার আমলাতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে চায়। নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ সিভিল সোসাইটির রাজনৈতিক আগ্রহকে আরো শানিত করেছে। অন্যদিকে তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীরা যুগের পর যুগ ধরে বাংলাদেশের নীতিকাঠামো ও পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করছে। তারাও চায় একটি নতজানু আমলাতন্ত্র টিকে থাক। এ ক্ষেত্রেও সিভিল সোসাইটি পাশ্চাত্যের দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করে থাকে। পাশ্চাত্যের প্রক্সি হওয়ার কারণে সিভিল সোসাইটি/এনজিও গোষ্ঠী বিপুল আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকে। ফলে আর্থিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকে সুবিধা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সিভিল সোসাইটি পরিকল্পিতভাবে আমলাতন্ত্রকে নতজানু করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ফলে, সিভিল সোসাইটি সুশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে পেশাদার ও অরাজনৈতিক আমলাতন্ত্রের কার্যকর ভূমিকা প্রতিষ্ঠার দাবির বদলে আমলাতন্ত্রের মন্দ বিষয়গুলো এমনভাবে বছরের পর বছর ধরে তুলে ধরেছে, তাতে সমাজে আমলাতন্ত্র নিয়ে একটি বিষময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে রাজনীতিবিদদের আমলাতন্ত্র সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা থাকার কারণে তারা সহজে সিভিল সোসাইটির রাজনীতির খপ্পরে পড়েছে। তাছাড়া, দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থের কারণে রাজনৈতিক সরকারগুলোও আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করার বদলে পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ নিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে সরকারি খাত এবং বিশেষভাবে আমলাতন্ত্র এখন যে বাস্তবতায় আছে, তা কোনো অবস্থায় আশা জাগানিয়া নয়। সামগ্রিকভাবে সরকারি খাত অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত, জবাবদিহির বাইরে এবং ব্যাপকভাবে নতজানু। ফলে এ কাঠামো জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিতে কোনোভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে আইনি বিধান রাজনৈতিক দুরভিসন্ধির মাধ্যমে আমলাতন্ত্র ও সরকারি খাতকে আজকের পর্যায়ে আনা হয়েছে। বর্তমান অবস্থা এতটাই বিপর্যয়কর, চিন্তাশীল ও দৃঢ়ভাবে সৎ মানুষের পক্ষে সরকারি খাতে চাকরি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারি খাতের নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য সহায়তানির্ভর সিভিল সোসাইটির কয়েকটি কারণে কোনো কথা বলার নৈতিক অধিকার নেই। প্রথমত, তারা নিজেরা আমলাতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরিকল্পনাকারীদের একজন। ৪০ বছর ধরে তারা খুব পরিকল্পিতভাবে আমলাতন্ত্রকে দুর্বল করতে চেয়েছে। দ্বিতীয়ত, সিভিল সোসাইটি/এনজিওদের শীর্ষ পদে কর্মরতরা এমন আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা পান, যা সরকারের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পক্ষে কল্পনা করাও কষ্টকর। সিভিল সোসাইটি/এনজিওর শীর্ষ পদ অল্প কয়েকজন শুধু আর্থিক সুবিধার কারণে যুগের পর যুগ ধরে দখল করে রেখেছেন। যারা ট্রান্সপারেন্সির কথা বলেন, জবাবদিহির কথা বলেন, তারা নিজেরাই এসব বিষয় চর্চা করেন না। এসব বিষয়ে তাদের ব্যাপারে সমাজে বহুবিধ অভিযোগ আছে। আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ও সরকারি খাতকে অনাকর্ষণীয় করার জন্য তারা পরিকল্পিতভাবে কম বেতনের পক্ষে মতামত দেন। সরকারের উচিত সিভিল সোসাইটি/এনজিওদের শীর্ষপর্যায়ে কর্মরতদের আর্থিক সুবিধার তথ্য পাবলিক করে দেওয়া, যাতে জনগণ তাদের জীবনযাত্রার মান ও মূল্যবোধ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারেন।

সরকারি খাত বা আমলাতন্ত্র বিষয়ে সব হীনম্মন্যতা ভুলে বাংলাদেশপন্থা রাজনীতির ধারকদের সরকারি খাত এবং আমলাতন্ত্র বিষয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। আমলাতন্ত্র মানে কলোনিয়াল ব্যবস্থা বা শোষণের হাতিয়ার, এ ধরনের আপ্তবাক্য থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পেশাদার, দক্ষ, ন্যায়পরায়ণ, জবাবদিহিতায় নিবিষ্ট আমলাতন্ত্র তৈরির জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক নীতিকাঠামো তৈরি করতে হবে। বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিবর্তন, আঞ্চলিক শক্তিকাঠামো, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও নীতিসক্ষমতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। একটি পেশাদার ও দক্ষ আমলাতন্ত্র ছাড়া বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো বহুল জনসংখ্যার দেশে টিকে থাকা কঠিন হবে। অন্যদিকে নির্বাচনব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের ফলকে নিয়ন্ত্রণের ভাবনা থেকে শাসক শ্রেণি আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় (Rahman, 2023) এবং এটি ১৯৭৩ সালের নির্বাচন দিয়ে শুরু হয়েছে। তাই বাংলাদেশপন্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দলকে সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জৈবিকভাবে (অর্গানিক) গড়ে ওঠা সিভিল সোসাইটি প্রধান সহায়ক হতে পারে।

লেখক : গভর্ন্যান্স ও পাবলিক পলিসি এক্সপার্ট, ইউরোপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েটেড গবেষক এবং Routledge ও Springer কর্তৃক প্রকাশিত একাধিক গবেষণা বইয়ের লেখক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন