বিসিএসের মোহে বন্দি মেধা

আনিকা বিনতে আজিজ

বিসিএসের মোহে বন্দি মেধা
প্রতীকী ছবি

সকাল ৮টা বাজতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে দীর্ঘ লাইন। দূর থেকে মনে হতে পারে, তরুণেরা বুঝি গবেষণা, সাহিত্য কিংবা নতুন জ্ঞানের সন্ধানে ভিড় জমিয়েছে। কাছে গেলেই ভিন্ন এক বাস্তবতা চোখে পড়ে। অধিকাংশের হাতেই গবেষণাপত্র নয়, মোটা মোটা বিসিএস প্রিলিমিনারি গাইড। এই দৃশ্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, পাবলিক লাইব্রেরিসহ দেশের প্রায় সব উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই পরিচিত ছবি। অনার্সের প্রথম বর্ষে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক শিক্ষার্থীর একাডেমিক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে যায় সরকারি চাকরির প্রস্তুতি। যে বয়সে তাদের উদ্ভাবন, গবেষণা, দক্ষতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার কথা, সেই সময়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে মুখস্থনির্ভর একটি প্রতিযোগিতার পেছনে। এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।

বাংলাদেশের সমাজে বিসিএস এখন আর শুধু একটি চাকরি নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, নিরাপদ ও সুখময় ভবিষ্যৎ জীবনের প্রতীক। একজন মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এখনো পদমর্যাদাই প্রধান মানদণ্ড। করপোরেট খাত, গবেষণা বা উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও পারিবারিক আড্ডা থেকে শুরু করে বিয়ের বাজার—সবখানেই বিসিএস ক্যাডারের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি। এই মানসিক ও সামাজিক চাপ অসংখ্য তরুণকে মুখস্থনির্ভর এই প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়।

বিজ্ঞাপন

৪৫তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার প্রার্থী। চূড়ান্তভাবে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ২ হাজার ৩৫২ জন। ৪৬তম বিসিএসে ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন ১ হাজার ৪৫৭ জন। ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফলে ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্তের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ১ হাজার ৩২০ জন। অর্থাৎ, প্রতিটি বিসিএসে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশেরও বেশি শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন না। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, অনিশ্চয়তা ও প্রত্যাশার ভার বহন করে এই বিপুলসংখ্যক তরুণের বড় অংশ হতাশা, আত্মবিশ্বাসের সংকট এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন, যা দীর্ঘ মেয়াদে সমাজ ও অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

এই বিসিএসকেন্দ্রিক প্রবণতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে দেশের মেধা ও উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে। যখন একজন প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা কৃষিবিজ্ঞানী নিজের বিশেষায়িত জ্ঞানচর্চা ছেড়ে প্রশাসন বা পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়াকেই প্রধান লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেন, তখন রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শিক্ষা বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল অনেকটাই হারিয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দক্ষ আমলাতন্ত্র অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু একই সঙ্গে বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের সেরা মেধা যদি একটিমাত্র পেশার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।

তবে এই প্রবণতার জন্য শুধু তরুণদের দায়ী করলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের কঠিন বাস্তবতা। দেশের বেসরকারি খাত এখনো অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চাকরির নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা কিংবা অবসরের পর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি। অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে রয়েছে তুলনামূলক স্থায়িত্ব, মোটা অঙ্কের বেতন, চিকিৎসা ও আবাসন সুবিধা, পেনশন এবং চাকরি হারানোর ঝুঁকি প্রায় শূন্য। সঙ্গে রয়েছে সম্মান ও ক্ষমতার দাপট। ফলে একজন তরুণ নিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় সরকারি চাকরিকেই অগ্রাধিকার দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের অস্থিরতা, নীতিগত দুর্বলতা ও সীমিত শিল্পায়নের কারণে বেসরকারি খাতও প্রত্যাশিত হারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে ব্যর্থ। ফলে অনেক সাধারণ ডিগ্রিধারীর কাছে বিসিএসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত কিংবা একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প। উদ্যোক্তা হওয়ার পথও খুব সহজ নয়। উচ্চ সুদের ঋণ, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, পদে পদে সীমাহীন দুর্নীতি, হয়রানি, চাঁদাবাজি, নীতিগত সহায়তার সীমাবদ্ধতা এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতির দুর্বলতা তরুণদের নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। তাই সৃজনশীল ঝুঁকি নেওয়ার পরিবর্তে একটি নিরাপদ চাকরির দিকেই তাদের ঝোঁক ।

এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত ও সমাজ—সব পক্ষকেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি খাতে মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে তরুণরা বিকল্প ক্যারিয়ারকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বেছে নিতে পারেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন আমাদের সামাজিক মানসিকতায়। সফলতার একমাত্র মানদণ্ড সরকারি চাকরি—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সমাজকে মেধা, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতাকে সমান মর্যাদা দিতে হবে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের স্বপ্নের বৈচিত্র্য ও তার প্রয়োগের সুযোগের ওপর। যদি সেই স্বপ্ন একটিমাত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে ক্ষতি শুধু কয়েক লাখ চাকরিপ্রার্থীর নয়, ক্ষতি পুরো রাষ্ট্রের। বিসিএস একটি সম্মানজনক পেশা, কিন্তু একটি দেশের সব মেধার চূড়ান্ত গন্তব্য কখনোই একটিমাত্র চাকরি হতে পারে না। বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এমন একটি সমাজ, যেখানে প্রতিটি মেধা তার নিজস্ব ক্ষেত্রে বিকশিত হওয়ার সমান সুযোগ ও সম্মান পায়।

লেখক : ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন