বিশ্লেষণ

ডারউইনের রোদে বাংলাদেশের নতুন গল্প

ডারউইনের রোদে বাংলাদেশের নতুন গল্প

অস্ট্রেলিয়ায় এখনো শীতের আমেজ, কিন্তু ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে দর্শকরা এসেছিলেন একেবারে গ্রীষ্মের পোশাকে। কর্মদিবস হওয়া সত্ত্বেও মাঠে বসে ক্রিকেট আনন্দ নিতে হাজির হয়েছিলেন পাঁচ থেকে ছয় হাজার ক্রিকেটপ্রেমী।

অস্ট্রেলিয়ার অন্য প্রান্তের উইকেটগুলোর তুলনায় মারারা স্টেডিয়ামের এই পিচ একটু মন্থর, মাঝে মধ্যে আমার কাছে মনে হয়েছে এটি বোধহয় ডাবল পেসড উইকেট। পিচে ঘাস আছে। উপরিভাগে আর্দ্রতার উপস্থিতিও মিলল, সত্যি বলতে প্যাট কামিন্সের আগে বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুরুতে আমাকে খানিকটা অবাক করেছে। মনে হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়া চাইছিল এই ম্যাচে যেন একবারই ব্যাট করতে হয়। প্যাট কামিন্সের দলের ডারউইনে খুব একটা খেলার অভিজ্ঞতা নেই বলেই হয়তো এই সিদ্ধান্তে খানিকটা অনভিজ্ঞতার ছাপ পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এবার ফিরি বাংলাদেশের বোলিং প্রসঙ্গে। সত্যি বলতে কী স্বপ্নময় একটা সময় কাটিয়েছে বাংলাদেশ প্রথম দিনের বোলিংয়ে। গরম আর আর্দ্র আবহাওয়ায় দীর্ঘ স্পেল বোলিং করা সহজ কথা নয়। কিন্তু হাসান, তাসকিন আর এবাদত মেট্রোনোমের মতো নিখুঁত জায়গায় বল ফেলে গেছেন, ধৈর্য ধরে রেখেছেন গোটা সময়। টেস্ট ক্রিকেটে এই ধৈর্যই সবচেয়ে বড় গুণ। প্রথম ঘণ্টায় বড় সাফল্য না মিললেও পারফেক্ট লাইন ও লেন্থে বল রাখেন তারা, ব্যাটসম্যানদের কোনো ফাঁকা সুযোগ দেননি। এই ত্রয়ীর বোলিংয়ে কোনো গতির ঝলকানি ছিল না, তবে যা ছিল তার নাম ডিসিপ্লিন। চতুর্থ-পঞ্চম স্টাম্প বরাবর লাইনে টানা বল রেখে মাঝে মধ্যে একটা ভেতরে ঢোকানো ডেলিভারি ছুড়েছেন, অফ স্টাম্পের ওপরের অংশকে টার্গেট ধরে। এটাই তো বেসিক বোলিং। চোটের কারণে নাহিদ রানার না থাকা বড় ধাক্কা ছিল, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রথমদিন এই তিন পেসার সেই শূন্যতা বুঝতেই দেননি।

কেন্টের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলে আসার পর হাসান মাহমুদের এই বদলে যাওয়া চেহারা অনেক কিছু বলে দেয়। বাকি দুই পেসারের চেয়ে বেশি সময় ধরে বল করেছেন তিনি, তবু ক্লান্তির লেশমাত্র দেখা যায়নি চেহারায়। আমি নিশ্চিত তার এই পরিশ্রমী মানসিকতাই তাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে।

অস্ট্রেলিয়াকে গুটিয়ে দেওয়ার পর দিনের শেষ সেশনে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ, তখন উইকেট সকালের চেয়ে কিছুটা সহজ হয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটা অবশ্য ছিল টালমাটাল। স্টার্ক আর হ্যাজলউড রীতিমতো পরীক্ষা নিয়েছেন, বেশ কয়েকবার বল গেছে ব্যাটের কানা ঘেঁষে। সাদমানের উইকেট হারানোর পর মুমিনুল আর তামিম হয়ে ওঠেন সংহত, হিসাব কষে খেলেছেন বোলারদের বিপক্ষে, নাথান লায়নকেও থিতু হতে দেননি।

আজ ম্যাচের দ্বিতীয়দিন এই উইকেটে ব্যাট করা তেমন সহজ হবে না। কঠিন হবে তবে অসম্ভব কিছু নয়। বল ব্যাটে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, দেরিতে খেলতে হবে। প্রথম দিনের মতোই বেসিক ব্যাটিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে নামতে হবে।

প্রথম দিনটা ছিল বাংলাদেশেরই। ম্যাচের ১৫ সেশনের প্রথম দিনের তিনটিতেই জিতেছে তারা, আর টেস্ট ক্রিকেটে সেশন জেতাই তো সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। অস্ট্রেলিয়া তাদের সেরা দল নিয়েই নেমেছে এই সিরিজে, এটাই প্রমাণ করে তারা কতটা সিরিয়াস। প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশের বাজে সময় কেটেছে। শুরু হওয়ার আগেই বাংলাদেশকে শুনতে হয়েছে এই টেস্ট তিন দিনের বেশি গড়াবে না। অনেকদিনের পুরোনো সেই গল্প বদলে দেওয়ার দারুণ সুযোগ এখন বাংলাদেশের সামনে। কেরি ও’কিফের মাইক্রোফোন হাতে বলা সেই কথাটাই আমিও উচ্চারণ করছি—অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের প্রতি বার্তা একটা—বাংলাদেশ এখানে খেলতেই এসেছে।

আজ দ্বিতীয় দিন আরেকটি ক্রিকেট রোমাঞ্চের অপেক্ষায় আছি।

লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্রিকেট বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন