়
দাবার বোর্ডে অনেক সময় এমন একটি মুহূর্ত আসে, যখন একজন গ্র্যান্ডমাস্টার এগিয়ে থেকেও হঠাৎ নিজের সব মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেন শুধু রাজাকে বাঁচানোর দিকে। একে একে সৈন্যগুলোকে সামনে এনে তিনি এমন এক দুর্গ তৈরি করেন, যাতে প্রতিপক্ষের জন্য রাজাকে ছোঁয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এই কৌশলেরও একটি বড় ঝুঁকি আছে। আক্রমণের সব পথ বন্ধ ধরে নিয়ে নিশ্চিন্ত হতেই প্রতিপক্ষ পুরো বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আপনার মন্ত্রী, ঘোড়া, হাতি কিংবা নৌকার মতো তুখোড় সব খেলোয়াড় দাঁড়িয়ে থাকলো শুধু প্রতিরক্ষার জন্য। আর ঠিক তখনই দুর্দান্ত এক চালে কিস্তিমাত করে দিল প্রতিপক্ষ।
আটলান্টায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড সেই ভুলটাই করল।
৫২ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংল্যান্ডের সামনে দুটি পথ ছিল। প্রথমত, যে গতিময় ফুটবল খেলে তারা গোল পেয়েছিল, সেটি চালিয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, লিড রক্ষায় পুরো দলকে নিজেদের অর্ধে নামিয়ে আনা। দ্বিতীয়টি মূলত ভুল পথ। কি ভেবে যেন টুখেল বেছে নিলেন দ্বিতীয় পথ। আর সেখানেই বদলে গেল ম্যাচের ভাগ্য।
গর্ডনের গোলের পর ইংল্যান্ডের খেলায় যেন হঠাৎ সুইচ অফ হয়ে যায়। মরগান রজার্স, বেলিংহাম কিংবা গর্ডন; যারা এতক্ষণ আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিলেন, তাদেরও দেখা গেল নিজেদের অর্ধে নেমে আসতে। টেলিভিশনের ক্যামেরায় বারবার ধরা পড়ছিল একই দৃশ্য; ইংল্যান্ডের প্রায় ৬-৭ জন খেলোয়াড় নিজেদের পেনাল্টি বক্সের আশপাশে! কখনো সেটা গিয়ে ঠেকেছে ১০-এ!
একসময় মনে হচ্ছিল, আর্জেন্টিনা নয়, পুরো স্টেডিয়ামই যেন ইংল্যান্ডের বক্সে ঢুকে পড়েছে। ইংল্যান্ডের এই অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক অবস্থানের সুযোগের ফায়দা কেন নেবে না আর্জেন্টিনা? তাদের ডাগআউটে তো দাঁড়িয়ে আরেক গ্র্যান্ডমাস্টার স্কালোনি। ফাঁকা মাঠ পেয়ে লিওনেল মেসির মতো ফুটবলার যেন আকাশ হাতে পেলেন।
আর্জেন্টিনা কোনো তাড়াহুড়ো করেনি। তারা জানত, সামনে একটি দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। সেই দেয়াল এক ধাক্কায় ভাঙা যাবে না। তাই শুরু হয় অবিরাম বল ঘোরানো। একবার ডি পল, তারপর এনজো, এরপর ম্যাক অ্যালিস্টার, আবার মেসি—মৌমাছির ঝাঁকের মতো এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরতে থাকে আর্জেন্টিনার আক্রমণ। সেই আক্রমণের ছন্দে দিশেহারা হয়ে যায় ইংল্যান্ড।
প্রথমে নিকো গনসালেসের হেড অবিশ্বাস্যভাবে বাঁচিয়ে দেন জর্ডান পিকফোর্ড। তারপর ম্যাক অ্যালিস্টারের হেড লাগে ক্রসবারে। জন স্টোনস শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত গোল বাঁচান। একটি অফসাইডে বাতিল হয় আরেকটি সুযোগ। প্রতিটি আক্রমণ যেন ইংল্যান্ডকে আরও একটু পিছিয়ে দিচ্ছিল।
ফুটবলে একটা কথা প্রচলিত আছে—যদি প্রতিপক্ষ একের পর এক সুযোগ তৈরি করতে থাকে, তবে গোল আসাটা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
সেটিই ঘটেছে।
৮৩ মিনিটে মেসির পাস থেকে দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। সেই গোলের পরও টুখেল দলের গঠন বদলাননি। ইংল্যান্ড আবারও নিচেই থেকে যায়। আর্জেন্টিনা তখন বুঝে যায়—এই ম্যাচ জেতা সম্ভব। এরপর দুর্দান্ত চাল দিলেন স্কালোনি, লক্ষ্য টুখেলের রাজা। মাঠে ছিল লাউতারো মার্টিনেজের মতো গতিময় ঘোড়া। যোগ করা সময়ে দেখা গেল স্কালোনির চালের ভেলকি। ডান প্রান্ত থেকে মেসির নিখুঁত ক্রসে লাউতারো ’আড়াই ঘর' লাফিয়ে হেডে যে গোলটি করেন, সেটি শুধু একটি গোল নয়; ছিল পুরো ম্যাচের গল্পের শেষ অধ্যায়।
ম্যাচ শেষ হতেই ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে শুরু হয় টুখেলকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ম্যাচ বিশ্লেষণে উল্লেখ করে, ইংল্যান্ড লিড পাওয়ার পর নিজেদের অর্ধে অতিরিক্ত নেমে যাওয়ায় আর্জেন্টিনা পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিবিসির বিশ্লেষণেও বলা হয়, গর্ডনের গোলের পর ইংল্যান্ড আক্রমণের ধার হারিয়ে ফেলে এবং শেষ দিকে শুধু চাপ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। দ্য অ্যাথলেটিক-এর ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়, আর্জেন্টিনা বলের দখল ও অবস্থানগত আধিপত্য কাজে লাগিয়ে ইংল্যান্ডকে ক্রমাগত নিজেদের বক্সে আটকে রাখে।
ইংল্যান্ডের সমর্থকদের কাছে এই দৃশ্য নতুন নয়। ২০২১ ইউরো ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে লুক শ–এর গোলে এগিয়ে থেকেও গ্যারেথ সাউথগেটের দল ধীরে ধীরে পিছিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হারতে হয়। পাঁচ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও যেন একই চিত্র। শুধু কোচ বদলেছে। গল্প বদলায়নি।
ফুটবলে শুধু রাজাকে বাঁচিয়ে শিরোপা জেতা যায় না। দাবায় কখনও কখনও রাজাকে ঘিরে দুর্গ বানানোই জয়ের চাবিকাঠি। কিন্তু ফুটবল দাবা নয়। এখানে রাজাকে বাঁচাতে গিয়ে যদি পুরো মাঠ প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিলে একসময় সেই দুর্গই হয়ে ওঠে নিজের কারাগার। আটলান্টার রাত সেটাই শিখিয়ে দিল। টুখেলের মতো ইউরোপ সেরা মাস্টারও ভুলে গেলেন প্রতিপক্ষ দলটি মেসির আর্জেন্টিনা; যারা দরজায় একবার নয়, বারবার কড়া নাড়ে। আর দরজা একবার খুলে গেলে দূর্গের ভেতর খোদাই হয়ে থাকে পরাজয়ের ধ্বংসাবশেষ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


