‘সরকার ও বিরোধী দলে যুদ্ধ কেন’—এ প্রশ্নটি শিরোনামে রেখে উদ্ভূত পরিস্থিতি, এর কারণ ও সম্ভাব্য কিছু পরিণতি নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন আমার দেশ-এর নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ! মুশকিল হলো—এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী খেলোয়াড়রা এ রকম কোনো রেফারি বা আম্পায়ারকে জায়গা দিতে চাচ্ছেন না। এখানে যারা বিবেকের তাগিদে রেফারি বা আম্পায়ার কিংবা ফায়ার ফাইটার হিসেবে ভূমিকা রাখতে চাচ্ছেন, তাদের কখনো গুপ্ত জামায়াত কিংবা কখনো বিএনপির দালাল খেতাব দেওয়া হচ্ছে!
আসলে ৫ আগস্টের আগে যারা আমরা শেখ হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ফ্রন্টে একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি, তারা আজ একজন অন্যজনের মুখোমুখি! মাঝেমধ্যে মনে হয় বিএনপি এবং জামায়াত- এনসিপির মধ্যকার বর্তমান তিক্ততা আগের আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের তিক্ততার চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়! এই তিক্ততাকে কাজে লাগাবে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল প্রতিপক্ষ শক্তিটি।
সরকারের বয়স ৩৬দিন, না হলেও বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সরকার পতনের জন্য ৩৬ ঘণ্টার আলটিমেটাম উচ্চারণ করা হচ্ছে! কেন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, এখন আমাদের গন্তব্য কোনদিকে—ইসলামের ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক ঘটনা আমাদের তা বলে দিতে পারে। উভয় পক্ষকে একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনার অনুরোধ জানাচ্ছি!
সরকারের বাইরে থেকে অনেক সমালোচনা সহজ; কিন্তু ভেতরের বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। এনসিপির নাহিদ এবং আসিফ সরকারে ছিলেন। তখন জুলাই সনদকে বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশি কিছু করেছেন বলে চোখে পড়েনি! বিএনপি এবং জামায়াতসহ অন্যান্য দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও এনসিপি তখন করেনি। সেই তারাই এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির ভিন্ন পদ্ধতি সহ্য করতে পারছেন না বা তার জন্য একটু ধৈর্য ধারণ করতে পারছেন না। সরকারও বোধহয় পুরো বিষয়টি ঠিকভাবে হ্যান্ডেল করতে পারছে না! এ ব্যাপারে সরকারের একটা অংশের আনাড়িপনা, কারো কারো অতিকথন বা ওভার কনফিডেন্স জনগণের মধ্যে একটা অবিশ্বাস বা সন্দেহ দানা বাঁধিয়ে ফেলছে!
বিষয়গুলো নিয়ে যে বিতর্ক ও ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে—তা জনগণের কাছে স্পষ্ট না করলে সরকারের জন্য আশু বিপদের কারণ হতে পারে। টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান, আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ঘরানার মানুষগুলোর সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো দেখলেই সম্ভবত বুঝতে পারবেন যে বাতাস আসলে কোনদিকে প্রবাহিত হচ্ছে! শহিদুল আলম বলেছেন, যদিও আমি জামায়াত-শিবির ঘোরবিরোধী, তবু আমি শিবিরের প্রোগ্রামে এসেছি । কারণ জুলাই সনদ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ।
কাজেই বারুদ (বুদ্ধিবৃত্তিক ক্যাপসুলে জনরোষ) ছড়ানো হচ্ছে। আর স্পনটেনিয়াস আগুনটি আসবে জ্বালানি সংকটের মতো কোনো সংকটের মধ্য দিয়ে! ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সংঘাতের কারণে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতিটিও খুব সন্তোষজনক বলে মনে হচ্ছে না। একটি রাষ্ট্রের খাদ্য নিরাপত্তার মতোই স্পর্শকাতর হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। অনেক আগে থেকেই এর জন্য চ্যানেল তৈরি করে রাখতে হয়। প্রেশার অনুভূত হলে টয়লেট খুঁজলে হবে না। অনেক আগে থেকেই এটি নিশ্চিত করে রাখতে হয়। তা না হলে শেষ মুহূর্তের ছটফটানিকে বাণিজ্যের মসলা গণ্য করে গ্লোবাল তৈল বনিয়ারা! আর পেছনে যদি জিও-পলিটিক্যাল বাজিকররা ইন্ধন জোগান, তাহলে তো আর কথাই নেই। আওয়ামী লীগ প্রায়ই বলে, ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র আগের ওয়াদামতো একটি খাবারবোঝাই জাহাজ না পাঠানোতেই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয়েছিল। কথাটি যেই বলুক, বিষয়টি স্মরণে রাখলে সরকারের জন্য ভালো হবে।
গ্লোবাল এই ক্রাইসিস মোকাবিলায় সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে যে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রত্যাশা করেছিলাম—তা পাইনি! এখানে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট হলেও বিরোধী দলও তাদের দায় এড়াতে পারবেন না।
তাছাড়া অতি আহ্লাদে আমাদের সবগুলো ডিম এক ঝুড়িতে রাখা নিরাপদ হচ্ছে না! ইরান-চায়না-রাশিয়ান বলয় শক্তিশালী হওয়ার আলামত স্পষ্ট হয়ে পড়ছে। তারপরও আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অন্য কর্তাব্যক্তিরা যে কনফিডেন্সে দিল্লি-ওয়াশিংটন করছেন—তা দেখেও কিছুটা খটকা লাগছে। ওয়াশিংটন-দিল্লির পর এপ্রিলের শেষদিকে নাকি তিনি বেইজিং যাবেন! ততদিনে ‘ফেওচ্চা’ রাজা বনে যেতে পারে (ছোটবেলায় শোনা একটা প্রবাদ) ।
বিরোধী জোটকে দেখেও মনে হচ্ছে গল্পের সেই শিয়ালের মতো—যে দোয়া করছে, ‘হে আল্লাহ! গাছের উপর পর্যন্ত ডুবিয়ে দাও, দেখি কাক বেটা কোথায় থাকে?’ ভাবনার এমনই এক দোলকে বসে সরকারি দল ও বিরোধী দলের উদ্দেশে আজকের লেখাটি সমর্পণ করছি।
ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতগুলো সবসময় শত্রু ও মিত্রের মধ্যে ঘটে না। অনেক সময় সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব জন্ম নেয় একই লক্ষ্য সামনে রেখে চলা শক্তিগুলোর মধ্যেই—যখন তারা লক্ষ্য হারায় না, কিন্তু পথ নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
ইসলামের ইতিহাসে সিফফিনের যুদ্ধ ছিল এমনই এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেখানে কেউ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না, কেউ ন্যায়বিচারের বিরুদ্ধেও ছিল না। তবু আগে কী হবে, কীভাবে হবে, কত দ্রুত হবে—এই প্রশ্নের ভিন্ন উত্তরে মুসলিম উম্মাহ এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যার ক্ষত বহু যুগ ধরে বহন করতে হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানের উভয় পক্ষেই আশারায়ে মুবাশশারা কিংবা দুনিয়া থেকেই বেহেশতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবিরাও উপস্থিত ছিলেন! তারপরও এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধটি কীভাবে সংঘটিত হলো? এই যুদ্ধে অনেক বিখ্যাত সাহাবিসহ প্রায় ৭০ হাজার সাহাবি শহীদ হয়েছিলেন!
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে জুলাই সনদ, জুলাই ঘোষণাপত্র, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং অধ্যাদেশভিত্তিক বাস্তবায়ন ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা নিছক দলীয় মতভেদ নয়। এটি রাষ্ট্রচিন্তা, বিপ্লবের উত্তরাধিকার এবং ক্ষমতার পরবর্তী বিন্যাস নিয়ে এক গভীর টানাপোড়েন। আর এই দ্বন্দ্বকে বুঝতে চাইলে সিফফিনের দিকে একটু তাকালে ভালো হয়! ।

সিফফিনের যুদ্ধ : পটভূমি কী ছিল
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধাপে ধাপে খুলাফায়ে রাশেদিনের হাতে আসে। হজরত আবু বকর (রা.), হজরত উমর (রা.)-এর পর হজরত উসমান (রা.) মুসলিম বিশ্বের তৃতীয় খলিফা হন। কিন্তু তার শাসনামলের শেষদিকে প্রশাসনিক অসন্তোষ, আঞ্চলিক অসাম্য এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিযোগ ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। সেই অস্থিরতার পরিণতিতে হজরত উসমান (রা.) শহীদ হন—যা ছিল মুসলিম রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ মোড়।
উসমান (রা.)-এর শাহাদতের পর মুসলিম সমাজের সামনে দুটি জরুরি প্রশ্ন দাঁড়ায়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা দ্রুত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, খুনিদের বিচার নিশ্চিত করা।
এই দুই লক্ষ্য নিয়েই সবাই মোটামুটি একমত ছিলেন। কিন্তু দ্বন্দ্ব শুরু হয় অগ্রাধিকার ও পদ্ধতি নিয়ে। একদিকে দাবি উঠল—খুনিদের বিচার অবিলম্বে হতে হবে। অন্যদিকে বাস্তবতা ছিল—রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার মুখে; আগে সেটিকে সামলাতে হবে।
হজরত আলী (রা.)-এর অবস্থান ছিল রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ও বাস্তববাদী। তিনি বিচার অস্বীকার করেননি; বরং বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে বিচারও অকার্যকর হয়ে যায়। অন্যদিকে মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষের মনস্তত্ত্ব ছিল—বিচার বিলম্বিত মানেই অন্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। উভয় অবস্থানের ভেতরেই যুক্তি ছিল, আবেগ ছিল, নৈতিকতা ছিল। কিন্তু অনুপস্থিত ছিল সমন্বয়ের রাজনীতি। সিফফিনের ট্র্যাজেডি এখানেই : উদ্দেশ্য এক ছিল, কিন্তু অগ্রাধিকারের মতভেদকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে সামাল দেওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ : জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে নয়, দ্বন্দ্ব তার প্রয়োগ নিয়ে
বাংলাদেশেও আজ প্রায় একই ধরনের এক রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান যে একটি ঐতিহাসিক মোড়—এ নিয়ে কার্যত বড় কোনো রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে মৌলিক মতভেদ নেই। প্রশ্নটি অন্যত্র : এই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে?
এটি কি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে? এটি কি ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে? নাকি দ্রুত ও বাধ্যতামূলকভাবে এগোতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে আজ বিএনপি এবং জামায়াত–এনসিপির মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ক্ষমতার নয়, অগ্রাধিকারের দ্বন্দ্ব।
বিএনপি যা চাচ্ছে : রাষ্ট্র আগে, স্থিতি আগে
বিএনপির অবস্থান মোটামুটি স্পষ্ট। তারা জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্রের চেতনা অস্বীকার করছে না। বরং এর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু তারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে সতর্ক। তাদের আশঙ্কা—আজ যদি একটি গণঅভ্যুত্থানকে সংবিধানের অংশ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারবিরোধী গণআন্দোলন বা ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টাও একই ধরনের সাংবিধানিক বৈধতার দাবি তুলতে পারে। এতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও সাংবিধানিক কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনটি তাই মোটামুটি এ রকম : রাষ্ট্র আগে, প্রতিষ্ঠান আগে, স্থিতি আগে। অর্থাৎ, জুলাইয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্যকে স্বীকার করেও তারা চায়—এটি এমনভাবে বাস্তবায়িত হোক, যাতে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ বৈধতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
অধ্যাদেশের প্রশ্নেও তাদের আপত্তি একই জায়গায়—একতরফা তাড়াহুড়ো নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য। এ অবস্থান অনেকটাই সিফফিনে হজরত আলী (রা.)-এর রাষ্ট্রকেন্দ্রিক বাস্তববোধের প্রতিধ্বনি বহন করে।
জামায়াত-এনসিপি যা চাচ্ছে : বিপ্লবের ফসল আগে সুরক্ষিত করো
অন্যদিকে জামায়াত–এনসিপির দৃষ্টিতে জুলাই শুধু একটি অভ্যুত্থান নয়; এটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি। তাই তাদের কাছে প্রশ্নটি শুধু স্মৃতি বা স্বীকৃতির নয়; বরং ক্ষমতার চরিত্র বদলের। তারা মনে করে, যদি জুলাইয়ের অর্জনকে দ্রুত, দৃশ্যমান এবং সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত না করা হয়, তাহলে পুরোনো শক্তি, পুরোনো আপস এবং পুরোনো শাসনধারা আবার ফিরে আসবে।
তাদের রাজনৈতিক যুক্তি হলো : যে অভ্যুত্থান রাষ্ট্রকে বদলে দিয়েছে, তাকে রাষ্ট্রের বাইরে রেখে দেওয়া যায় না। তাই তারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি, একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপের পক্ষে। তাদের চোখে বিলম্ব মানেই ঝুঁকি; বিলম্ব মানেই বিপ্লবী শক্তির ক্ষয়; বিলম্ব মানেই পুরোনো রাজনীতির পুনরুত্থান।
এই মনস্তত্ত্ব অনেকটাই সিফফিনে ‘আগে বিচার, আগে দৃশ্যমান পদক্ষেপ’-এর অবস্থানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
আসল বিপদ : মতভেদ নয়, অবিশ্বাস
এখানে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—এ দুই অবস্থানকে যদি নৈতিক শত্রুতা হিসেবে দাঁড় করানো হয়। যদি বিএনপিকে বলা হয় ‘জুলাইবিরোধী’ আর জামায়াত-এনসিপিকে বলা হয় ‘অস্থিতিশীলতাপন্থি’, তাহলে বাংলাদেশ এমন এক পথে হাঁটবে, যেখানে রাজনৈতিক শক্তির পারস্পরিক ধ্বংসই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াবে।
যখন একই বৃহত্তর লক্ষ্যকে ঘিরে থাকা পক্ষগুলো একে অন্যকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত হারে। বাংলাদেশেও যদি স্থিতির রাজনীতি এবং রূপান্তরের রাজনীতি মুখোমুখি সংঘর্ষে পরিণত হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সেসব শক্তি, যারা সবসময়ই চায় বাংলাদেশ বিভক্ত, দুর্বল ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য থাকুক।
সমাধান : মর্যাদা, রোডম্যাপ, ঐকমত্য
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—জুলাইকে মর্যাদা দেওয়া, কিন্তু রাষ্ট্রকে ভেঙে না ফেলে। অর্থাৎ, এমন একটি পথ দরকার যেখানে—জুলাই সনদ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাবে, বাস্তবায়নের স্পষ্ট সময়রেখা থাকবে, রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য থাকবে এবং সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতাও অক্ষুণ্ণ থাকবে। এখানে কোনো একপক্ষের পূর্ণ বিজয় নয়; বরং দুই ধারার মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা-ই একমাত্র পথ।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে যারা শুধু ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখছেন, তারা আসল বিষয়টি ধরতে পারছেন না। বাস্তবে এটি একই লক্ষ্যকে ঘিরে অগ্রাধিকার, গতি ও পদ্ধতির সংঘাত। একপক্ষ চায় রাষ্ট্রকে আগে স্থিতিশীল করতে, অন্যপক্ষ চায় অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ফসলকে আগে সুরক্ষিত করতে। উভয় অবস্থানের ভেতরেই যুক্তি আছে, রাজনৈতিক সতর্কতাও আছে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন মতভেদকে শত্রুতায় আর রাজনৈতিক পার্থক্যকে বিশ্বাসঘাতকতার ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো দলকে হারানো নয়; বরং জুলাইয়ের শক্তিকে বিভক্ত না করে রাষ্ট্রীয় রূপ দেওয়া। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্য হলো—বহিরাগত শক্তি কখনোই একটি জাতিকে ততটা দুর্বল করতে পারে না, যতটা সে জাতি নিজেই নিজের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মাধ্যমে নিজেকে দুর্বল করে।
সিফফিনের শিক্ষা এখানেই। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আবেগ দরকার, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রজ্ঞা অপরিহার্য। আর যে জাতি এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে পারে না, সে জাতি শেষ পর্যন্ত নিজের বিজয়কেও পরাজয়ে রূপান্তরিত করে।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু বিরোধী শক্তি নয়—জুলাই পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
লেখক : কলামিস্ট
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

