অবাধ পুঁজির আগ্রাসনে বিশ্বসভ্যতা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। সামাজিক শৃঙ্খলা আগ্রাসনের মুখে রয়েছে। বিষয়টি কোনো দেশের একক ব্যাপার নয়, বরং ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। রাজার আনুকূল্যে থাকা যাজকদের অসদাচরণে ইউরোপীয় রেনেসাঁ হলেও তার পরবর্তী ইতিহাসে বিশ্ব নয়া বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে। শিল্পবিপ্লবের জের ধরে পৃথিবীতে স্থান করে নেয় নতুন ক্রীতদাস প্রথা। বলা হয় এর নিরসন হয়েছে। বাস্তবে কিছুই হয়নি। কথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ন্ত্রিত পুঁজির বেপরোয়া দাপট মূলত বিশ্বকে যে মাত্রায় বিভাজিত করেছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতিতে স্থান করে নেয় সমাজতন্ত্র। মানুষের মুক্তির স্লোগান নিয়ে আসা এ মতবাদ কার্যত ৭০ বছরও টিকে থাকতে পারেনি। মানুষের বিবেক নাড়া দিয়েছে; কারণ কেবল ভাত-কাপড়ই যথেষ্ট নয়—মানুষ তার মনের কথা, ভাবের কথা, চিন্তার কথা বলতে চায়। কেবল ভাত-কাপড়ের কথা বলে দাস বানানোর এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠার পরিণতিতেই ভেঙে পড়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে সেটাই শেষ কথা নয়।
আধুনিক চীন গড়ে উঠেছে আরেকটু ভিন্ন ধারায়। বর্তমান আলোচনায় চীনকে প্রাসঙ্গিক মনে করছি এ কারণে যে, চীনের সব খবর পাওয়া যায় না; তবে প্রাপ্ত তথ্যাদি মোতাবেক দেখা যায়, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচারের সাজা মারাত্মক। আমেরিকা বা ইউরোপে যেখানে এ অপরাধকে মূলত রাজনীতির জন্য গর্হিত বিবেচনা হয় না, সেখানে চীনে এসব অপরাধ ও অপরাধীকে কঠিন সাজার আওতায় আনা হয়। অপরাধ বিবেচনায় এদের বেলায় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। সাজা হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজিরও রয়েছে। এখানেও মূলত অবাধ পুঁজির বিষয়টি বিবেচ্য। চীনা সমাজ মার্কিন সমাজের চেয়ে আলাদা। বিশ্বব্যবস্থায় এ আলোচনা খুব একটা জায়গা করে নেয় না, কারণ অবাধ পুঁজির প্রতিপালকরা শেষমেষ এটিকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবেই দেখে থাকে। এই দেখার ব্যাপারটি নিয়েই বোধকরি জটিলতা। ধরুন এপস্টাইন কেলেঙ্কারির কথা।
প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা গেছে, নাবালক শিশু মেয়েদের ব্যবহার করা হয়েছে অপকর্মে। শুধু তাই নয়, ব্যবহারের পর হত্যা করা হয়েছে। আর তাদের মায়েরা তাদের বিক্রি করে দিয়েছে টাকার বিনিময়ে। এই কেলেঙ্কারির মূলে যে কাজ করেছে, সেও একজন মহিলা। এপস্টাইনের এই ঘটনা আর বাংলাদেশের রমিজার ঘটনার মধ্যে মিল-অমিল খুঁজতে গেলে খুব একটা পার্থক্য পাওয়া যাবে না। শুধু রমিজা কেন, হাটে-ঘাটে-মাঠে সর্বত্রই এ দৃশ্য চোখে পড়ছে। বিশ্বব্যাপী পর্নোগ্রাফি সবচেয়ে বড় ব্যবসা । যে ইউরোপীয় বিশ্ব মানবতা ফেরি করছে, ইসলামকে সভ্যতার সংকট বলে অভিহিত করছে, তারাই নারীকে পণ্যে পরিণত করেছে। এ পরিণতকরণের বিষয়টির ইতিহাসও ভিন্ন রকম। সে ইতিহাসে যা-ই থাকুক বাস্তবে নিজেদের স্বার্থে কথিত নারী স্বাধীনতার নামাবলি পায়ে দিয়ে আজ সভ্যতাকে হুমকির মুখে নিয়ে এসেছে মূলত অবাধ পুঁজির আগ্রাসন। টাকা চাই একটু ভালো থাকার নিমিত্তে, তাই ন্যায়-অন্যায় বা অন্যকিছুর বিনিময়ে জীবনকে বিলিয়ে দিয়ে মানবতাকে বিসর্জন দিয়ে আজ পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলেছে অর্থনৈতিক আগ্রাসন।
পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারের পর এটি জাপানে হানা দেওয়ায় বিশ্ব দেখেছে এর ভয়াবহতা। আবিষ্কারক আইনস্টাইন বেদনাহত হয়েছেন। আজকের সভ্যতা ধ্বংসকারী আর্থিক আগ্রাসন যেভাবে সমাজকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে, তার বিবরণ আমরা কিছুটা হয়তো দেখি; কিন্তু ভাবি না।
আফ্রিকার একটি দেশ সফরে গিয়ে দেখেছি, সেখানে ষাটোর্ধ্ব কোনো নাগরিক বলতে গেলে নেই। যারা আছেন তারা মুসলিম। কারণ জানতে চেয়ে জানলাম, এইডস-আক্রান্ত হয়ে খুব অল্প বয়সেই এরা প্রাণ হারাচ্ছে। রাস্তার পাশে অবারিত মদের দোকান ও অবাধ যৌনাচার পুরো সমাজকেই বিপজ্জনক করে তুলেছে। কেউ দেখে না, দেখার কেউ নেই। কেন বিশ্বে এইডস দেখা দিয়েছে? সবাই জানে অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার। আর্থিক আগ্রাসনের পরিণতি। বিশ্ব আজ এই আগ্রাসনের নিরুপায় শিকার। দেখা যায় না, বোঝা যায় না; রূপ প্রকাশিত। যে কথা বলছিলাম—বেপরোয়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকার কারণে বিশ্বব্যবস্থায় এ নতুন সংকট ঘনীভূত হয়েছে। এখন ভাবার সময় এসেছে—কীভাবে বিশ্বসভ্যতাকে বাঁচিয়ে তোলা যায়।
সম্প্রতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, গত ছ’মাসে কিছুই বদলায়নি। অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের আমলে চলা কোনো অপকর্মের অবসান করা যায়নি। তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সে জায়গাতেই আসা যাক। প্রধানমন্ত্রী একটি ভারসাম্যমূলক অর্থব্যবস্থার কথা বলেছেন। আসলে তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়া অনুসৃত অর্থনীতির সপক্ষে কথা বলেছেন। এটি যৌক্তিক। রাষ্ট্রপতি জিয়া মডেল জাতীয় উন্নয়নের সূত্র হতে পারে। উন্নয়নের বেলায় আমরা চীন-মালয়েশিয়াকে অনুসরণ করতে পারি। কারণ এসব দেশ উন্নয়নের জোয়ারে যাওয়ার সময় জাতীয় বৈশিষ্ট্যে আপস করেনি। বৈশ্বিক মডেল গ্রহণের যে ক্ষতিকর দিক রয়েছে, সেটি বিবেচনায় না নিলে আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা সম্ভব নয়। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক আগ্রাসনের যে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তাতে সভ্যতা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একে রুখতে হলে নিঃসন্দেহে সমাজে, রাষ্ট্রে ও বিশ্বে প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ করতে হবে। এটি নিশ্চিত করতে মূল্যবোধবিরোধী যে ঐক্য রয়েছে, সেখানে কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক বিতর্ক যা-ই থাকুক আজ সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে সামাজিকভাবে আর্থিক আগ্রাসন। অসম প্রতিযোগিতার অর্থনীতির বিপরীতে ভারসাম্যমূলক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ জরুরি। বেঁচে থাকতে গিয়ে আমরা যারা পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলছি, তাদের বুঝতে হবে, বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য সুস্থ সমাজব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, ঘুস ও দুর্বৃত্তায়নমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর সমাজে ব্যভিচার রোধের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, তবে তা খুব স্বল্প সময়ের জন্য। একটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে আমরা যেসব বিষয়ে ঐক্যের কথা বলছি, তা নিয়ে আলোচনা অর্থহীন নয়; তবে সমাজে যে সামাজিক দুর্বৃত্তায়নের চিত্র ফুটে উঠছে এবং তাতে দলমত নির্বিশেষে যে ঐক্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, তা বহাল থাকলে কোনো ঐক্যই সমাজকে পরিশুদ্ধ বা ফ্যাসিবাদমুক্ত করতে পারবে না। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিমুক্ত সমাজ গঠনে সমাজের অর্থনৈতিক আগ্রাসনমুক্ত ব্যবস্থা বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সামাজিক অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধের মতোই গুরুতর ভাবতে হবে এবং এসব অপরাধীদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। নিছক ব্যক্তিগত অপরাধের সংজ্ঞায় না ফেলে সুনির্দিষ্টকরণ জরুরি। দেশ বিনির্মাণে একে ফ্যাসিবাদের মতোই এক নম্বর শত্রু হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। সমাজে মূল্যবোধের চর্চাকে নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সমাজকে সংগত পথে নেওয়া যায়—এ কথা বাংলাদেশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়া প্রমাণ করেছিলেন। সে প্রমাণিত পথেই হোক আমাদের যাত্রা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

