বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা প্রায়ই ভুল প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে ব্যস্ত থাকি। প্রশ্ন করা হয়—‘আপনি বাঙালি, না মুসলমান? আপনি একাত্তরের পক্ষে, না ইসলামের পক্ষে? আপনি আধুনিক, না ধর্মীয়? প্রগতিশীল, না রক্ষণশীল?’
এসব প্রশ্নের মধ্যেই একটি বিপজ্জনক ফাঁদ লুকিয়ে আছে। কারণ প্রশ্নগুলো এমনভাবে সাজানো হয়, যেন একটি পরিচয় গ্রহণ করতে হলে অন্যটি বিসর্জন দিতে হবে। যেন বাঙালি হলে মুসলমান হওয়া যায় না, ইসলামকে ধারণ করলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করতে হয়, কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র চাইলে ধর্মীয় মূল্যবোধ পরিত্যাগ করতে হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এভাবে বিভক্ত কোনো সত্তা নয়। একজন নাগরিক একই সঙ্গে বাঙালি, বাংলাদেশি, মুসলমান বা অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী, আধুনিক, ঐতিহ্যসচেতন এবং গণতন্ত্রের সমর্থক হতে পারেন। পরিচয়ের এই বহুত্ব দুর্বলতা নয়; এটাই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক শক্তি।
আমাদের সংকট পরিচয়ের বহুত্বে নয়; সংকট হলো সেই বহুত্বকে রাজনৈতিকভাবে ধারণ করার অক্ষমতায়। আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট শুধু সরকার, নির্বাচন, কিংবা সংবিধানের সংকট নয়। এটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ইতিহাসবোধের সংকট।
জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সেই সংকটকে নগ্নভাবে আমাদের সামনে হাজির করেছে। একই সঙ্গে এটি একটি বিরল ঐতিহাসিক সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিয়েছে—পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রকে ভেঙে ন্যায়, মর্যাদা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের সম্ভাবনা।
ইতিহাস যখন ক্ষমতার সম্পত্তি হয়
১৯৭১ বাংলাদেশের জন্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও নৈতিক ভিত্তি। মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বোঝা অসম্ভব। কিন্তু একাত্তরের মর্যাদা রক্ষার অর্থ ইতিহাসের অন্য সব অধ্যায় মুছে ফেলা নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৭১ সালে শুরু হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন বাংলার সভ্যতা, সুলতানি আমলে একটি স্বতন্ত্র বাংলা রাষ্ট্রসত্তার উন্মেষ, মোগল আমলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ঔপনিবেশিক শোষণ, কৃষক ও জনতার প্রতিরোধ, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দীর্ঘ সংগ্রাম।
সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন ইতিহাসকে একটি দলের রাজনৈতিক সম্পত্তিতে পরিণত করা হয়। যে ইতিহাসের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার কথা, সেটিই তখন নাগরিকদের ভাগ করার অস্ত্র হয়ে ওঠে। ইতিহাস আর জাতির স্মৃতি থাকে না; হয়ে যায় শাসকের বৈধতার সনদ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক টোটেমবাদ—কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক বংশকে এমন পবিত্র প্রতীকে রূপ দেওয়া, যার প্রতি আনুগত্য সংবিধান, প্রতিষ্ঠান, আইন ও জনস্বার্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আর জনগণের থাকে না; সেগুলো ব্যক্তি ও দলের ইচ্ছা বাস্তবায়নের যন্ত্রে পরিণত হয়। সংসদ কার্যকারিতা হারায়, বিচারব্যবস্থা চাপে পড়ে, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষাগারে পরিণত হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নাগরিকের নিরাপত্তার বদলে শাসকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ধীরে ধীরে লুটতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদে রূপ নেয়।
জুলাইয়ের বিস্ফোরণ কেন ঘটেছিল
জুলাইয়ের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু খুব দ্রুত সেটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়। কারণ তরুণেরা বুঝতে পেরেছিল, কোটা কেবল একটি চাকরির নীতিমালা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রে সুযোগ বণ্টন, দলীয় আনুগত্য, বৈষম্য, নাগরিক মর্যাদা এবং ক্ষমতার জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বা ‘রাজাকারের নাতি’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা ছিল পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। এই কৌশলে সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি কিংবা বৈধতার সংকট নিয়ে আলোচনা না করে প্রতিবাদকারীকেই নৈতিকভাবে অপরাধী বানানো হয়। যুক্তির জবাব দেওয়া হয় অপবাদ দিয়ে; রাজনৈতিক মতভেদকে রূপ দেওয়া হয় দেশপ্রেম ও দেশদ্রোহের সংঘাতে।
কিন্তু জুলাইয়ে এই কৌশল আর কাজ করেনি। একটি নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের দেওয়া পরিচয় গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। তারা ভয়, অপবাদ, ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং নির্বিচার বলপ্রয়োগের মুখেও পিছু হটেনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ১১ হাজার ৭০০-এর বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন। নির্বিচার বলপ্রয়োগ, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠে এসেছে। এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, জুলাই শুধু সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল শাসনের নৈতিক ভিত্তির বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ।
তাই জুলাইকে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি স্মরণীয় তারিখ কিংবা ক্ষমতা পরিবর্তনের উৎসবে সীমাবদ্ধ করা হবে শহীদদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। জুলাইয়ের প্রকৃত দাবি ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা ক্ষমতাসীনের করুণার ওপর নির্ভর করবে না।
ইসলাম বনাম গণতন্ত্র: একটি ভুল বিতর্ক
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় আরেকটি বহুল প্রচলিত বিভাজন হলো ইসলাম ও গণতন্ত্রকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো। অথচ গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রশ্নে এই দুই ধারার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে।
আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি জনগণের সম্মতি, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা, জবাবদিহিতা, নাগরিক অধিকার, বহুত্ববাদ এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। অন্যদিকে ইসলামি রাজনৈতিক নৈতিকতার কেন্দ্রে রয়েছে ইনসাফ, আমানতদারি, শূরা বা পরামর্শ, জনকল্যাণ, জুলুমের বিরোধিতা এবং শাসকের জবাবদিহিতা।
অবশ্যই ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তা ও আধুনিক গণতন্ত্রের মধ্যে কিছু দার্শনিক পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু সেই পার্থক্যকে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সংবিধান, নাগরিক সমতা, মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রক্ষমতার সীমা নির্ধারণের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত সমন্বয় সম্ভব।
‘ইসলামি’ নাম ধারণ করলেই কোনো রাজনীতি ইসলামি ন্যায়বিচারের প্রতিনিধিত্ব করে না। যে রাজনীতি নাগরিক সমতা, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সুষ্ঠু নির্বাচন ও শাসকের জবাবদিহিতা স্বীকার করে না, তা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করলেও ইনসাফের রাজনীতি হতে পারে না। একইভাবে যে ধর্মনিরপেক্ষতা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসকে পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখে, ইসলামবিদ্বেষকে প্রগতিশীলতা মনে করে, কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে, সেটিও গণতান্ত্রিক নয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত সংঘাত তাই ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে নয়; সংঘাত ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি ও ক্ষমতাভিত্তিক রাজনীতির মধ্যে। একদিকে নাগরিক সমতা, অন্যদিকে দলীয় সুবিধা; একদিকে জবাবদিহিতা, অন্যদিকে ব্যক্তিপূজা; একদিকে আইনের শাসন, অন্যদিকে শাসকের আইন।
‘বাংলাদেশপন্থা’ কী
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে পুরোনো মতাদর্শের কোনো একটি খোপে বন্দি না করে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, সমাজ ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রদর্শন নির্মাণ করতে হবে। আমি এই সমন্বিত রাষ্ট্রচিন্তাকে বলছি ‘বাংলাদেশপন্থা’।
বাংলাদেশপন্থা কোনো দলের ইশতেহার নয়, কোনো গোষ্ঠীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কৌশলও নয়। এটি এমন একটি রাষ্ট্রদর্শনের প্রস্তাব, যার ভিত্তি চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো।
প্রথম স্তম্ভ ইসলামি নৈতিকতা—ইনসাফ, আমানতদারি, শূরা, জনকল্যাণ, দুর্নীতির বিরোধিতা এবং মানবমর্যাদা। এখানে লক্ষ্য ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট মডেল চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্র পুনর্গঠন করা।
দ্বিতীয় স্তম্ভ আধুনিক গণতন্ত্র ও সুশাসন—সংবিধানের সর্বোচ্চতা, আইনের শাসন, ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, অবাধ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শক্তিশালী সংসদ এবং সক্রিয় নাগরিক অংশগ্রহণ।
তৃতীয় স্তম্ভ বাংলাদেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। আমাদের ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কে অস্বীকার করা যাবে না, আবার কোনো একটি অধ্যায়কে দলীয় মালিকানায়ও দেওয়া যাবে না। সুলতানি বাংলার রাষ্ট্রগঠন, ঔপনিবেশিক প্রতিরোধ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের প্রতিটি সংগ্রাম—সব মিলিয়েই বাংলাদেশ।
চতুর্থ স্তম্ভ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা—মর্যাদা, সমতা, মেধার মূল্যায়ন, কর্তৃত্ববাদের বিরোধিতা, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
এই চারটি স্তম্ভ পরস্পরের শত্রু নয়। ইসলামি নৈতিকতা গণতন্ত্রকে নৈতিক ভিত্তি দিতে পারে; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে পারে; ইতিহাস জাতীয় পরিচয়কে গভীরতা দিতে পারে; আর জুলাইয়ের চেতনা রাষ্ট্রে নতুন প্রাণ ও রাজনৈতিক সাহস সঞ্চার করতে পারে।
রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ছয় অঙ্গীকার
‘বাংলাদেশপন্থা’ কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা হলে চলবে না; একে প্রতিষ্ঠানের ভাষায় অনুবাদ করতে হবে।
প্রথমত, সংবিধানে জনগণের সার্বভৌমত্ব, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নাগরিক সমতা এবং ন্যায়বিচারের দায়িত্ব সুস্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রধর্ম থাকবে কি থাকবে না—শুধু এই প্রতীকী বিতর্কে আটকে না থেকে দেখতে হবে, রাষ্ট্র বাস্তবে সব নাগরিককে সমান সুরক্ষা দিচ্ছে কি না।
দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীসহ নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার কার্যকর সাংবিধানিক সীমা নিশ্চিত করতে হবে। সংসদকে স্বাধীন ও কার্যকর করা, বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা এবং রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ বন্ধ করা জরুরি।
তৃতীয়ত, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। হেফাজতে নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে নির্বিচার বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত ও কঠোর জবাবদিহিতা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যে দল নিজের মধ্যে নির্বাচন, নেতৃত্বের পরিবর্তন ও আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে না, সে দল রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বাসযোগ্য দাবি করতে পারে না।
পঞ্চমত, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের রাজনৈতিক অর্থনীতি ভাঙতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা, সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা, ব্যাংক খাতে জবাবদিহিতা, অর্থ পাচারের তদন্ত এবং প্রকৃত মালিকানার তথ্য প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে। নৈতিক বক্তৃতা দিয়ে লুটতন্ত্র বন্ধ হয় না; প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যা ক্ষমতাবানকেও আইনের সামনে দাঁড় করাতে পারে।
ষষ্ঠত, জাতীয় পুনর্মিলনের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। ইসলামবিদ্বেষ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নারীবিদ্বেষ, মাজার ও উপাসনালয়ে আক্রমণ কিংবা ভিন্নমতের মুসলমানকে কাফির বা দেশদ্রোহী বলা সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। ধর্মীয় স্বাধীনতার অর্থ শুধু নিজের ধর্ম পালনের অধিকার নয়; অন্যের বিশ্বাস, অবিশ্বাস ও ভিন্ন ব্যাখ্যার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা।
জুলাই যেন নতুন টোটেম না হয়
আমাদের সামনে একটি বড় সতর্কতাও রয়েছে। অতীতে যেমন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি একচেটিয়া বৈধতার উৎসে পরিণত করেছে, তেমনি জুলাইয়ের স্মৃতিকেও কোনো দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হতে দেওয়া যাবে না।
জুলাইয়ের শহীদরা কোনো দলের একক সম্পদ নন। তাদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জনগণের যৌথ স্মৃতি এবং রাষ্ট্রের ওপর একটি স্থায়ী নৈতিক দাবি। শহীদ ও আহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ, সত্য উদ্ঘাটন, অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার এবং স্মৃতি সংরক্ষণ করতে হবে। কিন্তু জুলাইয়ের নামে নতুন ব্যক্তিপূজা, নতুন ইতিহাস-ব্যবসা, কিংবা নতুন নিপীড়নের বৈধতা তৈরি হলে সেটিই হবে জুলাইয়ের সবচেয়ে নির্মম পরাজয়।
বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য পুরোনো শাসককে সরিয়ে নতুন শাসক বসানোয় নয়; বরং এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণে, যেখানে কোনো শাসকই আর স্বৈরাচারী হতে না পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ‘বাঙালি না মুসলমান’, ‘একাত্তর না ইসলাম’, কিংবা ‘আধুনিকতা না ধর্ম’—এসব কৃত্রিম প্রশ্নের মধ্যে নেই। আমাদের সামনে প্রকৃত প্রশ্ন মাত্র কয়েকটি—রাষ্ট্র কি নাগরিককে মর্যাদা দেবে? ক্ষমতাবান কি আইনের অধীন থাকবে? ধর্ম ও মতনির্বিশেষে সবাই কি সমান নিরাপত্তা পাবে? জনগণ কি স্বাধীনভাবে শাসক নির্বাচন ও পরিবর্তন করতে পারবে? রাষ্ট্রের সম্পদ কি জনকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, না নতুন কোনো গোষ্ঠীর লুণ্ঠনের উপকরণ হবে?
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের জমিদারি নয়। রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, নাগরিকের আস্থায়; ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, ন্যায়বিচারে; নেতার মহিমায় নয়, প্রতিষ্ঠানের দৃঢ়তায়।
বাংলাদেশপন্থা তাই কোনো নতুন বিভাজনের নাম নয়। এটি বিভাজন অতিক্রম করার আহ্বান—এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন, যেখানে ইতিহাস থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের একচেটিয়া মালিকানা থাকবে না; ধর্ম থাকবে, কিন্তু ধর্মের নামে নিপীড়ন থাকবে না; রাজনীতি থাকবে, কিন্তু ব্যক্তিপূজা থাকবে না; স্বাধীনতা থাকবে, শুধু পতাকায় নয়—রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে এবং প্রতিটি নাগরিকের জীবনে।
লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নানইয়াং টেকনোলোজিকাল ইউনিভার্সিটি, সিঙ্গাপুর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


