ভারতের পার্লামেন্টে ‘বন্দে মাতরম’ গানকে দেশটির জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর সমান আইনগত মর্যাদা দিয়ে নতুন বিল পাস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই আইনে গানটির অবমাননা করা বা গানে বাধা দিলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান করা হয়েছে। বিরোধী দল ও মুসলিমদের সংগঠনগুলো বলছে, এটি জোর করে মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া চেষ্টা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যুতে ভারতের পার্লামেন্ট ১৯৪৯ সালে যে বিধানটি ইচ্ছাকৃতভাবে পাস করেনি, বর্তমান পার্লামেন্ট আইনের মাধ্যমে সেটাই করছে। ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’-এর মাধ্যমে জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ও সংবিধান বর্তমানে যে আইনি সুরক্ষা পায়, তা ‘বন্দে মাতরম’-এর ক্ষেত্রেও (এর ছয়টি স্তবকের জন্য) সম্প্রসারিত করা হবে। এই গানটির প্রতি ইচ্ছাকৃত অবমাননা বা এতে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য ১৯৭১ সালের আইনের ৩ নম্বর ধারায় নির্ধারিত শাস্তিই প্রযোজ্য হবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটিকে একটি প্রযুক্তিগত সংশোধনী বলে মনে হতে পারে, যা ভারতের জাতীয় চেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি গানের মর্যাদাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছেÑনরেন্দ্র মোদির সরকার নতুন আইন করতে গিয়ে এমন একটি প্রশ্নের পুনরুত্থান ঘটাচ্ছে, যার উত্তর ভারতের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা আগেই দিয়ে রেখেছেন।
১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ‘বন্দে মাতরম’-সংক্রান্ত ‘সমস্যা’ নিয়ে আলোচনা করা হয়। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন, সর্দার প্যাটেল এতে সমর্থন জানান এবং বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী (এম কে গান্ধী) বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল সর্বসম্মত ও সুচিন্তিত একটি অভিমত। এতে বলা হয়েছিল, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার প্রথম দুটি স্তবকে গানটির প্রতিরোধ ও একাত্মবোধের মূল সুরটি ফুটে উঠেছে। পরবর্তী স্তবকগুলোতে, যেখানে ‘দশ প্রহরণধারিণী’ দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোকে জাতীয় সমাবেশ থেকে বাদ দেওয়া ‘কোনোভাবেই আপত্তিকর’ নয়।
কারণ, সব ধর্মের নাগরিকদের ওপর ভক্তিপূর্ণ স্তবক বা ধর্মীয় ভাবাপন্ন গান চাপিয়ে দেওয়া কখনোই একটি বহুত্ববাদী প্রজাতন্ত্রকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না। এটি কোনো আপসকামী কংগ্রেসের প্রান্তিক বা বিচ্ছিন্ন মত ছিল না। রবীন্দ্রনাথও শুধু প্রথম দুটি স্তবক রাখার বিষয়টি সমর্থন করেছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরো সময়ে মধ্যপন্থি থেকে শুরু করে বিপ্লবী সবার মধ্যেই এ বিষয়ে ঐকমত্য ছিল।
সেই সমঝোতা সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ‘জনগণমন’কে জাতীয় সংগীত ঘোষণা করেন এবং ‘বন্দে মাতরম’কেও ‘সমান মর্যাদা’ দেওয়ার কথা বলেন। তবে এই সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল গানটির সেই রূপকে, যা জনজীবনে প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ সেই দুটি স্তবক, যা স্বাধীনতার মিছিলে ও কারাগারে হিন্দু-মুসলমানরা সম্মিলিতভাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধ্বনি হিসেবে গেয়েছিল। গণপরিষদ কিন্তু গানটির ছয়টি স্তবক গ্রহণ করেনি। ১৯৭৬ সালে সংসদ যখন সংবিধানে ‘মৌলিক কর্তব্য’ অন্তর্ভুক্ত করে, তখন ৫১-এ অনুচ্ছেদে জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতকে নাগরিক শ্রদ্ধার বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বন্দে মাতরম-এর বিষয়ে সেখানে কোনো কিছু উল্লেখ ছিল না।
এটা কোনো অসতর্কতার ফল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সচেতন সিদ্ধান্ত এবং এমন একদল মানুষের সিদ্ধান্ত যারা দেশভাগের মাধ্যমে ক্ষতবিক্ষত এই উপমহাদেশে ভারতকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার পথে হাঁটছিলেন। তারা এমন একটি বিষয় অনুধাবন করেছিলেন, যা হয়তো প্রতিটি প্রজন্মকেই নতুন করে শিখতে হয় যে, কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এমন কোনো দেবতার বন্দনা গাইতে বাধ্য করতে পারে না, যারা সর্বজনীনভাবে তাদের সবার আরাধ্য নন।
শ্রদ্ধা ও বাধ্যবাধকতা এক নয়
১৯৮৬ সালে ‘বিজো ইমানুয়েল বনাম কেরালা রাজ্য’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করে। এই মামলার বিষয়বস্তু ছিলÑকেরালার ‘জেহোভাস উইটনেস’ (Jehovah’s Witness) সম্প্রদায়ের তিনটি শিশু প্রতিদিন সকালে জাতীয় সংগীত চলার সময় গানটি গাইত না, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকত, কারণ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী তা নিষিদ্ধ ছিল। তারা কোনো বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করেনি। তা সত্ত্বেও তাদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট এই বহিষ্কারাদেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। বিচারপতি ও. চিনাপ্পা রেড্ডি তার রায়ে দেওয়া এক পর্যবেক্ষণ বলেছেন, ‘জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে সম্মান জানানোই যথেষ্ট, গাওয়ার সময় কণ্ঠ না মেলালেই যে অসম্মান করা হয়, তা বলা ঠিক নয়। বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকেও নীরব থাকা কোনো আইন লঙ্ঘন করে না। আদালত এ ক্ষেত্রে ‘ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া স্টেট বোর্ড অব এডুকেশন বনাম বার্নেট’ মামলায় বিচারপতি রবার্ট জ্যাকসনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মকর্তা মতামত বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো মতবাদ চাপিয়ে দিতে পারেন না কিংবা নাগরিকদের কথা বা কাজের মাধ্যমে তাদের বিশ্বাস প্রকাশ করতে বাধ্য করতে পারেন না।’
এখানেই ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে ২০২৬ সালের বিলটি এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট যখন রায় দিয়েছে, নাগরিকদের জাতীয় সংগীত গাইতেও বাধ্য করা যায় না অথচ জাতীয় সংগীতের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা উভয়ই আছে, তখন ‘জাতীয় সংগীত’ বা ‘বন্দে মাতরম’র ক্ষেত্রে নাগরিকদের গাইতে বাধ্য করার যুক্তিটি ধোপে টেকে না। কারণ ‘জাতীয় সংগীত’র ক্ষেত্রে সে ধরনের কোনো সাংবিধানিক বা আইনি সুরক্ষা নেই।
‘বন্দে মাতরম’র প্রতি ‘অসম্মান’ প্রদর্শনের জন্য শাস্তির বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করলেই ‘বিজো ইমানুয়েল’ মামলার রায় অকার্যকর হয়ে যায় না। আদালতগুলো ধারাবাহিকভাবে ১৯৭১ সালের আইনের ৩ নম্বর ধারার ব্যাখ্যায় ‘ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাঘাত ঘটানো’র বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং একাধিক হাইকোর্ট রায় দিয়েছে, নীরব থেকে অংশগ্রহণ না করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ না করায় শাস্তির বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করায় সেই পরিবেশটাই বদলে যাচ্ছে।
এর মধ্যে আরেকটি কৌতুকপূর্ণ বা বিদ্রুপাত্মক বিষয়ও আছে। এই বিলের ওপর ভোটদানকারী ৭৮৮ জন সদস্যের মধ্যে কতজন এর ছয়টি স্তবকই মুখস্থ বলতে পারেন, অর্থ ব্যাখ্যা করা তো দূরের কথা, তা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো জরিপ হয়নি। প্রথম দুটি স্তবক অনেকের কাছেই পরিচিত হতে পারে, কারণ স্কুলে এবং সারা দেশে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সেগুলো গাওয়া হতো। নদী, ফলের বাগান এবং চাঁদের আলোর যে চিত্রকল্প সেখানে আছে, তা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে যেকোনো ভারতীয়র কাছেই সহজবোধ্য।
বাকি চারটি স্তবকের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্কৃত ঘেঁষা ও জটিল বাংলা ভাষায় রচিত এবং দুর্গা, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে বিশেষ বিশেষ অভিধায় সম্বোধনকারী এই স্তবকগুলোকে ১৯৩৭ সালেই জনজীবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর কারণ ছিল অত্যন্ত স্পষ্টÑবাংলার বাইরের খুব কম ভারতীয়ই এদের অর্থ ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেন। কোনো আইনপ্রণেতা বা নাগরিককে কোনো স্তবকের সম্মানে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করা যেতে পারে, কিন্তু কাউকে তা বুঝতে বাধ্য করা যায় না।
তাই প্রশ্ন জাগে, আইনসভার যে সদস্যরা এই বিলের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন, যে স্তবকগুলোর সুরক্ষার জন্য তারা কারাদণ্ডের বিধান রাখতে চলেছেন, তাদের কতজন এগুলোর অর্থ কারো সহায়তা ছাড়াই অনুবাদ করতে পারবেন? যে পাঠ্যটি অধিকাংশ আইনপ্রণেতা পুরোপুরি আবৃত্তি বা ব্যাখ্যা করতে পারেন না, তাকে কেন্দ্র করে শাস্তিমূলক আইনপ্রণয়ন করাটা কোনোভাবেই শ্রদ্ধা প্রদর্শন নয়।
‘বন্দে মাতরম’ স্বাধীনতা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত করেছিল। কিন্তু এটার প্রতি কিন্তু শ্রদ্ধা আর বাধ্যবাধকতা এক বিষয় নয়। সমান নাগরিকত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি প্রজাতন্ত্রে সবার একই ভাষায় প্রার্থনা করার কোনো আবশ্যিকতা নেই। সংবিধানপ্রণেতারা আমাদের চেয়েও বিষয়টি ভালো বুঝেছিলেন। তাদের কাছে ভিন্নমত পোষণের অধিকারকে সুরক্ষিত রাখাই ছিল জরুরি।
দ্য প্রিন্ট অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

