আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ঈদের বাঁশির সেই সুর...

এম আবদুল্লাহ

ঈদের বাঁশির সেই সুর...
এম আবদুল্লাহ

মুসলমানদের সর্ববৃহৎ আনন্দ-উৎসব ঈদ। যার মাধ্যমে কেবল ধর্মীয় আচার বা কর্তব্য পালনের পরিসমাপ্তিই ঘটে না; বরং সমাজে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ঐক্যের সুদৃঢ় ভিত্তি নির্মাণের এক মহিমান্বিত সুযোগ তৈরি হয়। ঈদের এই অনুপম উৎসব ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে এক অভিন্ন আনন্দবোধে আবদ্ধ করে, যেন পার্থিব বৈষম্যের গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষ এক সামষ্টিক চেতনায় যুক্ত হয়ে ওঠে।

সকালের নির্মল আবহে মুসলমানরা ঈদগাহে সমবেত হয়ে সম্মিলিতভাবে নামাজ আদায় করে এবং পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় হয়। এর মধ্য দিয়ে সামাজিক ও মানবিক বন্ধনের নবায়ন ঘটে। ঘরে ঘরে সেমাই, ফিরনি, পায়েস কিংবা তেহারি, বিরিয়ানি, চটপটি প্রভৃতি ঝাল ও মিষ্টি জাতীয় খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের মাধ্যমে যে আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশ তৈরি হয়, তা সমাজজীবনে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে।

বিজ্ঞাপন

ঈদ উপলক্ষে নগরজীবনের যান্ত্রিকতা থেকে বেরিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে যায় প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে। নাড়ি ও শেকড়ের টানে ছুটে যাওয়ার বিপুলতা ও ব্যাপকতা প্রতি বছরই নানাবিধ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শত বিড়ম্বনা ও ভোগান্তির পরও প্রিয়জনের কাছে পৌঁছে ঈদের অনাবিল আনন্দ উপভোগ করেন সবাই।

ঈদ এলেই শৈশব-কৈশোরের সেই রঙিন ঈদের স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। প্রাণময় ঈদ আর যান্ত্রিক ঈদের যে পার্থক্য তা অনুভবে ভাস্বর হয়ে ওঠে। আমার বাবা ছিলেন মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। খ্যাতনামা আলেম। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গ্রামেই ঈদ করেছি আমরা। বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আমির উদ্দিন মুন্সীর হাট। স্থানীয় ভাষায় ‘আইদ্যুমুসি বাজার’। এ হাটের ধুলোবালি মেখেই আমাদের বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোরে এ হাটের চায়ের দোকানে চা-তে কিংবা সর-উঠা দুধে চুবিয়ে তন্দুর রুটি খাওয়ার স্মৃতি অমলিন হয়ে আছে।

এ হাটেই নানার পোশাকের দোকান ছিল। মূলত হাটবারেই বসতেন তিনি। একটি দোচালা টিনের শেড ছোট ছোট করে ভাগ করা ছিল। হাটবারে একেকটিতে একেকজন ব্যবসায়ী লুঙ্গি, শাড়ি, গামছা, সেন্টু গেঞ্জি ইত্যাদি পোশাকের পসরা সাজিয়ে বসতেন বিকেলের দিকে। চলতো রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। ঈদের মওসুমে কয়েকটি হাটবার মধ্যরাত পর্যন্ত জমজমাট ছিল। নানার সঙ্গে বসে থাকতাম। ঈদের সময় অপেক্ষা করতাম কখন নানা আমাকে নতুন লুঙ্গি দেবেন। পছন্দের লুঙ্গিটি পাওয়ার পর সে কি আনন্দ! কাছেই দরজি বসে থাকতো সেলাই করে দেওয়ার জন্যে। সেই লুঙ্গি নিয়ে বাড়ি ফেরার পর ঈদের দিন পর্যন্ত লুকিয়ে রাখতাম।

এক সময় ওই হাটেই আব্বা বড় আকারে একটি পোশাকের স্থায়ী দোকান দিলেন। সেখানে শাড়ি, লুঙ্গি, তৈরি পোশাক, জুতো থেকে শুরু করে সবকিছুই ছিল। বড় ছেলে হিসেবে বেচাকেনার জন্যে আব্বার সহায়তাকারী ছিলাম। ওই হাটে তখনকার সময়ে আমাদের দোকানটিই ছিল সবচেয়ে বড়। শিক্ষকতার পাশাপাশি আব্বা এই ব্যবসাটা ভালো বুঝতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই ফেনী শহরের পোশাকের পাইকারি বাজারে আব্বার ব্যবসা ছিল। নংসিংদীর বাবুর হাট থেকে ট্রেনযোগে শাড়ি-লুঙ্গি ইত্যাদি নিয়ে ফেনীতে পাইকারি বিক্রি করতেন।

ঈদের জামা যক্ষের ধনের মতো ছিল। ঈদের সকাল পর্যন্ত লুকিয়ে মাঝে মধ্যে ভাঁজ খুলে দেখে তৃপ্তি পাওয়া যেত। ঈদের আগে অন্য কেউ দেখলে তা পুরোনো হয়ে যেত, শেষ হয়ে যেতো ঈদ। ঈদের জামাকে ঘিরে তখনকার যে উত্তেজনা, তা এখন অনেক কমে গেছে। কালক্রমে দেশে যখন পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে, পথঘাট বুটিক আর দরজির দোকানে সয়লাব হয়ে গেছে, এমনকি অনলাইনে সারা দিন কাপড়ের লাইভ কেনাবেচার রীতি জীবনে যুক্ত করেছে ভিন্ন মাত্রা। ফলে ঈদের জামার বাড়তি মাহাত্ম্য কী করে থাকে?

ঈদের জামা গোপন রাখার চ্যালেঞ্জ বা আবেগ না থাকলেও, কেনাকাটা কিন্তু কমেনি। ঈদ সামনে রেখে নতুন কাপড় কেনার আর উপহার দেওয়ার সামাজিক রীতি পুরো রোজার মাস বিপণিবিতানকে সরগরম করে রাখে এখন। শহুরে নব্য ধনিক শ্রেণীর ঈদকেন্দ্রিক রমরমা শপিং উন্মাদনা সমাজের সীমিত আয়ের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্যে অনেক ক্ষেত্রে পীড়াদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। তবুও রোজার সংযমের মধ্যেই ঈদের আনন্দ ঢুকে পড়ে অনায়াসে।

এখন শহুরে জীবনে ঈদের চাঁদ দেখাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, সেকালেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। গ্রামেও ঈদের মূল আনন্দ শুরু হতো ঈদের চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে। চাঁদ দেখে কে কার আগে জানান দেবে, তার প্রতিযোগিতা হতো। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতাম আমরা। চাঁদ দেখার জন্য গ্রামে কোনো বিল্ডিংয়ের ছাদ ছিল না। তবে উন্মুক্ত মাঠে গিয়ে পরিষ্কার দেখা যেতো এ ফালি বাঁকা চাঁদ। এখনকার মতো মসজিদে মসজিদে মাইকের ব্যবস্থা ছিল না। চাঁদ দেখা যাওয়ার ঘোষণাও সেভাবে দেওয়া হতো না। তবে গ্রামের হাটবাজারে মুহূর্তে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তো আনন্দ সংবাদ। এক সময় হাটবারে ঢোল পিটিয়ে চাঁদ দেখা যাওয়ার খবর জানানোর স্মৃতিও মনে পড়ছে।

মোগল আমলের ঢাকায় চাঁদরাতে সৈন্য শিবিরে শাহি তূর্য বেজে ওঠার কথা জানা যায়। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলত আতশবাজির খেলা। গবেষক আনোয়ার হোসেন ‘আমার সাত দশক’ বইয়ে জানাচ্ছেন, চাঁদ দেখার পর ঈদকে স্বাগত জানিয়ে কিশোরেরা মিছিল করত এবং কাসিদা গাইত। ঢাকায় চাঁদরাতে কী হতো, তার সবিস্তার বর্ণনা পাওয়া যায় আবু যোহা নুর আহমদের বই উনিশ শতকের ঢাকার সমাজ জীবন-এ। এতে তাঁর ভাষ্য, ‘চাঁদ দেখামাত্রই চারিদিক হইতে মোবারকবাদ, পরস্পর সালাম বিনিময় এবং গোলাবাজি ও তোপের আওয়াজ হইতে থাকিত।’

আমাদের গ্রামীণ জনপদে চাঁদ দেখা যাওয়ার পর ছোট্ট ট্রানজিস্টরে বাজতো ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’। নজরুলের কালজয়ী গানটির কথা এখন যেভাবে জানি, তখন সেভাবে অনুভব ছিল না। জানারও ঘাটতি ছিল।

শৈশবের ঈদের অনেক স্মৃতি ঝাপসা হয়ে গেছে। মনে পড়ে ঈদ উপলক্ষে আব্বা-আম্মা আমরা ভাই-বোনের সবাইকে কাপড় সেলাই করে অথবা কিনে দিতেন। বোনদের পায়জামা ও লম্বা ফ্রক আর আমাদের লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী। কোনো কোনো ঈদে পায়জামা-পাঞ্জাবিও পেতাম। আলেম পরিবার হিসেবে আমার বোনদের পোশাকে শালীনতা তো ছিলই। ফ্রকে বুকের ওপর কুঁচি, আবার পায়জামায় বাড়তি কুঁচি ও ঢোলাঢালা বাধ্যতামূলক। নতুন জামা লুকিয়ে রাখার সে কি প্রাণান্তকর চেষ্টা। আলমারি বা তোষকের নিচে লুকিয়ে রেখে রাতে আনন্দে ঘুম হয় না। বারবার উঠে খুলে দেখতাম।

ঈদ মানেই নানা রকম খাবারের বাহার। এখন পোলাও, রোস্ট, সেমাই, পায়েস, ক্ষীরসহ নানান আয়োজন হয়। আমাদের শৈশবে মূলত চালের গুঁড়োয় হাতে তৈরি সেমাই রান্না হতো। নারিকেল দিয়ে একধরনের ঝাল-পিঠাও রান্না করতেন আম্মা। রোজার ঈদে নামাজে যাওয়ার আগে কিছু খেয়ে যাওয়া সুন্নত। তাই আম্মা ঈদের দিন খুব সকালে উঠে রান্না শুরু করতেন।

একটা সময়ে এসে সেমাই তৈরির একধরনের মেশিনের সন্ধান মিলল। ঈদের অনেক আগেই পিতলের তৈরি ওই মেশিন দিয়ে সেমাই তৈরি করতাম পরিবারের সবাই মিলে। আমি মেশিনটি ঘুরানোর কাজটাই বেশি করেছি। রমজানজুড়ে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সেমাই বানানোর হিড়িক লেগে যেতো। টিউবওয়েলের মতো দেখতে একধরনের সেমাই বানানোর মেশিন ছিলো। সবার কেনার সামর্থ্য ছিল না, বা প্রয়োজনও ছিল না। দুই-তিন বাড়ি মিলে একটা মেশিন সেমাই বানানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। প্রায় সাত-আট দিন ঘুরে সিরিয়াল আসলে মেশিন পাওয়া যেতো। বাড়ির উঠোনে বিছানা বিছিয়ে চেয়ারের হাতলের সঙ্গে মেশিনটি আটকে সেমাই বানানো হতো। মেশিনের হাতল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেমাই বানাতে হতো। একজন কিছু সময় হাতল ঘুরানোর পর তাকে বিশ্রাম দিয়ে আরেকজন ঘুরাতেন। আম্মা কিংবা বড় বোনরা সেমাই মেশিন থেকে নিয়ে বিছানায় ছিটিয়ে দিতেন। বাড়ির এ ঘরের পর ও ঘর প্রতিযোগিতা দিয়ে সেমাই বানানো হতো। ঈদের দিন বানানো সেমাইয়ের প্রতি ছিলো বেশি আকর্ষণ। বর্তমান সময়ের মতো সে সময়ে বাজারে এতো সেমাই বিক্রি হতো না।

সেমাই ছাড়াও পোলাও রান্না হতো। বাড়িতে পালা মুরগি কিংবা হাঁস জবাই করে সেটার রেজালা রান্না করতেন আম্মা। তা দিয়ে পোলাউ খাওয়া হতো। লাকড়ির চুলার সেই রান্নার স্বাদ এখনও যেন জিভে লেগে আছে। আমরা ঘুম থেকে উঠে পুকুরে গোসল সেরে নতুন জামা পরে তৈরি হয়ে একটু সেমাই খেয়ে বাবার সঙ্গে ঈদগাহতে যেতাম। সেখানে বন্ধুবান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে দেখা হতো। তাদের আমন্ত্রণ জানাতাম বাড়িতে আসার জন্যে। তারাও দাওয়াত দিতো। যারা নামাজ পড়তে আসতো, তাদের শরীরে থাকতো আতরের ঘ্রাণ।

ঈদগাহের আশপাশে ছোট ছোট দোকান বসতো। নানা ধরনের খাবারের আইটেম যেমন ছিল, তেমনি প্রাকৃতিক না উপাদানে তৈরি খেলনা বেচাকেনা হতো। পাঁচ পয়সায় পাঁচটা ছোট চকলেট কিনে চুষতে চুষতে জিহবা লাল করে ফিরতাম। আইসক্রিমও কিনতাম প্রচুর। আইসক্রিম বিক্রেতা লটারি করে বিক্রি করতো। ২০ পয়সা দিয়ে একটি কাগজ নিয়ে জিভে ভেজালে ১টি, ২টি কিংবা ৩টি পর্যন্ত আইসক্রিম পাওয়া যেতো। চিনির পরিবর্তে অস্বাস্থকর সেকারিন দিয়ে তৈরি সেই আইসক্রিম যে কতটা ক্ষতিকর ছিলো তা জানার আগেই শত শত আইসক্রিম চোষা শেষ। এছাড়া খাজা, গজা, আঙুলি, বাদাম-চিনি দিয়ে তৈরি মিষ্টি খাবার, নানা ধরনের আচার কেনা হতো। রাজা কনডম ও রঙিন বেলুন (স্থানীয় ভাষায় হোকমা বলা হতো), বাঁশি, ঝুনঝুনি ইত্যাদি কিনে আনতাম। বাঁশির এক মাথায় রাজা কনডম বা বেলুন বেঁধে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরতাম।

শৈশবের ঈদের স্মৃতির কথা ভাবতে গিয়ে প্রথমে বাঁশের বাঁশির সেই সুরই যেন কানে এসে লাগে। ভেতরে ফাঁকা চিকন বাঁশ-খণ্ড দিয়ে ছোট ছোট বাঁশি বানানো হতো। তার এক মাথায় বাঁধা থাকতো রঙিন বেলুন। ফুঁ দিয়ে বেলুন ফোলাতাম। তারপর বেলুনের দমে বাঁশিটি একা একাই অনেকক্ষণ ধরে বাজতে থাকতো। সে বাঁশির সুর আলাদা। জীবনে অনেক বাঁশি শুনেছি। চোখে রঙিন চশমা আর হাতে বাঁশি নিয়ে গ্রামের হাট-মেলা থেকে বাড়ি ফিরতাম। আরও নানাবিধ খেলনা কিনে সারা দিন সেসব নিয়ে ব্যস্ত থেকেছি। বাড়ির দরজায় অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলাধুলায় দিন পার হয়ে যেতো।

শৈশবে আমাদের বেশিরভাগ ঈদ কেটেছে নানাবাড়িতে। নানা-নানুর একমাত্র সন্তান ছিলেন আমার আম্মা। তাই সে বাড়িতেই শৈশব-কৈশোরের বেশি সময় কাটাতে হয়েছে। আমাদের বাড়ি ও নানাবাড়ির দূরত্ব এক কিলোমিটারের মতো। নিজেদের বাড়িতে ঈদ উদযাপন শুরু হয় শিক্ষাজীবন সূচনার পর। তখন ঈদ মানেই নানুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়া। বিশেষত বখশিশ পাওয়ার জন্যে ঈদের নামাজের কিছু সময় পরই চলে যেতাম নানুর বাড়ি। নানুর তৈরি ঈদের নানা পদের খাবারে সে কি আদর-সমাদর! নানাবাড়ি সংলগ্ন সাহেবের হাটে গিয়ে এটা-সেটা কিনতাম, এ-বাড়ি ও-বাড়ি ঘুরে বেড়াতাম। নিজের মামা-খালা না থাকলেও, এলাকাতো মামা-খালার অভাব ছিল না। সবাই অপরিমেয় আদর করতেন। পরে বড় দুই বোনের বিয়ে হলে দুলাভাইদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া হতো নিয়মিত।

ঈদ উপলক্ষে আগে ঈদকার্ড পাঠানোর চল ছিল। নানা রকমের ছাপানো বাহারি ঈদকার্ড বিক্রি হতো। ঢাকায় আমাদের ঈদ শুরু হয় ১৯৮৭ সালের দিকে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মানিকদি এলাকায় সপরিবারে বসবাস। তখন থেকে ঈদকার্ডের ব্যাপক প্রচলন দেখেছি। নিজেও বন্ধুদের ঈদকার্ড উপহার দিয়েছি। ঈদের পক্ষকাল কিংবা মাসখানেক আগে থেকে বই ও স্টেশনারি দোকানগুলোতে ঈদকার্ড বিক্রি হতো। এখন ঈদকার্ড ঈদ-রাজনীতিতে সীমিত হয়ে গেছে। পুরানা পল্টনের আজাদ প্রোডাক্টসহ কার্ডপাড়ায় এখন মন্দা। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ঈদকার্ড বিতরণ করা হয়। মন্ত্রীরাও ঈদ শুভেচ্ছা কার্ড বিতরণ করেন নিজস্ব পরিমণ্ডলে। আর বাকিরা সবাই এখন ই-মেইল আর ফেসবুকে ঈদের শুভেচ্ছা দেন, নিখরচায়। ই-কার্ড বানিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে সেন্ড করে দেন। শুভেচ্ছাবার্তা পৌঁছে যায় আলোর গতিতে। তবে তাতে প্রাণের ছোঁয়া থাকে কমই? ছাপানো একটি ঈদকার্ডের ঘ্রাণ আর খামের ওপর নিজের নাম লেখা দেখে যে আনন্দ পাওয়া যেতো অন্তর্জালে আসা কার্ডে তেমনটা নেই। ঈদকার্ডের খাম খুলে উল্টেপাল্টে দেখার মধ্যে যে অনুভূতি তা ই-কার্ডে থাকে না বললেই চলে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাংলায় ঘটা করে ঈদ উদযাপনের ইতিহাসের সূচনা মোগলদের হাত ধরে। তার আগে বাংলা অঞ্চলে জাঁকজমকভাবে ঈদ উৎসব বা ঈদের সংস্কৃতির খোঁজ সেভাবে মেলে না। এ অঞ্চলে প্রথম যে ঈদগাহের সন্ধান মেলে, সেটি ১৬৪০ সালের দিকে ধানমন্ডিতে নির্মিত এবং শাহী ঈদগাহ নামে পরিচিত। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নির্দেশে তাঁর প্রধান অমাত্য মীর আবুল কাসেম এটি নির্মাণ করেন। ঢাকার ইতিহাসবিদ হেকিম হাবিবুর রহমানের লেখা থেকে জানা যায়, ১৬৪০ সালে প্রথম দিকে গড়ে ওঠা ধানমন্ডির ওই ঈদগাহে সবার যাওয়ার সুযোগ ছিল না, কেবল নবাব, উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী, কাজি-হাকিম এবং তাদের বন্ধুবান্ধবই ঈদগাহে যেতেন।

পরে সতের শতকের দিকে সিলেটের প্রথম ঈদগাহ ‘শাহী ঈদগাহ’ চালু হয়। আঠারো শতকে কিশোরগঞ্জের নরসুন্দার তীরে শোলাকিয়াহ ঈদগাহসহ পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঈদগাহ বা ঈদের মাঠের জৌলুশ চোখে পড়ে। পর্যায়েক্রমে প্রতিটি এলাকায় ঈদগাহে বড় ঈদ জামায়াতের মধ্য দিয়ে মূলত মুসলমানদের এই প্রধান ধর্মীয় উৎসব পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

ঈদ সালামি হাল জামানায় বেশ আলোচিত। এটা কবে, কোথায় সূত্রপাত হয়েছে তা স্পষ্ট জানা যায়নি। নবাব-বাদশাহরা ঈদ আনন্দকে পাইক-পেয়াদা ও অনুগত প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে কিছু উপঢৌকন বিতরণ করার কথা জানা যায়। তবে তার বহুলাংশ সীমিত ছিল অভিজাত উচ্চবিত্তের মধ্যে। উৎসব হিসেবে ঈদের তাৎপর্য তখনও জনসাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। তবে সতেরো, আঠারো ও উনিশ শতক ধরে চলা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের প্রভাবে গ্রামীণ ও নগরজীবনের উৎসবে নতুনত্বের ছোঁয়া লাগে। তখন ঈদ-উৎসবের সময় নবাবেরা নিজেদের শান-শওকত আর আনন্দ প্রকাশের জন্য বড় একটা বহর নিয়ে ঈদগাহে যেতেন এবং সাধারণ মানুষকে উপহার দিতেন। মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ তখন রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকত, মোগল-আমিরদের ঈদযাত্রা দেখার জন্য বা উপহার পাওয়ার আশায়।

ঈদে সালামি দেওয়া প্রসঙ্গে আঠারোশ’ শতাব্দীর প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, ‘নওবাহার-ই-মুরশিদ কুলি খান’ গ্রন্থের লেখক আজাদ হোসেনী বিলগ্রামী (যিনি গোলাম আলী আজাদ বিলগ্রামী নামেও পরিচিত) লিখেছেন, ‘নওয়াব সুজাউদ্দিনের অধীন মুর্শিদ কুলি খান (১৭০৪-২৫) ঈদের দিনে ঢাকার দুর্গ থেকে ঈদগাহর ময়দান পর্যন্ত এক দীর্ঘ পথে প্রচুর পরিমাণ টাকাকড়ি ছড়িয়ে দিতেন।’ আমাদের শৈশবেও ঈদে কাগুজে নোট পাওয়ার কথা ভাবতেই পারতাম না। আব্বাজান মুর্শিদ কুলি খানের স্টাইলে দিতেন সিকি, আধুলি। একবার এক কোষ সিকি, আধুলি, দশ পয়সা, পাঁচ পয়সা নিয়ে ঈদের দিন সকালে সবাইকে ডাকলেন। বললেন, আমি এগুলো ছিটিয়ে দেবো। যে যতটা নিতে পারো। আমরা ভাই-বোনেরা সবাই মাটিতে ছিটানো সেই পয়সা কুড়াতে কী যে লুটোপুটি খেয়েছিলাম! যে বেশি নিতে পেরেছি, তার সে কী আনন্দ! সেসব কয়েন পকেটে পুরো ঈদগাহে যাওয়ার সময় বার বার গুনতাম। মাথায় পরিকল্পনা করতাম কী কী কিনবো।

শহুরে যান্ত্রিক জীবনে পা দেওয়ার পর থেকে গ্রামীণ ঈদের সেই আনন্দ-উদযাপনে অনেক বিবর্তন ঘটেছে। তিন দশক ধরে ভিন্ন আমেজ। সাংবাদিকতা পেশার কারণে ঈদের ছুটি সীমিত হয়ে গেছে। আবেগ-অনুভূতিতেও কিছুটা জং ধরেছে। আব্বা ও আম্মাকে হারিয়েছি বেশ ক’বছর হয়ে গেলো। তাদের শূন্যতায় ঈদ-আনন্দে নিদারুণ অপূর্ণতা অনুভব করি। গ্রামের বাড়ির পুকুর পাড়ে শুয়ে আছেন দুজন। ছুঁটে যাই তাদের অন্তিম ঠিকানায়। আব্বা-আম্মার শেষ দিনগুলোতে শহুরে জীবনেও আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। জীবনের শেষ বছর পর্যন্ত আব্বা বিশাল ঈদগাহে নামাজের ইমামতি করেছেন। সেখান থেকে ফিরলে টানা জম্পেশ আড্ডা-আলোচনা আর খানাপিনা চলতো। বাসা গমগম করতো। কিন্তু মাথার ওপর থেকে বট-ছায়া চলে যাওয়ার পর ঈদের আনন্দ অনেকখানি পানসে হয়ে যায়। তবুও জীবন থেমে থাকে না। চলে আপনগতিতে। এখন স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোন, ভাতিজা-ভাতিজি, ভাগিনা-ভাগ্নি থেকে নাতি-নাতনি পর্যন্ত বিস্তৃত বৃহত্তর পরিবারের ঈদই আমার ঈদ, আমাদের ঈদ।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...