আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

হিজরি সন ও ইসলামি পঞ্জিকা

উম্মেহানী বিনতে আব্দুর রহমান

হিজরি সন ও ইসলামি পঞ্জিকা

৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই, আরবের প্রজ্বালিত রৌদ্রদাহ ও উত্তপ্ত বালুকণার মধ্যেও এক মহান ইতিহাসের সূচনা হয়। রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে মদিনা অভিমুখে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিজরত শুরু করেন, যা ইসলামের ইতিহাসে শুধু এক স্থানান্তর নয়; বরং ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। হিজরত মানেই ত্যাগ, ধৈর্য ও ঈমানের শক্তি নিয়ে আল্লাহর পথে নিঃস্বার্থ যাত্রা।

আল্লাহর সহায়তা ও সাহসের উৎস রাসুলের এ যাত্রায় আল্লাহর সহায়তা তার পাশে ছিল সর্বক্ষণ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি নবীকে সাহায্য না করো, তবে আল্লাহ তো তাকে সাহায্য করেছেন। যখন তিনি গুহায় ছিলেন এবং তার সাথিকে বললেন, ভয় করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আত-তাওবা : ৪০)

বিজ্ঞাপন

এ আয়াতের প্রেক্ষাপটে সহিহ বোখারিতে এসেছে, ‘তুমি তাদের দুজন সম্পর্কে কী বলো, যাদের সঙ্গে তৃতীয়জন আল্লাহ?’ [সহিহ বোখারি] গুহার ভেতরে শত্রুরা যখন ঠিক বাইরে, তখনো রাসুল (সা.) ও তার সাহাবি আবু বকর (রা.)-এর দৃঢ় ঈমান ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল ছিল অসাধারণ।

মদিনা সনদ ও ইসলামি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন

হিজরতের মাধ্যমে নবীজি (সা.) শুধু নিরাপদ আশ্রয় লাভ করেননি, বরং মদিনায় গিয়ে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ‘মদিনা সনদ’ নামক ঐতিহাসিক দলিলে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এটি বিশ্বের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তি বলেও বিবেচিত।

হিজরি সনের প্রবর্তন

হজরত ওমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ১৬ হিজরিতে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) যখন ইরাক ও কুফার গভর্নর ছিলেন, প্রশাসনিক কাজে তার পাঠানো চিঠিগুলোর নির্দিষ্ট দিন-তারিখ না থাকায় অসুবিধা দেখা দেয়। তখন তিনি খলিফা হজরত ওমর (রা.)-কে বিষয়টি জানান। হজরত ওমর (রা.) এক পরামর্শ সভা আহ্বান করেন, যেখানে উপস্থিত ছিলেন হজরত আলী (রা.), উসমান (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) প্রমুখ।

কেউ কেউ রাসুল (সা.)-এর জন্ম অথবা ওফাতের সময় থেকে বর্ষগণনার প্রস্তাব দেন; কিন্তু হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘হিজরত ইসলামের বিজয়ের সূচনাবিন্দু। তাই এটিই আমাদের বর্ষগণনার ভিত্তি হওয়া উচিত।’ সভায় সবাই একমত হন এবং ১০ জমাদিউল উলা, ১৬ হিজরিতে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সনের প্রবর্তন হয়।

মহররম মাস ও সাল গণনার সূচনা যদিও হিজরত হয়েছিল রবিউল আউয়ালে, তবু সাল গণনার শুরু হয় মহররম মাস থেকে। কারণ, এ মাস আরবদের মধ্যে আগে থেকেই সম্মানিত ছিল এবং ইসলামে এটি আরো বেশি মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মহররম হলো আল্লাহর মাস।’ (সহিহ মুসলিম)

হিজরতের শিক্ষা ও তাৎপর্য

হিজরত শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং তা মুসলিম উম্মাহকে শিক্ষা দেয় ত্যাগের, ধৈর্যের, ঈমানের, ভ্রাতৃত্বের এবং এক ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের আদর্শ। মুহাজির ও আনসারদের পারস্পরিক সহযোগিতা ছিল সত্যিকারের ইসলামি ভ্রাতৃত্বের অনন্য নিদর্শন।

হিজরি সন ও ইসলামি সময় গণনার গুরুত্ব

হিজরি ক্যালেন্ডার একটি আল্লাহপ্রদত্ত সময় গণনার পদ্ধতি, যা চাঁদের গতিপথ অনুযায়ী চলে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা আপনাকে নতুন চাঁদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজের সময় নিরূপণের উপায়।’ (সুরা আল-বাকারা : ১৮৯)

চাঁদভিত্তিক হওয়ায় হিজরি সনের দৈর্ঘ্য হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন, যা গ্রেগরিয়ান সনের চেয়ে প্রায় ১০-১১ দিন কম। ফলে হিজরি মাস প্রতিবছর এগিয়ে যায় এবং ৩৩ বছরে একবার হিজরি সন পুরো এক বছর এগিয়ে যায়। এই পার্থক্যের কারণে ইসলামে জাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে হিজরি বছর অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। যদি কেউ ইংরেজি সাল অনুসারে জাকাত দেয়, তবে প্রতি বছর ১১ দিন দেরি হয়। এতে ৩৩ বছরে একবার পুরো একটি বছর জাকাত বাদ পড়ে যেতে পারে, যা গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সূর্যকে দীপ্তিমান করেছেন এবং চন্দ্রকে করেছেন আলোকময় এবং তিনি চন্দ্রের জন্য মনজিল (গতি-চক্র) নির্ধারণ করেছেন, যাতে তোমরা বছরের সংখ্যা ও হিসাব জানতে পারো।’ (সুরা ইউনুস : ৫)

হিজরতের ইতিহাস জানা এবং হিজরি সনের গুরুত্ব বোঝা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক। এটি আমাদের ঈমান, ত্যাগ, ধৈর্য ও ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। হিজরি সন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং বর্তমানেও ইসলামি জীবনচর্চার অপরিহার্য অংশ। রোজা, হজ, জাকাত, ঈদ—সবই নির্ধারিত হয় এই সনের হিসাব অনুযায়ী। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত হিজরি ক্যালেন্ডারের গুরুত্ব বোঝা, তা অনুসরণ করা এবং নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: