ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে জনগণের রায়কে পাল্টে দেওয়ার অভিযোগে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবিতে রাজধানীতে বিক্ষোভ করেছে জামায়াতে ইসলামী।
শুক্রবার বাদ জুমা বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তরগেটে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
এ সময় তিনি ১২ ফেব্রুয়ারির ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ড. খলিলুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং এ বিষয়ে আরো কারা জড়িত তা খুঁজে বের করতে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদিন জনগণ মোটামুটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। এজন্য আমরা নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু দু:খ ও বেদনা ও রহস্যের জন্ম দিয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোট গণনা, রেজাল্ট শিট তৈরি করা ও ফলাফল ঘোষণার প্রতিটি পর্বে পর্বে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। অতীতের নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে কারচুপি ও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ধরণটাই ছিল আলাদা। ওরা ভেবেছিলেন, জনগণ হয়তো বুঝতে পারবেন না। ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে গেল, ভোট দিল-কিন্তু কামটা কখন সারা যায়, দক্ষ ইঞ্জিনিয়াররা সেই কামটাই করেছে।
তিনি বলেন, সাত সাড়ে ৯টা, ১০টা পর্যন্ত জামায়াত জোটের বিজয়ের ফল যখন আসতে লাগল, তখন সেই ফল ঘোষণা বন্ধ করে দেওয়া হলো। এর পর জামায়াত ও ১১ দলের প্রার্থীদের অল্প অল্প ভোটে পরাজিত হতে দেখাতে লাগলো। এটা বড় ইঞ্জিনিয়ারিং।
গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন-আপনারাতো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা বলেন, তার প্রমাণ কি? জবাবে জামায়াত আমির বলেছিলেন-সরাসরি প্রমাণ ছাড়াতো জবাব দেওয়া কঠিন, তবে অতীতে দেখা গেছে, যারা এধরণের অপরাধ করে, কোন না কোনোভাবে তাদের মুখ থেকেই এক সময় বেরিয়ে যাবে। ঠিক সেভাবেই রাজসাক্ষী হয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি সাবেক এই উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার বক্তব্যটা বারবার শুনুন। আপনি বলছেন, আমি কোন দলকে মিন করিনি। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিরোধীদলতো একটা দল-জামায়াতে ইসলামী। আপনি বলেছেন-তারা যদি বিরোধীদলে থাকেও তাদেরকে আমরা মেইন স্ট্রিমে আসতে দেইনি। অর্থাৎ পার্লামেন্টে মেজরিটি সিটে জিতে আসতে দেননাই। এটাকেই ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বলা হয়। এখান থেকে জনগণের বিশ্বাস করার সুযোগ আছে যে, আপনি একজন ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আত্মস্বীকৃত রাজসাক্ষী। আপনাকেই এটা প্রমাণ করতে।
গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, লন্ডন ষড়যন্ত্রের হোতা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। দেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটা ঐতিহ্য আছে, যারা তাতে উপদেষ্টা থাকেন, তারা পরবর্তী দলীয় সরকারে থাকেন না। কেউ থাকেনি। আপনার ভূমিকার ব্যাপারে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেক সিনিয়র নেতা ব্যাপক অভিযোগ করেছেন। আপনার ষড়যন্ত্র, নির্বাচনকে নিরপেক্ষ না করা, দেশের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অডিও-ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল আছে। তারা আপনাকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে অব্যাহতির দাবি করেছেন, তাদের সরকারেই গেলেন। এটা নিশ্চয় ডিপস্টেটের পলিসি মেকাররা পছন্দ করেই এনেছেন। তারা মানে আজকের সরকারি দলের যথেষ্ট উপকার ওই সময় করেছেন। আপনার সার্ভিসে সন্তুষ্ট হয়ে রাগ-ক্ষোভ ভুলে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বানিয়েছেন। এটা উপহার হিসেবে পেয়েছেন। এতে জাতি বুঝতে পারে যে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঙ্গে আপনিও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আরো আছে, আস্তে আস্তে ঠাকুরঘরের মত লোকেরা বলবে-আমি কলা খাইনি। অন্তত দুইজনতো পাওয়া গেলো। আর কেউ যদি সহযোগী থাকে, তার নাম প্রকাশ করুন।
তিনি রিজওয়ানার বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একইসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক, রাম-বাম সেজে দেশের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করেন, সেই সুশীলদের কাছে ব্যাখ্যা চাই। আমাদের ব্যাখ্যা ভুল হলে সঠিক ব্যাখ্যা দিন।
সাবেক দুই উপদেষ্টাকে উদ্দেশ্য করে গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতকে সরকারি দলে আসতে আপনারাই বাধা দিয়েছেন। জনগণ মনে করেছিল-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে জামায়াত ও ১১ দল জিতবে। ১৬৮-৭০ এর ওপরে আমরা আসন পাবো। আপনারা প্লান করে সেটা একশর নিচে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাত ১০ টার পর কেন সম্প্রচার বন্ধ করা হলো, ভোট গণনায় ম্যাকানিজম করা হলো। রেজাল্ট শিটে টেম্পারিং করা হয়েছে। পদে পদে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আর কারা কারা জড়িত দয়া করে নাম প্রকাশ করুন।
জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, আমরা সন্ত্রাস, সহিংসতা, সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা চাই না। প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা আমাদেরকে বলেছেন-অতীতের রাজনীতির খারাপ সংস্কৃতি ভুলে বিরোধীদল-সরকারি দল সহযোগিতা, সহমর্মিতার মাধ্যমে জুলাইয়ের চেতনায় দেশপ্রেমিক হয়ে দেশটাকে আমরা গড়তে চাই। আমাদের আমির বলেছেন, আমরা দেশ পরিচালনায় সব ন্যায় কাজের সহযোগিতা ও অন্যায় কাজের বিরোধিতা করবো।
সাবেক উপদেষ্টা মন্দ কাজে জড়িত ছিলেন, তাই আমরা প্রতিবাদ করছি। আপনি মবের শিকার কেন হবেন? এটাতে একধরণের উস্কানি দিয়েছেন। আপনার উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এটার বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাই। গোয়েন্দাদের সতর্ক থাকার আহবান জানেয়ে বলেন, জামায়াত নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের বাইরে যাবে না।
এ সময় তিনি জুলাই সংস্কার বিষয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বানচালের চক্রান্ত না করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা বন্ধ করে জুলাই সংস্কারের শপথ নিন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলোয়ার হোসাইন, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ইয়াসিন আরাফাত প্রমুখ। সমাবেশ শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

