একটি বাড়িতে আগুন লেগেছিল। আমরা আগুন নিভিয়েছি, আগুন লাগানো ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছি এবং তার দায়ও স্পষ্ট করেছি। কিন্তু বৈদ্যুতিক তার এখনো ছেঁড়া, গ্যাসের লাইন এখনো ফুটো আর আগুন প্রতিরোধের কার্যকর ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। এমন একটি বাড়িতে আবার আগুন লাগবে না—এ নিশ্চয়তা কি আমরা দিতে পারি?
বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ অনেকটা ওই বাড়ির মতো। জুলাই অভ্যুত্থান একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের আগুন নিভিয়ে তার পতন ঘটিয়েছে। সে আগুনে পুড়েছে গণতন্ত্র, অর্থনীতি, ব্যাংকব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার। দুর্নীতি, ব্যাংক লুট, অর্থপাচার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং বিরোধী মত দমনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে ধ্বংস করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। জাতিসংঘের অনুসন্ধান প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহতের সংখ্যা এসেছে। তবে সব মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল তালিকা এখনো চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হওয়ার আশঙ্কা এড়ানো যাচ্ছে না। তাছাড়া আহত হন হাজারো মানুষ, যাদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলির শিকার। কিন্তু যে ক্ষমতা কাঠামো একজন শাসককে এত দীর্ঘ সময় এমন লুণ্ঠন ও নিষ্ঠুরতার সুযোগ দিয়েছিল, তার অনেকটাই এখনো অক্ষত। জুলাই সনদ সেই ছেঁড়া তার ও ফুটো লাইন মেরামতের দলিল। এর বাস্তবায়নে বিলম্ব মানে ভবিষ্যতের আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহাল রাখা।
জনগণ কোন দলিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিল
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটের আগে জাতিকে বলা হয়েছিল—‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে পরবর্তী সংসদ জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে। নির্বাহী ক্ষমতার সীমা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ছিল ওই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে। এটি কোনো দলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন ছিল না; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে জনগণের সরাসরি রায় ছিল।
ক্ষমতাসীন দল যখন বলে, তারা দলীয় ইশতেহারের আলোকে সনদ বাস্তবায়ন করবে, তখন প্রশ্ন ওঠে—নাগরিকরা গণভোটে জাতীয় সংস্কার সনদের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, নাকি একটি দলের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পক্ষে? সংসদ আইন করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গণভোটে অনুমোদিত জাতীয় মতৈক্যকে কোনো দলের সুবিধামতো খণ্ডিত করার অধিকার আছে কি? দলীয় ইশতেহার সংসদীয় ম্যান্ডেটের উৎস হতে পারে, গণভোটের রায়ের বিকল্প নয়। এই অস্পষ্টতা যত দীর্ঘ হবে, সংস্কারের নৈতিক ভিত্তি তত দুর্বল হবে।
আদালত কী বলছে
২০২৬ সালের ৯ জুলাইয়ের রায়ে আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর অংশবিশেষ নিয়ে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সাংবিধানিক গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়। এ রায় জুলাই সনদের গণভোটের প্রতিটি প্রস্তাব সরাসরি বাধ্যতামূলক বলে ঘোষণা করেনি। তবে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্নে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের সাংবিধানিক গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাই গণভোটের রায়কে শুধু দলীয় ইশতেহারের আলোকে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, তার নিরপেক্ষ আইনি ব্যাখ্যা জরুরি।
দায়ী ব্যক্তি, অক্ষত কাঠামো
শুধু কাঠামোর কথা বললে ব্যক্তির দায় আড়াল হয়। একজন দায়ী ব্যক্তিকে সরানোই যথেষ্ট নয়। বর্তমান সরকার একই ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করবে না, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে তারা নিজেদের শাসন সহজ বা দীর্ঘস্থায়ী করতে ব্যবহার করবে না—এমন নিশ্চয়তাও নেই। তাই ব্যক্তির বিচার ও কাঠামোর সংস্কার দুটিই জরুরি।
আসল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো সরকারকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা থেকে ঠেকাতে সক্ষম কি না। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকলে, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন না হলে, বিচার বিভাগ নির্বাহী প্রভাবমুক্ত না থাকলে এবং সংসদ জবাবদিহির ক্ষেত্র না হলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শাসকের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অথচ রাষ্ট্র দাঁড়াবে নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানের ওপর। ভালো প্রতিষ্ঠান সৎ ব্যক্তিকে কাজের সুযোগ দেয় এবং অসৎ ব্যক্তিকে সীমার মধ্যে রাখে।
স্বচ্ছ বাস্তবায়নই পথ
প্রথমত, সরকারকে জুলাই সনদের একটি আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন তালিকা প্রকাশ করতে হবে। সেখানে প্রতিটি প্রস্তাবের পাশে গণভোটে অনুমোদিত মূল বক্তব্য, সরকারের অবস্থান, প্রয়োজনীয় আইন বা সাংবিধানিক সংশোধন এবং সংসদে উপস্থাপনের সময়সীমা থাকতে হবে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া কেবল বক্তৃতা ও দলীয় আশ্বাসের ওপর চলতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক সংশোধনের খসড়া সংসদে তোলার আগে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। নাগরিক, আইনজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে লিখিত মতামত দেওয়ার যথেষ্ট সময় দিতে হবে। নির্বাচন জনপ্রতিনিধি তৈরি করে, কিন্তু সংবিধান বদলের মতো দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে জনগণের অংশগ্রহণ নির্বাচনের দিনই শেষ হয়ে যায় না।
তৃতীয়ত, মতভেদপূর্ণ সব বিষয়কে একত্র করে একটি বিশাল সংশোধনী পাস করা ঠিক হবে না। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, উচ্চকক্ষের নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাহী ক্ষমতার সীমা বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের পদ্ধতি—এসব পৃথক আলোচনার দাবি রাখে। একটি বিষয়ে মতভেদ থাকলে গোটা সংস্কার আটকে রাখা যেমন ভুল, তেমনি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
চতুর্থত, বাস্তবায়ন ধাপভিত্তিক হতে পারে, কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। নির্বাচন কমিশন, বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং সংসদীয় নজরদারি শক্তিশালী করার মতো কিছু সংস্কার দ্রুত করা সম্ভব। উচ্চকক্ষ গঠন বা নির্বাহী ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে বেশি প্রস্তুতি লাগতে পারে। তবে প্রতিটি ধাপের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং দৃশ্যমান ফলাফল থাকতে হবে।
দায়িত্ব সবার, ক্ষমতাসীনদের বেশি
বিরোধী দলগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রতিটি মতভেদকে ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ বললে সমঝোতার জায়গা সংকুচিত হয়। তবে ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব বেশি। কারণ, আইন প্রণয়নের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের হাতে। বাংলাদেশের বহু সরকার ক্ষমতায় থেকে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রযন্ত্রকে সুবিধাজনক মনে করেছে; ক্ষমতা হারিয়ে তারাই ওই যন্ত্রের শিকার হয়েছে। তাই সংস্কার এমন হওয়া দরকার, যা সরকারকে ক্ষমতায় সীমিত করবে এবং বিরোধী দলে তার অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করবে।
সরকার এখনই একটি প্রকাশ্য সংস্কার ড্যাশবোর্ড চালু করতে পারে। সেখানে নাগরিকরা দেখতে পারবেন কোন প্রস্তাব খসড়া হয়েছে, কোনটি কমিটিতে, কোনটি ভোটের অপেক্ষায় এবং কোনটি মতভেদের কারণে স্থগিত। এতে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে, আবার বিরোধী দলকেও শুধু অভিযোগ না করে বিকল্প প্রস্তাব দিতে হবে।
জুলাইকে স্মৃতি নয়, নিরাপত্তা দিতে হবে
আমরা জুলাইয়ের আবেগ, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের বেদনার কথা স্মরণ করি। কিন্তু যে রাষ্ট্রব্যবস্থা এ বেদনার জন্ম দিয়েছিল, তাকে বদলানোর প্রশ্নে বিভক্ত থাকলে সে স্মরণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ফ্যাসিবাদ একদিনে ফিরে আসে না। এটি ফেরে ধীরে ধীরে—যখন প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকে, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, ভিন্নমতকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয় এবং আদালত ও নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে দাঁড়াতে পারে না।
সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠনের অধিকার দেয়, কিন্তু গণভোটে অনুমোদিত জাতীয় রায়কে নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করার সীমাহীন অধিকার দেয় না। একই ভাবে জুলাইয়ের নৈতিক উত্তরাধিকার কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়; এটি পুরো জাতির অর্জন। সমাধান হলো সংসদের কর্তৃত্ব, গণভোটের ম্যান্ডেট এবং জাতীয় ঐকমত্য—এ তিনটিকে একসঙ্গে সম্মান করা।
জুলাই সনদের পরীক্ষা কোন দল কতটা লাভবান হলো, তা নয়। আসল পরীক্ষা—ক্ষমতাসীন দল নিজের ক্ষমতা সীমিত করার প্রতিষ্ঠান গড়তে রাজি কি না এবং ভবিষ্যতে কোনো দল যেন রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি বানাতে না পারে, সে নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না। জুলাইকে শুধু স্মৃতি হয়ে থাকতে দেওয়া যাবে না; তাকে রাষ্ট্রনীতি, সাংবিধানিক নিরাপত্তা এবং আগামী প্রজন্মের স্বাধীনতার গ্যারান্টিতে পরিণত করতে হবে। জুলাই সনদের পূর্ণ ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নই সে লক্ষ্যের সবচেয়ে বড় মাইলফলক।
লেখক : প্রবাসী কলাম লেখক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




