সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমির

দেশ সেবার দায়িত্ব পেলে প্রতিশোধ ও বৈষম্যের রাজনীতির অবসান ঘটাবো

দেশ সেবার দায়িত্ব পেলে প্রতিশোধ ও বৈষম্যের রাজনীতির অবসান ঘটাবো

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এটিএম আজহারকে খালাসের রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে সত্যকে চেপে রাখা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে আমরা এমন সুবিচারপূর্ণ রায়ের অপেক্ষা করছিলাম।

বিজ্ঞাপন

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশপ্রেমিকদের পক্ষে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ যদি আমাদের দেশ সেবার দায়িত্ব দেয়, তাহলে আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা প্রতিশোধ ও বৈষম্যের রাজনীতির অবসান ঘটাবো। সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করবো। দেশ দুর্নীতি, বৈষম্য, অপরাজনীতিমুক্ত হোক, মানবিক একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা হোক- সেই প্রত্যাশা করে সবার দোয়া ও সাহায্য কামনা করেন ডা. শফিকুর রহমান।

সর্বোচ্চ আদালতে এটিএম আজহারের মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে খালাসের রায়ের পর মঙ্গলবার ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বেলা সাড়ে ১১টায় আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত আমির বলেন, বিগত শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ভয়ঙ্কর জুলুমের শিকার হয়েছে। জুলুম করে একে একে ১১ জন শীর্ষ দায়িত্বশীলকে মিথ্যা মামলায় সাজানো আদালত ও মিথ্যা সাক্ষীর মাধ্যমে কার্যত জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আজ সর্বোচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে সকল অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে। আজ মনে পড়ছে, জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ শীর্ষ যেসব নেতাকে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়েছে, তারা যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তারা তাদের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, অভিজ্ঞতা দিয়ে এ জাতিকে পথ দেখাতে পারতেন। ক্যাঙ্গারু কোর্ট তাদের হত্যা করেছে। তাদের স্মৃতি এ জাতির হৃদয়ে চির অম্লান হয়ে থাকবে। তারা বেঁচে থাকলে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতো।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এসব মামলা পরিচালনায় সীমাহীন জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা তার লেখায় সেটি স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, জামায়াত নেতাদের এ মামলায় আদালতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোনো আইন অনুসরণ করা হয়নি। আদালত পরিচালনাকারীদের ইচ্ছাই ছিল আইন, সেটা বৈধ হোক বা অবৈধ হোক। বৃটেনের আদালতে এই মামলা পরিচালনা করা হলে তারা এটাকে ‘জেনোসাইড অব জাস্টিজ’ বলেছেন। আর আজকে বাংলাদেশের আদালত তাই বলেছে। আমাদের আদালত বলেছে, সেটি ছিল ‘ন্যায়ভ্রষ্ট রায়’। সেই রায় বাতিল করে আজ আদালত এটিএম আজহারকে খালাস প্রদান করায় তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।

তিনি বলেন, এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সামান্য সুযোগও রাখা হয়নি। এমনকি হত্যার শিকার নেতাদের পরিবারের ওপরও নির্মম অত্যাচার করা হয়েছে। আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রাতে তার বাসায় হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের নাজেহাল করে জেলে নেয়া হয়। এভাবে একেকটি পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

জামায়াত আমির বলেন, স্কাইপ কেলেঙ্কারির ঘটনা গোটা বিশ্বে নিন্দিত হয়েছে। তিনি বলেন, আদালতে দুটি টর্চার সেল ছিল। একটি সেফ হোম এবং অন্যটি সেফ হাউজ। সেফ হোমে নিয়ে নির্যাতন করা হতো, আর মিথ্যা সাক্ষীর জন্য ধরে নিয়ে সেফ হাউজে রাখা হতো। আমরা এসব নীরবে সহ্য করেছি, প্রতিবাদের চেষ্টা করেছি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার নিন্দা জানানো হয়েছে। তারা জানতো স্বচ্ছ বিচার হলে তাদের খুন করা যাবে না।

তিনি জামায়াত নেতাদের স্মরণ করে বলেন, তারা এদেশকে ভালবাসতেন, আমরাও ভালোবাসি। তারা তাদের সব যোগ্যতাকে উজাড় করে এদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি চালু করার চেষ্টা করেছেন। দুইজন মন্ত্রী তিনটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সততার বিরল প্রমাণ দিয়েছেন। এটি যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে থাকবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের বিচারের নামে অবিচার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, যাদের বিরুদ্ধে ট্রায়াল, তাদের পরিবারের সাক্ষ্য নেয়া হয়নি। মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সুখরঞ্জন বালী নামের একজন সাক্ষ্য দিতে আসলে আইনজীবীর দরজা খুলে তাকে কিডন্যাপ করা হয়। তাকে পাওয়া যায় ভারতে। তার সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়েছে, তা জাতি জেনেছে। এভাবে পাতানো ট্রায়ালে তাদের শাস্তি দেয়া হয়। সাক্ষীদের কাছ থেকে জোর করে যা না তা স্বীকার করানো হয়। তবে জামায়াত নেতারা ঈমানে বলিয়ান ছিলেন, এজন্য ফাঁসিতে ঝুললেও মাথা নোয়াননি। তারা শিখিয়ে গেছেন যে, সত্যের ওপর অবিচল থাকলে ফাঁসি কোনো বিষয় নয়।

তিনি জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ শীর্ষ নেতাদের শাহাদাতের সর্বোচ্চ মাকাম কামনা করেন। পাশাপাশি বিগত স্বৈরশাসনের সময় বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও মিডিয়াকর্মীদের মধ্যে যারা নির্মম হত্যার শিকার হয়েছেন, বিশেষ করে চব্বিশের আন্দোলনে যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করার দোয়া করেন। একইসঙ্গে শহীদ পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করেন।

তিনি বলেন, আমাদের বুক থেকে তাদের স্মৃতি কখনো সরানো যাবে না। কর্মের মাধ্যমে তাদের স্মরণ করা হবে। এটিএম আজহার ফিরে যেন আবার দলের নেতৃত্ব দিতে পারেন, সেই তওফিক কামনা করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, আমরা বুকে কষ্ট চেপে রেখেছি, কিন্তু কোনো প্রতিশোধ নিইনি। আমরা আশা করেছিলাম- ন্যায় বিচার পাবো। এ রায়ে তার প্রতিফলন ঘটেছে।

রাজধানীর আইডিইবি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আব্দুল হালিম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, মতিউর রহমান আকন্দ, নুরুল ইসলাম বুলবুল এবং মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দ, আইনজীবীবৃন্দ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন