আজতেকার অশ্রুভেজা রাতে হিমেনেজের প্রত্যাবর্তন

FB_IMG_1780466287703
আরিফুল হক বিজয়

আজতেকার অশ্রুভেজা রাতে হিমেনেজের প্রত্যাবর্তন

২৯ নভেম্বর, ২০২০

প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে মুখোমুখি আর্সেনাল ও উলভারহ্যাম্পটন ওয়ান্ডারার্স। পঞ্চম মিনিটের খেলা চলছে। এমন সময়েই দুজন খেলোয়াড়ের তীব্র সংঘর্ষ, মাঠেই লুটিয়ে পড়া, কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা এবং ভয়াবহ এক ইনজুরি। আর্সেনালের ডিফেন্ডার ডেভিড লুইস উঠে দাঁড়ালেও মুহূর্তেই জ্ঞান হারান উলভসের রাউল হিমেনেজ! পুরো স্টেডিয়ামে নেমে আসে আতঙ্ক ও নীরবতা।

বিজ্ঞাপন

১২ মার্চ, ২০২৬

প্রিমিয়ার লিগ শেষের দিকে। মাস তিনেক বাকি বিশ্বকাপের। উলভসের সঙ্গেই আছেন হিমেনেজ। সামনেই বিশ্বকাপ। ফুরফুরে মেজাজেই ছিলেন। এমন সময়েই উড়ে আসে ঝড়ো হাওয়া। চারদিকে বইয়ে দিলো বেদনার্ত ঝড়। হিমেনেজের বাবা আর নেই! যে মানুষটি তার ফুটবল যাত্রার শুরু থেকে পাশে ছিলেন, যে মানুষটি প্রতিটি সাফল্যে গর্ব করতেন, সেই মানুষটিই আর বেঁচে নেই।

১২ জুন, ২০২৬

বিশ্বকাপের ম্যাচ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এগিয়ে মেক্সিকো। তিন পয়েন্ট নিশ্চিত নয়। আরেকটা গোল হলেই নির্ভার থাকা যাবে। ৬৭তম মিনিটের খেলা চলছে। রবার্তো আলভারাদো দারুণ ক্রসে দিলেন। উড়ে আসা বলে মাথা ছুঁইয়ে যে খেলোয়াড়টি মেক্সিকোর জয় নিশ্চিত করলেন তিনি হিমেনেজ। পরক্ষণেই আকাশের দিকে মুখ তুলে বেদনার্ত অশ্রুজলে যিনি প্রয়াত পিতাকে স্মরণ করলেন, তিনিও হিমেনেজ। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ তার প্রথম দিনেই দেখে ফেললো গ্রেটেস্ট কামব্যাক। পেশাদার ফুটবলে ফেরার শঙ্কা আর পিতা হারানোর বেদনা পেছনে ফেলে হিমেনেজ হয়ে ওঠলেন মেক্সিকোর বিরোচিত নাবিক। যিনি পেরিয়ে এসেছেন উত্তাল ঝড়ের মহাসমুদ্র।

আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে হিমেনেজের অস্ত্রোপচারটা করা হয় মাথার খুলিতে! যে অবস্থা থেকে ফিরে আসাই মিরাকল। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, হিমেনেজ আদৌ আর কখনো পেশাদার ফুটবলে ফিরতে পারবেন? দীর্ঘ পুনর্বাসন, অসীম মানসিক শক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মৃত্যুঝুঁকির মতো সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে মেক্সিকান এই স্ট্রাইকার মাঠে ফিরেছিলেন ২২৯ দিন পর, ২০২১ সালের জুলাইয়ে।

আর জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরেই হিমেনেজ যখন বলটা জালে পাঠালেন, তখন সেটি ছিল শুধু একটি গোল নয়। সেটি ছিল জীবনের বিরুদ্ধে জিতে যাওয়া এক মানুষের গল্পের পরিণতি। বিধাতার লিখিত যে গল্পের রোমাঞ্চে মেক্সিকোর লাখো সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়ছিল। এস্তাদিও আজতেকার গ্যালারিও তাতে শামিল হয়েছিল। অথচ গোলের পর হিমেনেজের চোখে জমে উঠল জল। বহু বছরের যন্ত্রণা, হারিয়ে ফেলা সময়, মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে আসার গল্প এবং বাবাকে হারানোর অপার শূন্যতায় ভাসলেন ৩৫ বছর বয়সী এই তারকা। নীরবে যেন বলতে চাইলেন, ‘বাবা, দেখছেন তো?’

হিমেনেজ এখন মেক্সিকোর সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার দৌড়েও খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। জাতীয় দলের হয়ে বর্তমানে তার গোলসংখ্যা ৪৬, যা তাকে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সাবেক স্ট্রাইকার জ্যারেড বোরহেত্তির পাশে বসিয়ে দিয়েছে। এখন তার সামনে রয়েছেন কেবল আরেক কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড হাভিয়ের ‘চিচারিতো’ হার্নান্দেজ। সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা চিচারিতোর নামের পাশে রয়েছে ৫২টি আন্তর্জাতিক গোল। অর্থাৎ মেক্সিকোর সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ করতে হিমেনেজের প্রয়োজন আর মাত্র ৬ গোল।

স্কোরবোর্ড বলছে, মেক্সিকো ২-০ গোলে জিতেছে। কিন্তু হিমেনেজের জয় ছিল আরও বড়। সেটি ছিল মৃত্যুভয়কে হারানোর জয়। ভাঙা খুলির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন জীবন খুঁজে পাওয়ার জয়। বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়েও স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে রাখার জয়। কখনও কখনও ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়। একটি গোল হয়ে ওঠে একটি জীবনের গল্প। আর আজতেকার উদ্বোধনী রাতে রাউল হিমেনেজের সেই হেডটি ছিল ঠিক তেমনই এক গল্প; যেখানে অশ্রু ছিল, যন্ত্রণা ছিল, স্মৃতি ছিল, আর ছিল অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার এক অনন্ত সৌন্দর্য।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন