ডালাসে রোববার বিকেলের আলোটা ছিল অন্যরকম।
ফুটবল বিশ্ব জানত, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস কখন, কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করবে, সেটা কেউ জানত না। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল।
লিওনেল মেসি বল পেলেন বক্সের ভেতর। সামনে অস্ট্রিয়ার কয়েকজন ডিফেন্ডার। এক মুহূর্তের জন্য শরীরটা বাঁকিয়ে নিলেন, তারপর বাঁ পায়ের সেই চিরচেনা স্পর্শ। বল জড়িয়ে গেল জালে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে বদলে গেল বিশ্বকাপের ইতিহাস। মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলকে পেছনে ফেলে ১৭ গোল নিয়ে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় ব্যক্তিগত মাইলফলক খুব বেশি নেই।
কিন্তু মেসি সেখানেই থামেননি।
ইনজুরি সময়ে আবারও পুরো ডালাসকে দাঁড় করিয়ে দিলেন তিনি। মাঝমাঠ থেকে শুরু করলেন একক অভিযান। ডিফেন্ডারদের কাটালেন, গোলকিপারকে সামনে টেনে আনলেন। গোললাইন রক্ষার জন্য পোস্টে দাঁড়িয়ে গেলেন দুই অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডারও। তবুও লাভ হলো না। মাটিতে প্রায় শুয়ে পড়ে স্লাইড করে বল পাঠিয়ে দিলেন জালে। গো...ও...ল! স্কোরবোর্ডে আর্জেন্টিনা ২, অস্ট্রিয়া ০।
খেলার শেষ বাঁশির আগে আরেকটি শট নিয়েছিলেন মেসি। কয়েক ইঞ্চি বাইরে দিয়ে চলে যায় বলটা। না হলে বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে হ্যাটট্রিকও হয়ে যেত। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দুটি ম্যাচ খেলেছে। করেছে পাঁচ গোল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, পাঁচটি গোলই মেসির। দুটি ম্যাচেই ম্যাচসেরা। দুটি ম্যাচেই দলের ত্রাতা। দুটি ম্যাচেই ইতিহাসের কেন্দ্রে একজনই।
এই মানুষটাকে আপনি কী বলবেন?
ফুটবলার? কিংবদন্তি? নাকি ম্যাজিশিয়ান?
আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে। শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে। আর সেই পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজনই—লিওনেল মেসি।
অথচ ম্যাচের শুরুটা ছিল অন্যরকম। পেনাল্টি পেয়েছিল আর্জেন্টিনা। স্পট কিকে দাঁড়ালেন মেসি। অস্ট্রিয়ার গোলরক্ষক আলেকজান্ডার শ্লাগার নড়লেন না। শেষ পর্যন্ত মেসির শট ঠেকিয়েও দিলেন। বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টি মিস! অনেকের জন্য সেটাই হতে পারত দুঃস্বপ্নের শুরু। কিন্তু মেসির জন্য সেটি ছিল গল্পের ভূমিকা মাত্র।
৩৮ মিনিটে যে গোলটি তিনি করলেন, সেটি ছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলের সৌন্দর্যের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি। আলমাদা, মেদিনা, আবার আলমাদার ডামি—তারপর মেসি। শট নেওয়ার আগে গোলকিপারকে ভুল পথে পাঠিয়ে কাছের পোস্টে বল জড়ানোটা ছিল খাঁটি শিল্প। আর সেই শিল্পের মাধ্যমেই জন্ম নিল নতুন বিশ্বরেকর্ড। মিরোস্লাভ ক্লোসা চারটি বিশ্বকাপ খেলে করেছিলেন ১৬ গোল। অনেকেই ভেবেছিলেন, এই রেকর্ড হয়তো অমর হয়ে থাকবে।
কিন্তু ডালাসে দাঁড়িয়ে মেসি প্রমাণ করলেন, অমর বলে কিছু নেই। বিশ বছর ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে যাওয়া এই মানুষটি এখনও ম্যাচের ভাগ্য একাই বদলে দিতে পারেন। এটাই তার শ্রেষ্ঠত্ব।
মিরোশ্লাভ ক্লোসা চার বিশ্বকাপে ১৬ গোল করেছিলেন-একটা রেকর্ড যেটাকে ছোঁয়া প্রায় অসম্ভব মনে হতো। কিন্তু মেসি সেই 'প্রায় অসম্ভব'কেও সম্ভব করে দিলেন ডালাসে। বিশ্বকাপে তাঁর ১৭তম গোল শুধু একটা সংখ্যা নয়—এটা ২০ বছরের ধারাবাহিক উৎকর্ষের প্রমাণ। মাঠে তিনি যেভাবে খেলেন, সেটা দেখার মতো। বল পায়ে নেই যখন, তিনি হাঁটেন শান্তভাবে, শক্তি সঞ্চয় করেন। কিন্তু যেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনা বলের দখল পায়, প্রতিটি সতীর্থের চোখ সেঁটে যায় তাঁর দিকে—সেই ছোট্ট মানুষটার দিকে, যিনি গ্যাপ তৈরি করেন এমন জায়গায় যেখানে আর কেউ গ্যাপ তৈরির চিন্তাও করতে পারে না। মেসি এজন্য অনন্য এবং একজনই!
ম্যাচে হারলেও মাঝে অস্ট্রিয়া লড়েছে সমানতালে। পল ওয়ানার সামান্য ঝলক দেখিয়েছেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে অস্ট্রিয়ার আক্রমণে গভীরতার অভাব ছিল স্পষ্ট। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ মাঝে খানিকটা খেই হারালেও দ্রুতগতিতে সেই ঝড় সামলে নিয়েছে। তবে এই ম্যাচের শুরুর একটাই শঙ্কা—জুলিয়ান আলভারেস ছাড়া পেছনের স্পেসে দৌড়ানোর মতো কেউ নেই দলে। লাউতারো মার্তিনেজ বা মেসি কেউই আর পেছন থেকে ছুটে যান না সেভাবে। তবে যতদিন মেসি আছেন এই মাঠে, ততদিন উত্তর খুঁজতে হয় না বেশি।
এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বকাপ যেন মেসিকেন্দ্রিক। তাঁকে দেখা সত্যিই সৌভাগ্যের—ফুটবলের সর্বশ্রেষ্ঠকে আরও একটা রেকর্ড ভাঙতে দেখা, আরও একটা গল্প লিখতে দেখা। ডালাসে যারা মাঠে ছিলেন, তাঁরা আজীবন মনে রাখবেন এই সন্ধ্যাকে। আর বিশ্ব মনে রাখবে এই ম্যাচকে। যার নাম মেসির ম্যাচ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


