জনরোষ কীভাবে একজন দাম্ভিক শাসকের করুণ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, এর ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে থাকবেন শেখ হাসিনা। জুলাই-আগস্ট মাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে আছে। জনপ্রিয়তা হারিয়ে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পুতুল হিসেবে শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হয়েছিল আগস্ট মাসে। শেখ হাসিনা তার বাবার পতন থেকে শিক্ষা না নিয়ে তার মতো একদলীয় শাসনের পথে হেঁটেছিলেন। নদীবহুল বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাদের জনপ্রিয়তা অনেকটা জোয়ারভাটার মতো। জনগণ যে নেতাকে প্রবল জনসমর্থন দিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান, সেই জনতাই এক বছরের মধ্যে সেই সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর কিংবা জনসমর্থনের দোহাই দিয়ে জনমত উপেক্ষার নীতি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শেখ হাসিনা মেকি জনসমর্থন দেখিয়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে দেড় দশক ক্ষমতা আঁকড়ে ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভারতের দৃঢ় সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও রাজধানীকেন্দ্রিক একটি ছাত্র আন্দোলন ঘিরে মাত্র ৩৬ দিনের মধ্যে তার পতন হয়েছিল।
১ জুলাই থেকে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও শেখ হাসিনার পতনের ঘণ্টা বেজেছিল মূলত ১৪ জুলাই। যেদিন তিনি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-পুতি বলে সম্বোধন করেছিলেন। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’ বলে স্লোগান দিয়ে হলগুলো থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। কিন্তু তার পতন ও পলায়নের আগের দিন ৪ আগস্ট ছিল যেমন ঘটনাবহুল ও তেমনি রক্তাক্ত।
এর আগের দিন ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে সভাটি করেছিলেন, সেটি ছিল হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণের আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত সূচক ঘটনা। এই সভায় জুনিয়র অফিসাররা জানিয়েছিলেন তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালাতে রাজি নন। এই বৈঠকের বিষয়ে ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নাল ২৯ আগস্ট ২০২৪ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে সে সভার কিছু চিত্র পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, বৈঠকে সেনা মোতায়েনের পক্ষে বেশ কিছু যুক্তিও দেন সেনাপ্রধান। একই সঙ্গে কয়েকজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে তাদের অবস্থান প্রকাশেরও সুযোগ দেন। এ সময় মেজর থেকে কর্নেল র্যাংকের একের পর এক কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে তাদের মনোভাব তুলে ধরেন। সেনাপ্রধান বৈঠকের শেষে জানান, সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে থাকবে।
সেনাবাহিনীর দিক থেকে আসা এই বার্তা গোপন ছিল না। সন্ধ্যার মধ্যে এই সভার খবর চাউর হয়ে যায়। শেখ হাসিনারও তা অজানা থাকার কথা নয়, কিন্তু এরপরও ৪ আগস্ট শেখ হাসিনা শেষ রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি পুলিশকে বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করেছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনে দিনভর রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশ সাধারণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। কোথাও কোথাও ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে । রাজধানীর বাইরে এদিন সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। রাজধানীর উত্তরা, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, জিগাতলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের গুলিতে রাস্তায় লাশ পড়ে থাকার খবর আসতে থাকে। এদিন ঢাকার বাইরে সিলেট, রংপুর, বগুড়া, খুলনা, নরসিংদী, ফেনিসহ প্রায় প্রতিটি জেলায় বহু মানুষ নিহত ও শত শত মানুষ গুরুতর আহত হয়।
দেশজুড়ে পুলিশ ও বিজিবির হত্যাকাণ্ডের মধ্যে এদিন শেখ হাসিনা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে তিনি পুলিশের প্রশংসা করে সেনাবাহিনীকে একই ধরনের ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান। এর মধ্য সন্ধ্যার দিকে ছাত্রনেতারা মার্চ অন ঢাকা কর্মসূচি এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট ঘোষণা করা হয়। ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে কারফিউ বলবৎ করা হয় । একই সঙ্গে নির্বাহী আদেশে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর শেখ হাসিনা আরেকটি সভা করেন গভীর রাতে। যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকটি ছিল অনেকটা ঢাকার পতন ঠেকানোর শেষ প্রচেষ্টা। যেখানে শেখ হাসিনা কঠোরভাবে মানুষের ঢাকা আসা ঠেকাতে গুলি চালানোসহ আরো কঠোর হওয়ার তাগিদ দেন। পুলিশের মতো সেনাবাহিনী গুলি না চালানোয় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই সভায় পরিকল্পনা করা হয় কীভাবে ঢাকা রক্ষা করা হবে। পরের দিন দেখা গেছে সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। কারণ পরের দিন ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশ জনতার ওপর গুলি চালালেও সেনাবাহিনী ও বিডিআর ছিল নির্লিপ্ত।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, শেখ হাসিনা আগেই টের পেয়েছিলেন তিনি হয়তো পতনের মুখে আছেন। চতুর হাসিনা ‘দুটি বিকল্প’ পথ খোলা রাখতে চেয়েছিলেন। একদিকে তার দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি চলছিল, আবার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনা পলায়নের পর ভারতের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা নিজে ভারতের সঙ্গে কথা বলেন এবং সেখানে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা জানান। এরপর ভারত সরকার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। শেখ হাসিনার পতনের পর বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, একদিন আগেই ওয়াশিংটন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের বলেছিল, শেখ হাসিনার সময় শেষ। তার সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে হাসিনা—অর্থাৎ হাসিনার পতনের আগাম ইঙ্গিত দিল্লিও পেয়েছিল। প্রয়োজনে ভারতে পালিয়ে যাবেন, এমন প্রস্তুতি শেখ হাসিনার সবসময় ছিল।
জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় আরো একটি বিষয় অনেকের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, তা হলো—ভারতীয় দূতাবাসের তৎপরতা। রক্তাক্ত জুলাইয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা অন্তত দুবার শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয় ৩১ জুলাই। এই বৈঠক শেষে হাসিনার প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানান, প্রণয় ভার্মা ঢাকার সরকারি বাসভবন গণভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতায় প্রাণহানি ও বিপুল সম্পদমূল্যের ক্ষয়ক্ষতির জন্য হাইকমিশনার গভীর সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় দুষ্কৃতকারীরা দেশে শ্রীলঙ্কার মতো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল এবং তারা সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল। শেখ হাসিনা বলেন, কোটা সংস্কারকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক আন্দোলনটি মোটেও কোনো সাধারণ আন্দোলন ছিল না; বরং একপর্যায়ে এটি সন্ত্রাসী হামলার রূপ নেয়।
হাসিনার দেড় দশকের শাসনে যে নিপীড়নমূলক চোরতন্ত্র কায়েম হয়েছিল, তার প্রধান সুবিধাভোগী ছিল ভারত। এ কারণে হাসিনার প্রতিটি পদক্ষেপে দিল্লির সমর্থন ছিল। হাসিনার পতন ছিল অনেকটা বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্যের পতন। এখনো দিল্লিতে শেখ হাসিনার যেকোনো তৎপরতা ভারতের পরিকল্পনার অংশ মাত্র। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, হাসিনার নিপীড়নমূলক শাসন ও জনগণের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা ধরে রাখার যে শক্তি, এর প্রধান উৎস ছিল ভারত। শেখ হাসিনা দুটি বিষয়ে ছিলেন অন্ধ। একটি হলো—তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এবং দিল্লির প্রতি আনুগত্য। তিনি জানতেন তার শেষ রক্ষা ও আশ্রয়দাতা হবে দিল্লি। এ কারণে ক্ষমতায় থাকতে ২০১৮ সালে মে মাসে তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্য বলেছিলেন, তিনি ভারতকে যা দিয়েছেন, তা সারা জীবন মনে রাখবে। ভারত তাকে আশ্রয় দিয়ে সেই প্রতিদান দিচ্ছে। হাসিনার কাছ থেকে ভারত যা পেয়েছে, বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে পাবে না। স্বাভাবিকভাবে ভারতের কাছে হাসিনা ও তার দলের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের আভ্যন্তরিন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য হাসিনাবে এখনও দিল্লি নানাভাবে ব্যবহারের চেষ্ঠা করে যাচ্ছে। ৫ আগস্ট তার পতন ও পলায়নের বার্ষিকীতে তিনি প্রকাশ্যে আসবেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দ্য হিন্দু-এর ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাফেয়ার্স সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক্স পোস্টে জানিয়েছেন, ওইদিন শেখ হাসিনা দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করবেন। তবে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকবেন, নাকি ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কয়েক দিন আগে লোকসভার পররাষ্ট্রবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটিতে দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারত সরকার দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনীতি অনুমোদন করবে না। এখন আবার এই সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হাসিনাকে ব্যবহারের নানা উদ্যোগ ভারত সরকারের রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ নয়, গণধিকৃত এক স্বৈরশাসকের প্রতিই যে দিল্লির আস্থা, এই সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাই তার প্রমাণ।
অনেকে বলে থাকেন, শেখ হাসিনা হঠাৎ করে বাধ্য হয়ে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এমন পরিস্থিতি তিনি বেশ আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তার নিকটাত্মীয় ও শেখ পরিবারের রক্তের সম্পর্ক আছে এমন কাউকে তার পলায়নের পর দেশে পাওয়া যায়নি। তারা জুলাইয়ের শেষদিক থেকে দেশ ছাড়তে শুরু করেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার নিকটাত্মীয় ফজলে নূর তাপসের পালিয়ে যাওয়ার আগে টেলিফোনে আলাপের ফাঁস হওয়া কথোপকথন থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনা তাকে অনেকটা ভীত-সন্ত্রস্তভাবে দেশ ছাড়ার সম্মতি দিয়েছেন। শেখ হাসিনা ছিলেন ভীতু প্রকৃতির এক স্বৈরশাসক। যার কাছে নিজের জীবন, পরিবার ও স্বজনদের রক্ষা করা ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন





