সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩১টি পৌরসভার মধ্যে ১৮টিতে ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার প্রজেক্ট’র (ইউপিএইচসিপি) আওতাধীন ১৬৫টি নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (পিএইচসিসি) ও ২৭টি সমন্বিত প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র (সিআরএইচসিসি) পরিচালনার দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কি এই ১৯২টি কেন্দ্রই পরিচালনা করবে, নাকি শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ৮৬টি পিএইচসিসি এবং ১০টি সিআরএইচসিসি পরিচালনা করবে—আর এর কার্যপরিধিই-বা কী হবে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কিছু স্বাস্থ্যসূচক
শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের গড় আয়ুর পার্থক্য কমছে। এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ১. প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার, ২. নলকূপের ব্যবহার এবং ৩. শহরাঞ্চলে পরিশ্রমহীন জীবনযাপন, বায়ুদূষণ ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যগ্রহণ।
বিবিএস-এসভিআরএসের তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্কদের ১০ দশমিক ৮ শতাংশ টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ প্রি-ডায়াবেটিক। গ্রামীণ এলাকায় এ হার যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪ ও ২৭ দশমিক শূন্য শতাংশ। উচ্চ রক্তচাপের হার শহরাঞ্চলে ২৫ এবং গ্রামে ১৫ শতাংশ।
তবে গ্রামে শিশুদের অপুষ্টির হার বেশি। সেখানে খর্বাকৃতির হার ৩২ দশমিক ৬–৩৯ দশমিক ৬; শহরাঞ্চলে ২৫ দশমিক ৩–৩২ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রামে কম ওজনের হার ২২ দশমিক ৫–৩৫ দশমিক ৭; শহরাঞ্চলে ১৮ দশমিক ৯–২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। গ্রামে কৃশকায় শিশুর হার ৮ দশমিক ১–১৬ দশমিক ৭; শহরাঞ্চলে ৮ দশমিক ৯–১৩ দশমিক শূন্য শতাংশ। প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে অপুষ্টির হার শহরাঞ্চলে ৮ দশমিক ৬ এবং গ্রামে ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্যের নাজুক অবস্থার কারণগুলো
দারিদ্র্য ও শিক্ষার অভাব অপুষ্টির হার বাড়িয়ে দেয়। অন্যান্য নির্ধারক হলো, গ্রামে জন্মক্রম বেশি হলেও গণমাধ্যমে প্রবেশের সুযোগ কম। অন্যদিকে, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রসব-পরবর্তী সেবার অভাব এবং মায়ের কম ওজনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
গ্রামে নবজাতকের মৃত্যুহার বেশি। অন্যদিকে, শহরের বস্তি এলাকায় অকালপ্রসব নবজাতকের মৃত্যুর ৪০ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত। মায়ের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়া, অতিরিক্ত ঘনবসতি, দারিদ্র্য এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নবজাতকের মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়—বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা ও শহরের বস্তিতে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৩-এর সূচকগুলো
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশীদার হিসেবে ২০৩০ সালের লক্ষ্যগুলো আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এগুলো হলোÑ
১. প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এর নিচে নামানো।
২. নবজাতক ও পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমিয়ে যথাক্রমে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে ১২ ও ২৫-এ নামানো।
৩. এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের মহামারি নির্মূল এবং হেপাটাইটিস, পানিবাহিত রোগ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের মোকাবিলা করা।
৪. অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যুর হার এক-তৃতীয়াংশ কমানো।
৫. মাদকদ্রব্য ও অ্যালকোহলের অপব্যবহার প্রতিরোধ এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা।
৬. সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেক কমানো (২০২০ সালের মধ্যে)।
৭. পরিবার পরিকল্পনা, তথ্য ও শিক্ষাসহ যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার সর্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
৮. সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন করা। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং সবার জন্য নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ ও টিকা নিশ্চিত করা।
৯. ক্ষতিকারক রাসায়নিক দ্রব্য এবং বায়ু, পানি ও মাটিদূষণের কারণে মৃত্যু এবং অসুস্থতা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো।
১০. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন বাস্তবায়ন করা।
১১. টিকা ও ওষুধবিষয়ক গবেষণা ও উন্নয়নে সহায়তা করা।
১২. স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও কর্মক্ষেত্রে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা।
১৩. জাতীয় ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম সতর্কবার্তা প্রদান, ঝুঁকি হ্রাস এবং ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা জোরদার করা।
বাংলাদেশে শহুরে জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে প্রযোজ্য আইন
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন/পৌরসভা) আইন, ২০০৯ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতাল, ফার্মেসি, ডিসপেনসারি, ক্লিনিক এবং নার্সিং ও প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউটগুলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (এলজিআই) থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এলজিআইগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের জন্য বার্ষিক ফি ধার্য করে।
এছাড়া এলজিআইগুলো যেসব কাজ করতে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও ডিসপেনসারি স্থাপন; স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা; ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য ইউনিট চালু; চিকিৎসা, নার্সিং ও প্যারামেডিকেল শিক্ষার উন্নয়ন; চিকিৎসাসহায়তা প্রদানে গঠিত বিভিন্ন সমিতিকে অনুদান দেওয়া; স্কুলশিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা; এবং স্বাস্থ্যবিধি, পানি ও স্যানিটেশন, খাদ্য ও পানীয়সহ এ ধরনের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত এবং নিয়ন্ত্রণ করা।
শহুরে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ও এর ব্যবস্থাপনা
খুব অল্পসংখ্যক এলজিআইয়ের পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য বিভাগ রয়েছে। এমনকি বড় সিটি করপোরেশনগুলোও তাদের সব ওয়ার্ড ও অঞ্চলে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারে না। বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও বেশিরভাগ এলজিআইয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন অন্য পেশার ব্যক্তিরা। কৌতূহলজনক বিষয় হলো, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়) ২৫ বছর ধরে একটি স্বাস্থ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেও তাদের ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’-এ স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত কোনো ভূমিকার উল্লেখ নেই!
কিছু বড় সিটি করপোরেশন মাতৃসদন ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র; নার্সিং ও প্যারামেডিকেল ইনস্টিটিউট; জরুরি সেবা (অ্যাম্বুলেন্স); মশা নিয়ন্ত্রণ; বিয়ে, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন; এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় সরকারি আউটডোর ডিসপেনসারিগুলোর (জিওডি) মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে। সারা দেশে ৩৫টি ডিসপেনসারির মধ্যে ২৬টিই ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রতিটিতে রয়েছেন একজন চিকিৎসক, একজন নার্স, একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মী। সরকারের পরিকল্পনা ছিল, এসব ডিসপেনসারিকে দোতলা ভবনে উন্নীত করা এবং প্রতিটিতে ২০ জন করে কর্মী নিয়োগ দেওয়া।
এছাড়া স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, বিমান, ব্যাংক, রেলপথ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও শহরাঞ্চলে তৃতীয় বা দ্বিতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে। পাশাপাশি রয়েছে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতাল এবং তুলনামূলক কম খরচে সেবা প্রদানকারী কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্ভবত এনজিওগুলোর মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কৌশল গ্রহণ করবে। তবে এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার জন্য পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান, দরকষাকষি এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ে দক্ষতা থাকা জরুরি। বিনামূল্যে সেবা প্রদানের জন্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা ও তাদের তালিকাভুক্ত করা একটি চ্যালেঞ্জ। তাই এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কিছু সময় অভিজ্ঞ কর্মীদের পাশাপাশি কাজ করবেন—এটাই প্রত্যাশিত।
ইউপিএইচসিপির দুর্বলতা ছিল এর স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা কাঠামো। এই কাঠামো মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত ছিল, যেখানে এলজিআইয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ ছিল না। এর ফলে এলজিআইয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কিংবা চুক্তি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি।
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন এলজিআইয়ের স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদ সৃষ্টি করে প্রস্তাবিত ‘জনস্বাস্থ্য মহাপরিচালক’ দপ্তরের অধীনে ন্যস্ত করার প্রস্তাব করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ২০০৯/২০১০ সালের আইন এবং ট্রেজারি বিধিমালা পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
শহরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো তৈরির আগে একটি মানচিত্র তৈরি করতে হবে। নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে সেবার পরিমাণ, যাতায়াতের সময় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর উপস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে।
শহরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে শহরের আয়তন বাড়েনি; অর্থাৎ, যাতায়াতের দূরত্ব বা সময় বৃদ্ধি পায়নি। বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

