২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তা নদী নিয়ে একটি খসড়া চুক্তি করা হয়েছিল। এক যুগেরও অধিক সময় আগের খসড়াটি আজ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। তখন অজুহাত ছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় পানিসম্পদমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেননি। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে আমরা ১৯৯৬ সালে ফারাক্কা চুক্তির কথা বলতে পারি। ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তিতে রয়েছে ভারতের একটি কৌশল। চুক্তিটিতে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ রাখা হয়নি। পানিপ্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকে নেমে এলে উভয় পক্ষ জরুরি বৈঠক করে পানির একটি ন্যায্য ভাগাভাগি করবে। চুক্তিটি রিভিউ করার কথা থাকলেও কোনো সময়ই রিভিউ করা হয়নি। ১৯৯৬ সাল থেকে ভারত ফারাক্কার মাধ্যমে কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য লাগাতার ৪০ হাজার কিউসেক পানি আজ পর্যন্ত সরিয়ে নিচ্ছে। এখন ফারাক্কা উভয় দেশের জন্য একটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারসহ ভারতের পানি বিশেষজ্ঞ এবং নদীতীরবর্তী জনগণ এখন ফারাক্কা বাঁধটি ভেঙে ফেলার দাবি তুলছেন। বাংলাদেশের পানিপ্রাপ্যতার জন্য তিস্তা একক অন্যতম একটি প্রবাহ। তিস্তার উজানে ভারত গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করে তৎসংলগ্ন আরো প্রায় ১৬টি স্থাপনা নির্মাণ করায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা দিয়ে মোটেই পানি আসছে না। যেখানে শুষ্ক মৌসুমে স্বাভাবিক প্রবাহ ৫ হাজার ৫০০ কিউসেক থাকার কথা, সেখানে ২০১৫ সালের ১১ মার্চ তা সর্বনিম্ন ৩৫০ কিউসেকে নেমে এসেছে।
ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, গঙ্গাচড়া, পার্বতীপুর, চিরিরবন্দর, খানসামাসহ আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ তিস্তা প্রকল্পের সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের বরেন্দ্র অঞ্চলসহ আরো ভাটিতে ত্বরান্বিত হচ্ছে মরূকরণ। তিস্তা অববাহিকার ৫ হাজার ৪২৭টি গ্রামের মানুষ তাদের জীবিকার জন্য এই নদীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেরশ্বর গ্রাম পশ্চিমে রেখে, লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়নের সদরপাড়া গ্রাম পূর্বে রেখে তিস্তা বাংলাদেশে ঢুকেছে। প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা হয়ে সর্বশেষ গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা হয়ে যমুনা, তারপর পদ্মায় গিয়ে মিশেছে।
অববাহিকার ৮ হাজার ৫১ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে পড়লেও সমতলে তিস্তা অববাহিকার পরিমাণ ৪ হাজার ১০৮ বর্গকিলোমিটার, যার অর্ধেক অংশ বাংলাদেশের সীমানায়। বিগত দুই দশক ধরেই চলছে পানি সরিয়ে নেওয়া এবং আমাদের পানিশূন্যতার কাজটি। ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র করেছে ভারত। আমাদের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকায় নদীর পানি ছাড়া অন্য কোনো সেচের ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ করা যাচ্ছে না।
ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজের পর থেকে ৯৭ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল পানিশূন্যতার ফলে বাংলাদেশ অংশের বিশাল পরিমাণ নদীগর্ভ পরিণত হচ্ছে বালুচরে। মারা যাচ্ছে নদীটি, যা আমাদের প্রধান পানির উৎস। মনে রাখা দরকার, এই তিস্তা নদী আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতার ফলে গাইবান্ধা হয়ে সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত যমুনার প্রবাহ কমে গেছে। নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য এখন প্রবল হুমকির সম্মুখীন। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে যাওয়ায় রংপুর ও ডালিয়ার আশপাশে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৫০-৬০ ফুট বা আরো নিচে চলে গেছে।
আমাদের উত্তরাঞ্চলের পাঁচটি জেলার ৯ লাখ ৬১ হাজার হেক্টর জমি সেচ সুবিধা থেকে এখন বঞ্চিত। করতোয়া, কাটাখালী, ঘাঘট, দুধকুমার, যমুনেশ্বরী ও বুড়িতিস্তা নদী এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ৩ লাখ হেক্টর এলাকার মাছ বিলুপ্ত। সীমান্তের উজানে ভারতের গজলডোবা বাঁধসহ জলাধার ও খাল নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ভেতরে এই পানিশূন্যতা। শুষ্ক মৌসুমে এখন আর কোনো পানিই থাকছে না।
বাংলাদেশকে না জানিয়েই ভারত উজানে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং এর সঙ্গে আরও ১৬টি ব্যারাজ, ড্যাম ও খাল সংযুক্ত করেছে, যা হেলসিংকি এবং জাতিসংঘের পানিসংক্রান্ত নীতিমালার পরিপন্থী।
তিস্তার উৎপত্তিস্থল সিকিমের একটি হৃদ থেকে। মাঝপথে পানি সরিয়ে মহানন্দা নদীসহ আরো পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে । গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সংযোগ স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ভারত প্রায় ৭৯ বছর আগে থেকেই ভাবতে শুরু করেছিল—এটি ভারতের সর্ববৃহৎ প্রকল্প ‘নদী সংযোগ প্রকল্প’ এবং সর্বোচ্চ বাজেটের প্রকল্প। এটির ধারণা এসেছে নেহরু মন্ত্রিসভার পানিসম্পদমন্ত্রী কেএল রাওয়ের ‘ওয়াটার রিসোর্সেস অব ইন্ডিয়া’ নামক একটি পরিকল্পনাপত্র থেকে। কেএল রাও তার ‘ওয়াটার রিসোর্সেস অব ইন্ডিয়া’ বইটিতে গোটা ভারতের সব নদী ও খাল সংযুক্তকরণের একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে ২০০৪ সালে বাজপেয়ী সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করলে মোদি সরকার অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে গজলডোবা বাঁধসহ সন্নিহিত আরো ১৬টি স্থাপনা নির্মাণ করে। আমাদের উত্তর-পূর্ব দিকে টিপাইমুখ বাঁধ এবং পশ্চিমে ফারাক্কাসহ প্রায় সবকটি অভিন্ন নদীতে বাঁধ, ড্যাম ও গ্রোয়েন নির্মাণ করে। ভারত তার পশ্চিম প্রান্তে পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সিন্ধু পানি চুক্তি (Indus Waters Treaty) পর্যন্ত সম্প্রসারণ করে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেছে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, ভারত সিন্ধু চুক্তিটি স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে। পাকিস্তান আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়। আন্তর্জাতিক আদালতের রায় হচ্ছে, চুক্তিটি এখনো বহাল আছে। কিন্তু ভারত আদালতের রায় উপেক্ষা করে সিন্ধু চুক্তিটি স্থগিত করে রেখেছে। অথচ সিন্ধু নদীর পানি হচ্ছে খরাকবলিত পাকিস্তানের লাইফলাইন। তেমনি তিস্তার পানিও বাংলাদেশের জন্য জীবন-মরণের প্রশ্ন। মোট প্রবাহের ৬৫ শতাংশ পানিই আমরা তিস্তার মাধ্যমেই পেতাম।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। বাংলাদেশের সম্মতি ছাড়া ভারত উজানের পানি এভাবে সরিয়ে নিতে পারে না। বাংলাদেশ এখন জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক নদনদী-সংক্রান্ত ১৯৯৭ সালের কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ। সনদটিতে আন্তর্জাতিক নদনদীর প্রতি অংশীদার দেশগুলোর আচরণসংক্রান্ত বিস্তারিত নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
আমাদের এখন কী করতে হবে? প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট থেকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পর্যন্ত ১১৫ কিলোমিটার নদীর প্রশস্ততা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৮০ কিলোমিটারে নিয়ে আসতে পারে; ১৩টি শাখানদী ও সন্নিহিত খালের সংযোগ করতে পারে। এখানে উল্লেখ করা দরকার, মূল নদীর প্রবাহটির প্রশস্ততা এক কিলোমিটারে ধরে রেখে শাখানদীগুলো খনন করে খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা বৃদ্ধি করলে শুষ্ক মৌসুমে এগুলোয় পানিধারণ-ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। প্রয়োজনে দুপাড়ে হার্ডরক দিয়ে বাঁধাই করা যেতে পারে। আমাদের কাজটি আমাদেরই করতে হবে; কারণ ভারতের বৃহত্তর নদী সংযোগ প্রকল্পটি প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি করবে না।
বিগত দিনগুলোয় ভারতের আচরণে এটি স্পষ্ট হয়েছে। তবে একটি আশঙ্কার কথা হচ্ছে—ভারতের গজলডোবাসহ সন্নিহিত অঞ্চলে ন্যূনতম ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হলে বন্যার তোড়ে আমাদের নিম্ন অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের তাণ্ডব বয়ে যেতে পারে। উজানে যেহেতু ভারতের এত সব স্থাপনা, খাল ও নদী সংযোগ রয়েছে, তাই ভারত ২০১১ সালের প্রণীত খসড়া চুক্তিটি কিছুতেই করবে না।
লেখক: গবেষক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

