সবকিছুই মেসির, শুধু ট্রফিটা স্পেনের

সবকিছুই মেসির, শুধু ট্রফিটা স্পেনের

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮০,৬৬৩ জন দর্শকের সিংহভাগই এসেছিলেন এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে—লিওনেল মেসিকে আরও একবার বিশ্বজয়ী হিসেবে দেখার জন্য। নিয়তি হয়তো স্ক্রিপ্টটা অন্যভাবে লিখেছিল। নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যখন স্প্যানিশ উল্লাস, তখন মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ৩৯ বছর বয়সি ফুটবল জাদুকর চোখের জল ফেলছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালটা লিওনেল মেসির হাতে আরো একটি ট্রফি তুলে দেয়নি সত্যি; কিন্তু বিধাতা তাকে সব দিয়েছেন, যার নাম ‘অমরত্ব’। স্পেনের কাছে ১-০ গোলের হার আর্জেন্টিনার জন্য হৃদয়ভঙ্গ হলেও ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এটি ছিল এক কিংবদন্তির গৌরবময় ‘বিদায়ের মহাকাব্য’!

কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহাম কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো তরুণ তুর্কিদের গতি আর শক্তির বিশ্বকাপে ৩৯ বছরের মেসি খেলেছেন স্রেফ মস্তিষ্ক দিয়ে। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার করা ১৯ গোলের ১২টিই এসেছে তার পা ছুঁয়ে (আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট)। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হাঁকিয়েছেন দারুণ এক হ্যাটট্রিক। ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পের (১০ গোল) চেয়ে মাত্র দুই গোল পিছিয়ে থেকে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে রানার্সআপ হয়েছেন ইন্টার মিয়ামির এই মহাতারকা। বয়স যে স্রেফ একটি সংখ্যা, তা আবারও প্রমাণ করলেন ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী ‘এলএমটেন’।

বিজ্ঞাপন

এ বিশ্বকাপে মেসির আরেকটি লড়াই ছিল ইতিহাসের পাতায় নিজের অবস্থান আরো শক্ত করার। টুর্নামেন্ট চলাকালে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে শীর্ষে উঠেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে গোল করে কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল নিয়ে আবার শীর্ষস্থান দখল করেন। মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা থেমে যায় ২১-এ।

এবারের বিশ্বকাপে মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবলের পরিসংখ্যানকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছেন; ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের ফাইনালে অধিনায়কত্ব করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩৩ গোলে অবদান এবং ১২ অ্যাসিস্টের মালিকও এখন এই মেগাস্টার। আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০৭ ম্যাচ খেলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদরিচের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফুটবলের ২০০ ম্যাচের এলিট ক্লাবে নিজের নাম লিখে ফেলেছেন। গোল পেয়েছেন ১২৫টি।

সংখ্যা বা পরিসংখ্যান দিয়ে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গভীরতা মাপা অসম্ভব। ২০০৬ বিশ্বকাপে অভিষেকের পর দীর্ঘ একটা সময় তাকে তীব্র সমালোচনা ও অপবাদের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৭ সালের কোপা আমেরিকা, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ এবং পরে টানা দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়ের নিষ্ঠুর আঘাত সইতে না পেরে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি। তবে সেই অভিমানী বিদায় স্থায়ী হয়নি। রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর কোচ লিওনেল স্কালোনির ছোঁয়ায় বদলে যায় আর্জেন্টিনার ফুটবলের পুরো দৃশ্যপট। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, ২০২২ সালের স্বপ্নের বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ে মেসির হাত ধরেই আলবিসেলেস্তেরা প্রবেশ করে সাফল্যের এক অবিস্মরণীয় স্বর্ণযুগে।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমের বিষাদ ছুঁয়ে গেছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে। তবে কোচ লিওনেল স্কালোনির কথাতেই লুকিয়ে ছিল আসল সত্য, ‘মেসি ফুটবলকে যা দিয়েছে, একটি ম্যাচ বা একটি ট্রফি দিয়ে তার পরিমাপ অসম্ভব।’

ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠে হাত রেখে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন মেসি। চার বছর আগে ফ্রান্সের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয় আর টানা দুটি কোপা আমেরিকা জয়ের পর এই হার যেন মেনে নেওয়া কঠিন ছিল ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকার জন্য। লা লিগা ও পিএসজির পাট চুকিয়ে তিন বছর আগে যখন তিনি এমএলএস-এ যোগ দেন, অনেকেই ভেবেছিলেন তার ক্যারিয়ারের শেষ। কিন্তু এই বিশ্বকাপেও ৮ ম্যাচে ৮টি গোল এবং ৪টি অ্যাসিস্ট করে দলকে ফাইনালে টেনে এনেছেন তিনি।

ম্যাচ শেষে লামিনে ইয়ামালরা তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিলেও মেসির চোখে-মুখে ছিল রাজ্যের হতাশা। রানার্স-আপ মেডেল নেওয়ার সময় স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের দেওয়া 'গার্ড অব অনার'-এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় জোড় করে একটু হাসার চেষ্টা করলেও তা মলিন হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এটিই মেসির শেষ ম্যাচ কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কোচ লিওনেল স্কালোনি জানান, মেসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে এখনো তাদের কোনো কথা হয়নি। তবে তিনি যোগ করেন, 'সবাই যেন তাকে নিয়ে গর্ববোধ করে, কারণ সে ফুটবল ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।'

আন্তর্জাতিক মঞ্চে এটাই যদি মেসির ‘লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ বিশ্বকাপ হয়ে থাকে, তবে কাপ না পাওয়ার আক্ষেপ ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্ব মনে রাখবে এক বুড়ো জাদুকরের অদম্য লড়াইকে। যিনি ট্রফি ছাড়াই ফুটবল মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন সর্বকালের সেরা বা ‘গোট’ হিসেবে।

স্পেনের এই জয়ের দিনে ফুটবল বিশ্ব যেমন লামিনে ইয়ামালের মতো ১৯ বছর বয়সী নতুন এক তারকার উত্থান দেখল, ঠিক তেমনি দেখল এক কিংবদন্তির ট্র্যাজিক এবং অশ্রুসিক্ত অধ্যায়। কনফেত্তির সোনালী আলোয় যখন স্পেন মেতে উঠেছিল উল্লাসে, তখন কাঁধ ঝুঁকিয়ে গ্লানিভরা মুখে মাঠ ছাড়ছিলেন ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন