আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যে নেক বাদশাহর জানাজা পড়েছিলেন নবীজি (সা.)

উম্মেহানী বিনতে আব্দুর রহমান

যে নেক বাদশাহর জানাজা পড়েছিলেন নবীজি (সা.)

৬১৫ খ্রিষ্টাব্দ। এ ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম আলোঝলমল হিজরত, যা সংঘটিত হয়েছিল নবুয়তের পঞ্চম বছরে। আল্লাহর ইচ্ছায় সে সময় আবিসিনিয়ার শাসনভার ছিল যার, তিনি ছিলেন সম্রাট আসহামা ইবনে আবহার। যিনি ইতিহাসে নাজ্জাশি নামে সুপরিচিত। নাজ্জাশি ছিল আবিসিনিয়ার সম্রাটদের উপাধি, যেমন পারস্যের রাজাকে ‘কিসরা’ ও রোমের সম্রাটকে ‘কাইসর’ বলা হতো। আর-রাহিকুল মাখতুম গ্রন্থে ও ইবন হিশামের সিরাতে উল্লেখ আছেÑতার শাসনকাল ছিল ৬১৫ থেকে ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

আবিসিনিয়ার আকাশে শান্তির বার্তা

মে-জুন মাসে আবিসিনিয়ার আকাশে ছিল শীতল বাতাসের মৃদু পরশ। যদিও সে সময় ছিল তাদের গ্রীষ্মকাল, আফ্রিকার আবিসিনিয়া ছিলÑউচ্চভূমি। কখনো কখনো মেঘেরা বর্ষণ হতো, যেন অতিথি অভ্যর্থনার আগে বিশাল উঠোন পরিষ্কার করা হচ্ছে। এপ্রিল-মে ছিল হালকা বৃষ্টি, জুন-আগস্টে নেমে আসত প্রবল বর্ষণ। এভাবেই তপ্ত বালুর দেশ থেকে শীতল পাহাড়ের দেশে, আল্লাহর রহমতের ছায়ায় রচিত হলো মানবতার প্রথম হিজরতের ইতিহাস; যেখানে প্রতিটি ধাপ বয়ে এনেছিল নতুন আশ্রয়ের স্বস্তি।

প্রথম হিজরতের কাফেলা

এই কাফেলায় ছিলেন ১১ জন পুরুষ ও ৪ জন মহিলা। নেতৃত্বে ছিলেন উসমান ইবনে আফফান (রা.) এবং নবীকন্যা রুকাইয়া (রা.)। ইবন হিশামের বর্ণনা মতে, এই হিজরত ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা, যেখানে মুসলমানদের জন্য নির্মোহ, দয়ার্দ্র অন্তরের পরিচিতি পায় বিশ্বদরবারে। সেটি ছিল সম্রাট নাজ্জাশির অন্তর।

নাজ্জাশির দরবারে কোরআনের তিলাওয়াত

কুরাইশরা আমর ইবনে আস ও আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়াকে উপহারসহ পাঠিয়েছিল নাজ্জাশির দরবারে মুসলমানদের ফেরত আনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু জাফর ইবনে আবি তালিব (রা.) যখন দরবারে সুরা মরিয়ম থেকে ঈসা (আ.) ও মারইয়াম (আ.)-এর কাহিনি তিলাওয়াত করেন, তখন নাজ্জাশি ও তার পাদ্রিদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।

কোরআনের বাণী

রাব্বুল ইজ্জত এ সময় আয়াত নাজিল করেন, ‘যখন তারা রাসুলের প্রতি অবতীর্ণ বাণী শ্রবণ করে, তুমি তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত দেখতে পাবে; কারণ তারা সত্যকে চিনে নেয়। তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমরা ঈমান আনলাম, আমাদের সাক্ষ্যদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করো।’ (সুরা মায়িদা : ৮৩)

নাজ্জাশির ইসলাম গ্রহণ

জাফর (রা.)-এর দাওয়াত ও কোরআন তিলাওয়াত শুনে সম্রাট নাজ্জাশি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে দরবারের পাদ্রিদের কারণে তিনি ইসলাম গোপন রাখেন, মুসলিমদের নিরাপত্তা ও পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেন।

প্রথম গায়েবানা জানাজা

নবম হিজরির রজব মাস, ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে, সম্রাট নাজ্জাশির ইন্তেকাল হয়। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আজ তোমাদের এক ভাই ইন্তেকাল করেছেন। এসো, তার জন্য জানাজার সালাত পড়ি।’ (বোখারি : ১৩৩৩; মুসলিম : ৯৫১) এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম গায়েবানা জানাজা, এক স্বর্ণালি অধ্যায়।

ন্যায়পরায়ণ ও দরদি সম্রাট

সম্রাট নাজ্জাশি ছিলেন অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ শাসক। কুরাইশদের উপহার ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যারা সত্যপথের অনুসারী, তাদের আমি শত্রুর হাতে কখনো তুলে দেব না।’ (ইবন হিশাম) ইবন ইসহাক লিখেছেনÑ‘নাজ্জাশি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুসলমানদের আশ্রয় দেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেন। নবীজির প্রতি ছিল তার পূর্ণ বিশ্বাস।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন