প্রায় ১৪ বছরের ব্যবধানে আরো একবার ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের টার্গেট বাংলাদেশের। ২০০৩ সালে একবারই এই শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর ৯টি আসরে অংশ নিলেও আর সাফ জেতা হয়নি তাদের। এবার বাংলাদেশের শিরোপা পুনরুদ্ধারের দারুণ সম্ভাবনা জেগেছে। হামজা-শমিতদের আগমনে যে ফুটবলের জাগরণ হয়েছে, তাতেই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের হাতে আবারও সাফের শিরোপা দেখছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা। আগামী ৫-১৭ নভেম্বর জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাওয়া সাফের ১৫তম আসরে বাংলাদেশকেই সবার চেয়ে এগিয়ে রাখছেন তারা। এবারের টুর্নামেন্টে অংশ নেবে ছয়টি দল। এর আগে সবশেষ ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়া আসরে খেলেছিল মোট ৮টি দল। এর মধ্যে কুয়েত ও লেবানন ছিল সাফের আমন্ত্রিত দল। ভারত হয়েছিল চ্যাম্পিয়ন, আর রানার্সআপ হয় কুয়েত। এবার দলের সংখ্যা কমেছে। পাশাপাশি টুর্নামেন্টে খেলছে না শক্তিশালী নেপাল। ফিফার নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাফে নাম লেখাতে পারেনি দলটি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাফে সিনিয়র জাতীয় দল পাঠাচ্ছে না ভারত। তাদের অনূর্ধ্ব-২৩ দল টুর্নামেন্টে খেলবে। আসন্ন সাফে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে লড়বে শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান। অভিজ্ঞতা, শক্তি, সামর্থ্য—সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ করলে এই ছয়টি দলের মধ্যে বাংলাদেশই ফেভারিট।
হামজা চৌধুরী, শমিত সোম, জায়ান আহমেদ, সুকি, ইতোফুসা, ফাহামিদুল ইসলামদের মতো অভিজ্ঞ ও প্রতিভাবান প্রবাসী খেলোয়াড়রা দলে যোগ দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবল শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ। অবশ্য শ্রীলঙ্কা দলেও বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের আধিক্য রয়েছে। শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলের বেশ কিছু খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন ও ইংল্যান্ডের ক্লাবের হয়ে খেলে থাকেন। তাদের একাদশে ১১ জনের মধ্যে ৯ জনই থাকেন বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়। প্রবাসী খেলোয়াড়ে ঠাসা শ্রীলঙ্কা দলটি পারফরম্যান্সেও দুর্দান্ত। অন্যদিকে, বর্তমান পাকিস্তান দলটিও বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। তাদেরও বেশ কিছু খেলোয়াড় ইউরোপের লিগে খেলেন নিয়মিত। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের তুলনায় অত বেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় নেই ভুটান কিংবা মালদ্বীপ দলে। সব মিলে ছয়টি দলের মধ্যে মানসম্পন্ন প্রবাসী ফুটবলারে সেরা বাংলাদেশ। যদি আসন্ন সাফে বাংলাদেশকে কেউ কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়, সেই দল হবে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। এ কথা মানছেন একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে বাংলাদেশের হয়ে আটটি সাফে খেলা বিপ্লব ভট্টাচার্য। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও গোলক্ষক বিপ্লবের মতে, এবার সাফের শিরোপা জেতার সুবর্ণ সুযোগ বাংলাদেশের সামনে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে, সেটি হবে খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। বিপ্লব আমার দেশকে বলেন, ‘অনেক কারণেই এবার আমরা সবার চেয়ে এগিয়ে। প্রথমত আমরা ঘরের মাঠে খেলব। তাছাড়া ভারতের জাতীয় দল আসছে না। তাদের অনূর্ধ্ব-২৩ দল খেলবে। নেপাল খেলবে না। আমার মনে হয়, বাংলাদেশকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো দল পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। যদিও অন্যদের খাটো করে দেখছি না। তবে পুরো টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ অনেকটাই চাপমুক্ত থাকবে। হামজাদের অন্তর্ভুক্তিতে আমাদের যে বর্তমান দল, আমরা ফাইনাল খেলা ডিজার্ভ করি।’
এদিকে, ২০০৩ সালের সাফজয়ী স্ট্রাইকার আলফাজ আহমেদ। তার মতেও আসন্ন আসরে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ফুটবল দল বাংলাদেশ। দলে বিশ্বমানের ফুটবলাররা যোগ দিয়েছেন। শক্তির বিচারে বাংলাদেশের চেয়ে পেছনে সাফের অন্য দলগুলো। আলফাজ আমার দেশকে বলেন, ‘অন্যদের চেয়ে আমরা অবশ্যই এগিয়ে আছি। এ দলটির সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতা উচিত। যদি শিরোপা জিততে না পারে দলটি, তাহলে সেটি হবে বড় ধরনের ব্যর্থতা।’ আলফাজের মতে, সাফের শিরোপা জয় নির্ভর করছে, কোচ থমাস ডুলির নেওয়া পরিকল্পনা, কৌশল আর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। একাদশ সাজানো থেকে শুরু করে সব দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন কোচ। আলফাজ বলেন, ‘কীভাবে খেললে শিরোপা জেতা যাবে, সেই টার্গেট করতে হবে কোচকেই। খেলোয়াড়রা তো তাদের সেরা পারফরম্যান্সটাই দেবে। প্রত্যাশা করি, দলটি সাফের শিরোপা জিতুক।’
সব দলের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও আলফাজ আহমেদ মনে করেন, সাফে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিতে হবে আক্রমণভাগকে। কেননা দুর্বল আক্রমণভাগ নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ‘নাম্বার নাইন’ পজিশন নিয়ে বেশি চিন্তিত কোচ। আলফাজ আহমেদের মতে, আক্রমণভাগে বাংলাদেশের দুর্বলতার খবর পুরোনো। তবে এখানে যারা খেলছেন, তারা বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। এই জায়গায় ভালো করতে হবে। স্কোয়াডে যারা আছেন, যে কেউই গোল করতে পারেন। অ্যাটাকিং থার্ডে গিয়ে যদি টাইমিংয়ে খেলোয়াড় থাকেন তাহলে গোল হবেই। সেখানে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেন সুকি, ফারহানরা। উইং থেকে ভালো মানের বল পাওয়া গেলে স্কোর করার সামর্থ্য রয়েছে তাদের। এদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ফিফা আয়োজিত আসিয়ান কাপে খেলেছে। এই টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচে খেলে ১৩ গোল হজম করে কোচ থমাস ডুলির দল। এই ভরাডুবির পরপরই সাফ চ্যালেঞ্জে নামছে বাংলাদেশ। সাবেক গোলরক্ষক বিপ্লব মনে করেন, আসিয়ান কাপে শুধু যে গোলরক্ষকের পারফরম্যান্স হতাশাজনক ছিল তা নয়, বরং পুরো দল ভয়ানক বাজে খেলেছে। যদি সাফে মানসিক সাপোর্ট ও উৎসাহ দেওয়া যায় খেলোয়াড়দের, তাহলে আস্থা ফিরে পাবেন গোলরক্ষকরা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

