ফুটবল শুধু পায়ের খেলা নয়, মস্তিষ্কেরও। বল যতটা দৌড়ায়, তার চেয়ে দ্রুত ছুটে চলে সিদ্ধান্ত। কে কোথায় দাঁড়াবে, কখন সামনে যাবে, কখন পেছনে নেমে আসবে, কোন মুহূর্তে ঝুঁকি নেবে আর কখন ধৈর্য ধরবে—এই ক্ষণিক সিদ্ধান্তগুলোর ওপরই গড়ে ওঠে বড় ম্যাচের ভাগ্য। একটি ভুল অবস্থান, একটি সঠিক দৌড় কিংবা এক সেকেন্ডের নিখুঁত সিদ্ধান্তই ইতিহাস বদলে দেয়। স্পেন ও আর্জেন্টিনার ফাইনালও তেমনই এক দাবার ম্যাচ, যেখানে বলের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বল ছাড়া খেলোয়াড়দের ছুটে চলা।
এ জায়গাতেই আর্জেন্টিনা আলাদা।
লিওনেল স্কালোনির দলের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো নির্দিষ্ট ফরমেশন নয়, বরং খেলার ভেতরের খেলাটা ‘পড়ার’ অসাধারণ ক্ষমতা। প্রতিপক্ষ কোথায় চাপ দিচ্ছে, কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছে, কখন ম্যাচের গতি কমাতে হবে, আর কখন হঠাৎ আঘাত হানতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয় চোখের পলকে।
আর্জেন্টিনার প্রতিটি আক্রমণের চেহারা একরকম নয়। কোনো আক্রমণ গড়ে ওঠে ধৈর্যের ওপর, কোনোটি মুহূর্তের বিস্ফোরণে। তারা মুখস্থ ফুটবল খেলে না; প্রতিটি আক্রমণই প্রতিপক্ষের অবস্থান দেখে নতুন করে লেখা হয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে খেলতে হয়, সেটা আর্জেন্টিনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না। কোচ স্কলানিকে তাই ভক্তরা ডাকেন ‘পজিশনাল কোচ’Ñএমন আদুরে নামে।
এ দলের হৃদস্পন্দন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগো ডি পল। তারা নির্দিষ্ট অবস্থানে আবদ্ধ নন। একজন নিচে নেমে খেলা গড়েন, আরেকজন দুই লাইনের মাঝখানে পাসের বিকল্প তৈরি করেন, তৃতীয়জন আক্রমণে ঢুকে সংখ্যাগত সুবিধা এনে দেন। কয়েক মুহূর্ত পরই ভূমিকাগুলো বদলে যায়। ফলে প্রতিপক্ষের জন্য কাউকে নির্দিষ্টভাবে মার্ক করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
এই উপর-নিচ করা মিডফিল্ডই আর্জেন্টিনাকে ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়। ছোট ছোট পাসে তারা প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে আনে; তারপর মুহূর্তেই সেই চাপের উল্টোদিকে বল সরিয়ে দেয়। বাইরে থেকে এটি সাধারণ পাসিং ফুটবল মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকে অসাধারণ সময়জ্ঞান, পজিশনিং সেন্স আর পারস্পরিক বোঝাপড়া।
ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে এই অস্ত্রই সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। স্পেনের পজিশনাল ফুটবলের মূল ভিত্তি হলো মাঠকে নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করে বলের দখল ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে ভুল অবস্থানে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু আর্জেন্টিনা যদি ক্রমাগত অবস্থান বদলে সেই কাঠামোকে অস্থির করতে পারে, তাহলে স্পেনের প্রেসিংয়ের মাঝেই তৈরি হবে ছোট ছোট ফাঁক। সেই ফাঁকই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে প্রিয় শিকার। আর সেখানেই ‘গোল শিকারের’ খোঁজে থাকেন মেসি।
এ পরিকল্পনায় মেসির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি শুধু গোলদাতা নন; প্রতিপক্ষের রক্ষণকে নিজের দিকে টেনে এনে অন্যদের জন্য জায়গা তৈরি করেন। মেসি যখন নিচে নেমে বল নেবেন, তখন আলভারেজ বা ডি পলের দৌড় স্পেনের রক্ষণকে সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলতে পারে। আবার মেসিকে থামাতে বাড়তি খেলোয়াড় এগিয়ে এলেই মাঝমাঠে তৈরি হবে সংখ্যায় এগিয়ে থাকার সুবিধা।
তাই এই ফাইনাল শুধু মেসি বনাম স্পেন নয়; এটি আসলে স্বাধীন চিন্তার ফুটবল বনাম সিস্টেমের মধ্যে থাকা পজিশনাল ফুটবলের লড়াই। একদিকে নিখুঁত ছক, অন্যদিকে মুহূর্ত বুঝে ছক ভাঙার শিল্প। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতবে সেই দলই, যারা প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা নয়, ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তকে সবচেয়ে ভালোভাবে পড়তে পারবে।
আর সেই ম্যাচ রিডিং সবচেয়ে ভালো জানে আর্জেন্টিনা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


