পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

এস এম আসাদুজ্জামান

পাঠ্যবইয়ে যেভাবে ফিরলেন শহীদ জিয়াউর রহমান

২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি। ওইদিন থেকে কোমলমতি খুদে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকে ফিরে এসেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গৌরবান্বিত ইতিহাস। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরো সময়কালে (২০০৯-২৪) স্বাধীনতার ঘোষক ও মহানায়ক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে পাঠ্যপুস্তক থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাসকে আওয়ামীকরণের প্রকল্প হিসেবে শুধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

বিএনপির শাসনামলে (২০০১-০৬) প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তকে জিয়াউর রহমানের বীরত্বের ইতিহাস নিরপেক্ষভাবে বিদ্যমান ছিল।

বিজ্ঞাপন

২০০৪ সালে এনসিটিবি মুদ্রিত পঞ্চম শ্রেণির সমাজ (পরিবেশ পরিচিতি) বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘বাংলার ইতিহাস ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ পর্যালোচনা করে দেখা যায়—প্রাচীন বাংলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে যথাযথভাবে স্থান পেয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদ তিতুমীর ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অবদান গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও এম এ জি ওসমানীর অবদানও নিরপেক্ষভাবে স্থান পায়।

মুক্তিযুদ্ধ অংশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধে তার নেতৃত্বের কথা বলা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপট হিসেবে ছিল—২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হন। দিকনির্দেশনার অভাবে দেশবাসী হতবুদ্ধি ও দিশেহারা হয়ে পড়ে। তখন এগিয়ে এলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি ২৬ মার্চ তারিখে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

বিতর্কিত ১/১১ সরকারের সময় ২০০৭ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও শহীদ জিয়াউর রহমানের অবদানকে খাটো করে উপস্থাপন শুরু হয় পাঠ্যপুস্তকে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস’ পাঠ্যপুস্তকের সপ্তম অধ্যায়ে ‘স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরু’ উপশিরোনামে বলা হয়েছে—‘২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই মধ্যরাতের পর-অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। তিনি ঢাকায় দলীয় নেতারা এবং ওয়্যারলেসযোগে চট্টগ্রামে ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পৌঁছে দিয়ে তা প্রচারের নির্দেশ দেন। চট্টগ্রাম স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর নামে প্রচারিত হয়। ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ওই বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।’ এই ইতিহাস পাঠ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বোঝার উপায় নেই মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অসাধারণ সেই ভূমিকা কী ছিল।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে শহীদ জিয়াউর রহমানের বীরত্বগাথা ইতিহাস মুছে ফেলে। পাঠ্যপুস্তককে অনেকটা একব্যক্তিনির্ভর (শেখ মুজিবুর রহমান) ইতিহাসে রূপ দেওয়া হয়। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী আমলে এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনায় এই চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে, তৃতীয় শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’, ‘বাংলা সাহিত্য কণিকা’ ও ‘ইংলিশ ফর টুডে’ পাঠ্যপুস্তকগুলোয় শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের বর্ণনায় অতিরঞ্জন ছিল। তৃতীয় থেকে নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ এবং নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত অধ্যায়ে নিরপেক্ষ ও নির্মোহ ইতিহাস তুলে ধরা হয়নি। এসব পাঠ্যপুস্তকে ছিল মিথ্যা, অতিরঞ্জন ও ভারতীয় বয়াননির্ভর ইতিহাস।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা অংশে প্রকৃত ইতিহাস উপেক্ষা করা হয়েছিল। বইগুলোয় শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষক বানানো হয়েছে। পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার গঠনের পর সরকার ২০২২ সালে প্রণীত নতুন কারিকুলাম স্থগিত করে এবং ফিরে যায় ২০১২ সালে প্রণীত কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে। এসময় পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে এনসিটিবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী কয়েকজন তরুন কর্মকর্তাদের

প্রচেষ্টায় ইতিহাসের নিরপেক্ষ বয়ান তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।

বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণিতে জিয়াউর রহমান প্রথম স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্থান পেয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ পাঠ্যপুস্তকের তৃতীয় অধ্যায়ে (বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম) ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ অংশে বলা হয়েছে—

‘২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা… (সংক্ষেপিত)।’

এই বর্ণনার পাশাপাশি শহীদ জিয়াউর রহমানের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার ছবিটিও স্থান পেয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে এই নির্মোহ ইতিহাস যুক্ত করার ফলে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় পর আবার শহীদ জিয়াউর রহমান সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারবে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও গবেষণা কর্মকর্তা, এনসিটিবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন