আরেকটি ম্যাচ জেতার গল্প লিখে ফাইনালে আর্জেন্টিনা

আরেকটি ম্যাচ জেতার গল্প লিখে ফাইনালে আর্জেন্টিনা

‘চ্যাম্পিয়ন দলকে কখনোই হারিয়ে দেওয়া যায় না, যতক্ষণ না শেষ বাঁশি বাজে।’—বহু বছর আগে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের এই কথাটি মূলত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ঘিরেই বলা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে কথাটি যেন নতুন করে নিজের পরিচয় খুঁজে পেয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে। পিছিয়ে পড়া ম্যাচ কীভাবে জিততে হয়, সেই শিল্পে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা দলটির নাম আর্জেন্টিনা। একবার নয়। বারবার এই কীর্তি গড়েছে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলো, তারা সেটা করছে নকআউট মঞ্চে। যেখানে একটি ভুল মানেই বিদায়। ভুল আর্জেন্টিনা করছে কিন্তু খানিক বাদেই আবার এত ভালো খেলছে যে, তাদের সেই ভালোর আলো যা উপহার দিচ্ছে তার নাম-ফুটবল আনন্দ। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আনন্দময় দলের নাম আর্জেন্টিনা।

বিজ্ঞাপন

আটলান্টা স্টেডিয়ামে বুধবার রাতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও তেমন আনন্দ উপহার দিল মেসির আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে পিছিয়ে পড়ার পরও যেন আর্জেন্টিনা একবারও বিশ্বাস হারায়নি। কারণ, এই দল জানে—ঘড়ির কাঁটা ৮০ মিনিট ছুঁলেই ম্যাচের গল্প নতুন করে লেখা যায়। বিশ্বকাপে ৮০ মিনিটের পর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১০ গোল করার বিশ্বরেকর্ড এখন তাদের দখলে। যেন ম্যাচের শেষ ১০ মিনিটই তাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়।

সেই গল্পের সবচেয়ে বড় লেখকও একজনই—লিওনেল মেসি।

যে ম্যাচে তিনি গোল করেন না, সে ম্যাচে গোল করান। এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত এমন একটি ম্যাচও নেই, যেখানে আর্জেন্টিনার গোলের সঙ্গে মেসির সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই। সেমিফাইনালেও তার ব্যতিক্রম হলো না। দুটি গোলেই তার অ্যাসিস্ট। প্রথমটিতে সমতা ফিরল। পরেরটিতে ফাইনালের টিকিট।

ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন।

আটলান্টা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড ম্যাচে আর্জেন্টিনা জয়ের গল্প কেবল ২-১ গোলের জয়ের মধ্যেই আটকে নেই, এ যেন এক ম্যাচে দুই ভিন্ন সিনেমার গল্প।

ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল রুক্ষ, অমার্জিত, ধাক্কাধাক্কির, কিছুটা আস্তিন গুটানো মাস্তানির মতো এবং গোলশূন্যর। আর দ্বিতীয়টি ছিল সৌন্দর্য, সাহস, ফিরে আসার বিশ্বাসের আর তিন গোলের চূড়ান্ত এক নাটকীয়তার!

ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিটে ফুটবলের চেয়ে যেন বেশি দেখা গেল শক্তির প্রদর্শনী। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপে প্রথমবার কোনো ম্যাচের প্রথম ৩০ মিনিটে দুই দলের কেউই প্রতিপক্ষের গোলপোস্টে একটি শট নিতে পারেনি। বলের চেয়ে বেশি চলছিল শরীরের লড়াই। জুড বেলিংহাম, রোমেরো, এনজো ফার্নান্দেজ, মেসি—একজনের সঙ্গে আরেকজনের ধাক্কাধাক্কি, তর্ক, হাতাহাতির উপক্রম। রেফারি ইসমাইল এলফাথ যেন শুরু থেকেই ম্যাচের লাগাম হারিয়ে ফেলেন। আর্জেন্টিনা বিরতির আগেই ১৩টি ফাউল করে বসে! আর্জেন্টিনার এই কৌশলকে ইংল্যান্ড বলছে ডার্টি গেম। অন্যদিক ইংল্যান্ডের পরিকল্পনাও ছিল স্পষ্ট। মেসিকে খেলতে দেওয়া যাবে না। যতবার তিনি বল পেয়েছেন, চারপাশে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা যেন দেয়াল তুলে দাঁড়িয়েছে। প্রথমার্ধে মাত্র ১৪টি সফল পাস, ১৫ বার বল হারানো—এই বিশ্বকাপে মেসির সবচেয়ে হতাশাজনক ৪৫ মিনিটগুলোর একটি। কিন্তু মেসির মতো খেলোয়াড়কে শুধু ৪৫ মিনিটে মাপা যায় না।

তারা ম্যাচের মোড় থেকে ফল সবকিছুই বদলে দেন কেবল একটি ম্যাজিক মুহূর্তে। কেবল একটি সিদ্ধান্তে। কেবল একটি পাসে। একটি বাড়ানো বলে। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে মেসি যেন সেই ম্যাজিকই জমিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ডিয়েগো ম্যারাডোনার দুই গোলে ইংল্যান্ড বিদায় নিয়েছিল। ৪০ বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ থেকে ইংল্যান্ডের ছুট্টি করে দিলেন মেসি তার দুই অ্যাসিস্টে।

কী দারুণ মিল!

তবে আটলান্টায় গোলের আনন্দে প্রথম ভেসেছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচের ৫৫ মিনিটের সময় ক্লাসিক ভঙ্গির পাল্টা আক্রমণে ডেকলান রাইসের কাছ থেকে বল পেয়ে ডান দিক দিয়ে উঠে আসেন মরগান রজার্স। চোখধাঁধানো ক্রসে বল ভাসান আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে। পেছন থেকে ছুটে এসে অ্যান্থনি গর্ডন ডান পায়ে বল পাঠিয়ে দেন জালে। ০-১ গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা।

ইংল্যান্ডের উল্লাসে তখন মনে হচ্ছিল, তাদের ফাইনালের দরজা খুলে গেছে। কিন্তু গোলের পর অন্য একটি আর্জেন্টিনার চেহারা দেখল ইংল্যান্ড। যে দলটিকে এতক্ষণ ক্লান্ত, ধীর আর অসহায় লাগছিল, তারা হঠাৎই হয়ে ওঠে ক্ষুধার্ত শিকারি।

এগিয়ে থাকা ইংল্যান্ড ভুল করল এখানেই। গুটিয়ে গেল নিজেদের নিজেদের সীমানায়। গোল করার পর স্বভাববিরুদ্ধভাবে তারা নেমে গেল নিজেদের বক্সের সামনে। বিশাল এক ‘লো ব্লক’ তৈরি করে শুধু সময় কাটানোর খেলায় মন দিল। ভাবখানা এমন ডিফেন্স করে বাকি সময় তারা কাটিয়ে দেবে। আর্জেন্টিনা অপেক্ষাই করছিল এমন ভুলের।

৫৬ মিনিট থেকে শেষ বাঁশি পর্যন্ত বলের দখলে ইংল্যান্ড ছিল মাত্র ১২ শতাংশ সময়। বাকি ৮৮ শতাংশ ছিল আর্জেন্টিনার পায়ে—বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে, যা প্রায় অকল্পনীয় আধিপত্য।

তারপর শুরু হলো ঢেউ। আর্জেন্টিনার আক্রমণের তোড়। পরের সময়জুড়ে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে পাঞ্চিং ব্যাগ বানিয়ে আর্জেন্টিনা আক্রমণের ঝড় বইয়ে দিল। একটি। দুটি। তিনটি এবং ক্রমান্বয়ে এমন চার, পাঁচ, ছয় আরো অনেক অনেক!

নিকোলাস গনজালেসের হেড বুকে নিলেন ইংলিশ গোলরক্ষক পিকফোর্ড। ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড ফিরে এল পোস্টে লেগে।

কিন্তু প্রতিটি আক্রমণের কেন্দ্রে তখন একজনই—মেসি।

৮৫ মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত।

ইংল্যান্ডের ডিফেন্সকে টেনে বাইরে নিয়ে আসে আর্জেন্টিনা। বল যায় মেসির কাছে। ডি বক্সের ভেতরে ৭ জন ডিফেন্ডার। বক্সের সীমানার বাইরে কেবল হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম। ডি বক্সের বাইরে থাকা এনজো ফার্নান্দেজের বল বানিয়ে দেন মেসি। নিখুঁত ওজনের ছোট্ট একটি পাস। বাকি কাজটি করেন এনজো। প্রথম ছোঁয়াতেই বল সেট করে ডান পায়ের বাঁকানো শটে জালের ওপরের কোনা খুঁজে নেন।

পিকফোর্ড ঝাঁপিয়েও ছুঁতে পারেননি। ম্যাচে ১-১ গোলের সমতা। স্টেডিয়ামের শব্দ তখন বদলে গেছে। ইংল্যান্ডের গ্যালারিতে নেমে নীরবতা। আর আর্জেন্টিনা? মাঠের ১১ জন খেলোয়াড় এবং স্টেডিয়ামের আকাশি নীল জার্সির গ্যালারি যেন তখন রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ। শিকার জেতার জেদে হুংকার করছে। ম্যাচের ৯২ মিনিটে আরো একবার শুরু হয় আক্রমণ। ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। বেশির ভাগ খেলোয়াড় তখনো হতাশার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। কিন্তু একজন ইতোমধ্যে পরের দৃশ্য ভেবে ফেলেছেন। পোস্টে লাগা বল পেলেন মেসি। এক স্পর্শে ডান প্রান্তে জায়গা তৈরি করেন। সামনে থাকা ডিফেন্ডারের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তটুকুই ছিল তার অপেক্ষা। তারপর ডান পায়ের বাইরের অংশ দিয়ে ভাসিয়ে দেন অবিশ্বাস্য নিখুঁত একটি ক্রস। ডান পায়ে মেসি শট নেবেন, সম্ভবত ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারদের সেটি ছিল ধারণারও বাইরে। কিন্তু মেসি ঠিক সেটাই করলেন। বলটি যেন সময় নিয়ে নেমে আসে লাউতারো মার্টিনেজের মাথায়। লাউতারোর সামনে স্টোন এবং পেছনে কনসা-ইংল্যান্ডের এই দুজন খেলোয়াড়ও কিছুই করতে পারলেন না। লাউতারো লাফালেন। হেডে বলের গতি বদলে দিলেন। বল ইংল্যান্ডের জালে। গো..ও..ল! আর্জেন্টিনা ২, ইংল্যান্ড ১। এই স্কোরে খানিক বাদে ম্যাচ শেষ।

ইংল্যান্ড ভেঙে পড়ল মাঠেই। আর্জেন্টিনা আবারও ফিরে আসে মৃত্যুর কিনারা থেকে।

বিশ্বকাপে মেসির অ্যাসিস্ট এখন ১২টি—ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই ম্যাচে গোল না করেও তিনি আবারও ম্যাচের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার। হলেন ম্যাচসেরা। এই আর্জেন্টিনায় মেসির সংজ্ঞা এখন আর শুধু গোলদাতা নয়; তিনি গল্পের পরিচালক। কখন গতি বাড়বে, কোথায় দৃশ্য বদলাবে, শেষ সংলাপটি কে বলবে—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ যেন তার পায়েই।

স্কালোনির এই দলটিকে তাই শুধু টেকনিক্যালি ভালো বললে ভুল হবে। এরা নিজ শক্তির বিশ্বাসে অসাধারণ। মিসরের বিপক্ষে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ গোলে জয়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটক, ৩-২ গোলে জয়। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষা। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে সমতা ছিল। তারপর অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনার ম্যাচ জয় ৩-১ গোলে।

আর সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অসম্ভব প্রত্যাবর্তন। প্রতিবারই গল্পের শেষ লাইনটি একই। শেষ বাঁশির আগে আর্জেন্টিনা হারে না। আর্জেন্টিনা অপেক্ষা করে। তারপর সম্মিলিত আক্রমণে আসে। জেতার জেদে ঘাম ঝরায়। ম্যাচ বের করে নেয় হারের গর্ত থেকে।

নকআউটের চার ম্যাচই এমন নাটকীয় ভঙ্গিতে জিতে মেসির আর্জেন্টিনা আরেকবার বিশ্বকাপের ফাইনালে। আরেকটি ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়। ১৯ জুলাই ফাইনালের রাতে তাদের প্রতিপক্ষ স্পেন।

ফুটবলে অনেক দল গোল করে ম্যাচ জেতে। আর্জেন্টিনা ম্যাচ জেতে গল্প লিখে। আর সেই গল্পের শেষ অধ্যায়ে, অবধারিতভাবেই থাকে একটা নাম- মেসি।

এই বিশ্বকাপের ফাইনালের স্ক্রিপ্টও কি নিজের হাতেই লিখছেন মেসি? জেনে রাখুন, জার্সি নম্বর ১০ মাঠে থাকলে শেষ বাঁশির আগে কোনো গল্পের শেষ লেখা যায় না!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন