আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রমজানের মহিমান্বিত শেষ দশক

নাজমুল হাসান কাসেমী

রমজানের মহিমান্বিত শেষ দশক

রমজান এক আধ্যাত্মিক বসন্তের নাম। মুমিনের হৃদয়ে তাকওয়ার যে চারাগাছটি রমজানের শুরুতে রোপিত হয়েছিল, শেষ দশকে এসে তাতে পুষ্পপল্লব প্রস্ফুটিত হওয়ার সময় সমাগত। রমজানের শেষ দশ দিন ও রাত ইবাদতের স্বর্ণালি সময়, যার প্রতিটি মুহূর্ত হিরণ্ময় দ্যুতিতে ভাস্বর। যখন রমজানের দিনগুলো ফুরিয়ে আসতে থাকে, তখন মুমিনের হৃদয়ে একদিকে বিদায়ের করুণ সুর বাজে, অন্যদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক প্রবল আকুতি জেগে ওঠে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই শেষ দশককে কতটা গুরুত্ব দিতেন, তা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনায় সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ ১০ দিন আসত, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন (বেশি পরিশ্রমের প্রস্তুতি নিতেন), রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন।’ (বুখারি : ২০২৪)

বিজ্ঞাপন

শেষ দশকের প্রধান আমল ও করণীয়

রমজানের শেষ দশকে এমন কিছু বিশেষ আমল রয়েছে, যা একজন মুমিনকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামে পৌঁছে দিতে পারে।

শবে কদরের নিরন্তর সন্ধান : এই দশকের বেজোড় রাতগুলোর (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) যেকোনো একটিতে লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত ‘লাইলাতুল কদর’। পবিত্র কোরআনে এই রাতকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি কদরের রাতে। তুমি কি জান কদরের রাত কী? কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা আল-কদর : ১-৩)

হাজার মাস ইবাদত করলে যে সওয়াব পাওয়া যায়, কদরের এক রাতের ইবাদত তার চেয়েও বেশি সওয়াব বয়ে আনে। তাই এই রাতগুলোয় অলসতা না করে তসবিহ, জিকির ও দীর্ঘ সালাতে মগ্ন থাকা উচিত।

ইতিকাফ; স্রষ্টার সান্নিধ্যে নিভৃতবাস : শেষ দশকের অন্যতম প্রধান আমল হলো ইতিকাফ। দুনিয়াবি সকল ব্যস্ততা, কোলাহল ও মায়ার বন্ধন ছিন্ন করে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদে অবস্থান করা। সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ কেফায়া হিসেবে এই আমলটি রাসুলুল্লাহ (সা.) আমৃত্যু পালন করেছেন। ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দা নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দুয়ারে সঁপে দেয়। এটি কেবল মসজিদে অবস্থান নয়, বরং অন্তরের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মালিকের দরবারে পড়ে থাকার নাম। ইতিকাফকারী ব্যক্তির প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়, এমনকি তার ঘুমও।

দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল ও কোরআন তিলাওয়াত : শেষ দশকের রাতগুলোয় সাধারণ তারাবির বাইরেও দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তাহাজ্জুদ বা কিয়ামুল লাইল আদায় করা কর্তব্য। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন প্রভুর সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করার স্বাদই অন্যরকম। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়াম (সালাত) করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি : ১৯০১)

এছাড়া রমজান কোরআনের মাস; তাই এই শেষ সময়ে বারবার তিলাওয়াত ও অর্থের গভীরে ডুব দেওয়া জরুরি।

বিশেষ দোয়া ও কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা : আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি কদর, তবে আমি কী বলব? নবীজি শিখিয়ে দিলেন এক অমূল্য ও সংক্ষিপ্ত দোয়া—‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’ অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিজি : ৩৫১৩)

বর্জনীয় বিষয়গুলো : যা থেকে দূরে থাকা জরুরি

ইবাদত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ইবাদতের পবিত্র পরিবেশ রক্ষা করাও সমান জরুরি। আমাদের অসাবধানতার কারণে অনেক সময় রমজানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ণ হয়।

  • বিলাসিতা ও কেনাকাটায় মত্ত হওয়া : আমাদের সমাজে একটি বড় ট্র্যাজেডি হলো, যখন ইবাদতের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন আমরা শপিং মলে ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথচ পূর্বসূরিরা রমজানের আগেই কেনাকাটা শেষ করে শেষ দশকটি কেবল রবের জন্য উৎসর্গ করতেন।
  • অহেতুক আলাপ ও সামাজিক মাধ্যম : বর্তমান সময়ে ফেসবুক, ইউটিউব বা আড্ডার টেবিলে সময় নষ্ট করা এক বড় ব্যাধি। ইবাদতের মুহূর্তগুলো সেলফি বা স্ট্যাটাসের মাধ্যমে প্রদর্শন করা ‘রিয়া’ বা লোকদেখানো আমলের শামিল হতে পারে, যা আমলকে ধ্বংস করে দেয়।
  • অতিভোজন ও অলসতা : সাহরি ও ইফতারে অতিরিক্ত ভোজন ইবাদতে স্থবিরতা নিয়ে আসে। পেট ভরে খেলে শরীর ভারী হয়ে যায়, যা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে সালাত আদায়ের অন্তরায়।
  • গিবত ও কটু কথা : রোজা কেবল পানাহার ত্যাগের নাম নয়, বরং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা পালন করাও জরুরি। মুখ দিয়ে গিবত, শেকায়েত বা ঝগড়া-বিবাদ করলে সেই রোজার নূর হারিয়ে যায়।

রমজানের বিদায়ি ঘণ্টা বাজছে। মহিমান্বিত এই মাসের রেশ ফুরিয়ে আসার আগে আমাদের হিসেব কষা প্রয়োজন—আমরা কতটা অর্জন করতে পারলাম। যে কটি দিন বাকি আছে, তা যেন আমাদের অলসতায় না কাটে। ফোরাত নদীর স্রোতের মতো সময় বয়ে যাচ্ছে; হয়তো আগামী রমজান আমাদের জীবনে নাও আসতে পারে। তাই আসুন, শেষ দশকের প্রতিটি সেজদায় চোখের পানি ফেলে আমরা আমাদের রবের ক্ষমা ভিক্ষা করি। আল্লাহর রহমতের চাদর আমাদের ঘিরে থাকুক। মহান আল্লাহ আমাদের ইবাদত কবুল করুন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।

লেখক : পরিচালক, আস-সুফফাহ মডেল মাদরাসা, গাজীপুর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন