সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে রাশিয়ার সামরিক স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করছে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথিরা। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান অরোরা জিওসিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের এক তদন্তে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের পশ্চিমা সমর্থিত সরকার ও সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে হুথিদের সংঘাত দীর্ঘদিনের। গত জুলাই থেকে লড়াই তীব্র হয়েছে। সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলের পুরো নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিদ্রোহীদের সামরিক তৎপরতা আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের তিনটি পাম্পিং স্টেশনে নির্ভুল হামলা চালায় হুথিরা। তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক দিন আগে রুশ স্যাটেলাইটগুলো ওই অঞ্চলটির ওপর নজরদারি চালিয়েছিল।
রাশিয়ার স্যাটেলাইট ব্যবহার নিয়ে তথ্য
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে হুথিদের চালানো ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিশ্লেষণ করেছে অরোরা। প্রতিটি হামলার আগে ও পরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাশিয়ার সরকারি ও সামরিক স্যাটেলাইটের নজরদারির ধারাবাহিকতা পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা নওয়াফ ওবায়েদ জানান, রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বার্স-এম, পারসোনা, লোটোস-এস১, পিওন-এনকেএস ও কনডর-এফকেএ স্যাটেলাইট নজরদারি চালিয়েছে।
তার দাবি, রাশিয়ার স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ভূস্থানিক ও সংকেতসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য ইরানের নেতৃত্বাধীন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে সহায়তা করছে, যা ইয়েমেনে হুথিদের সামরিক অভিযানেও কাজে লাগছে।
বিশেষ করে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের তিনটি পাম্পিং স্টেশনে হামলাকে এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থাপনাগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব ও দুর্বলতা সম্পর্কে হামলাকারীদের স্পষ্ট ধারণা ছিল বলে মনে করেন তদন্তকারীরা।
তদন্তের তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়ার মনে করেন, স্যাটেলাইটের উপস্থিতি থেকেই প্রমাণ হয় না যে রাশিয়া সরাসরি হুথিদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে।
তার মতে, অন্তত চারটি সম্ভাবনা রয়েছে—
• রাশিয়া সরাসরি ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে।
• ইরান বাণিজ্যিক চ্যানেলে রাশিয়ার স্যাটেলাইটের ছবি সংগ্রহ করেছে।
• তৃতীয় কোনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে তথ্য পেয়েছে ইরান।
• রাশিয়ার সামরিক স্যাটেলাইটের তথ্য অন্য কোনো উপায়ে ইরানের হাতে পৌঁছেছে।
তবে ওবায়েদ বলেছেন, রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা ব্যবস্থার সঙ্গে বৃহত্তর সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া গেলেও নির্দিষ্ট কোনো হামলায় কোন স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে আরও প্রমাণ প্রয়োজন।
সৌদি আরবের একজন কর্মকর্তা, হুথিদের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এবং একজন বেসরকারি গোয়েন্দা বিশ্লেষকও জানিয়েছেন, হুথি ও ইরানপন্থি অন্যান্য গোষ্ঠী রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা সক্ষমতা থেকে সুবিধা পাচ্ছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি গত সপ্তাহে বলেন, হুথিরা রাশিয়া ও চীনের কাছ থেকে গোয়েন্দা সহায়তা পাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের সঙ্গে সৌদি আরব নিয়মিত আলোচনা করছে।
ইরান ও হুথিদের জন্য রাশিয়ার সহায়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তা হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের সংঘাতকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ করে তুলছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, সংঘাত এখন আর শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এতে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পক্ষের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
তার মতে, রাশিয়ার সহায়তা সরাসরি হুথিদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, নাকি ইরানের মাধ্যমে আসছে-তা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। মূল বিষয় হলো, হুথিরা ক্রমেই একাধিক দেশের কাছ থেকে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা পাচ্ছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও হুথিদের বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে রাশিয়া কূটনৈতিকভাবে তাদের সুবিধা করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সৌদি আরবে কোথায় কোথায় হামলা চালিয়েছে হুথিরা
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক স্থাপনাগুলো তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
তার দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল—
• রাস তানুরা তেল শোধনাগার।
• আবকাইক এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা।
• রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
• দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
• রাবিগ তেল শোধনাগার।
• নাজরান অঞ্চলের সৌদি সামরিক সদর দপ্তর।
সৌদি কর্মকর্তাদের দাবি, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়েছেন। বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রীর ভ্রমণ বিঘ্নিত হয়। পরে বিমানবন্দরটি আবার চালু করা হয়েছে।
হুথিরা এত শক্তিশালী অস্ত্র পেল কোথায়
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা ও দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ দখলের পর হুথিরা দেশটির সেনাবাহিনীর অস্ত্রভান্ডারের নিয়ন্ত্রণ পায়। সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর অনুগত বাহিনীর সঙ্গেও তারা জোট গড়ে তোলে।
এরপর ইরানের সহায়তায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়তে থাকে। আন্তর্জাতিক কালোবাজার থেকেও অস্ত্রের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করেছে তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের হাতে এখন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল ও আত্মঘাতী ড্রোন রয়েছে। ইরানের তৈরি বা প্রযুক্তিনির্ভর প্যালেস্টাইন-২ ও তুফান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও তাদের অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে ইরান অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেও প্রশিক্ষণ ও সামরিক অভিজ্ঞতা পেয়েছে হুথিরা।
২০২২ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির সময়টিও তারা সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগিয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
কেন হুথিদের ঠেকাতে পারছে না সৌদি আরব
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং বিপুল অস্ত্রের মালিক হওয়া সত্ত্বেও হুথিদের বিরুদ্ধে কার্যকর সামরিক সাফল্য পাচ্ছে না সৌদি আরব।
বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ শুধু হুথিদের সামরিক সক্ষমতা নয়; সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও বড় বাধা।
সামরিক বিশ্লেষক এলিয়াহ ম্যাগনিয়ারের মতে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। বিমান হামলার পর স্থলবাহিনীকে অগ্রসর হয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কিন্তু সৌদি সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সেই সক্ষমতা ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতির অভাব রয়েছে।
আহমেদ নাগিও মনে করেন, সৌদি সমর্থিত ইয়েমেন সরকার ও তার মিত্ররা সুসংগঠিত সামরিক শক্তি গড়ে তুলতে পারেনি। দ্রুত সাফল্যের আশায় বিমান হামলার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করায় প্রত্যাশিত ফল আসেনি।
বিশ্লেষক সাজ আহমাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে সৌদি আরব বিপুল অর্থ ব্যয়ে আধুনিক অস্ত্র কিনলেও সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার ও সমন্বিত সামরিক প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। অন্যদিকে, ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হুথিদের কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেছে।
তার আশঙ্কা, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদি আরবও শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের সংঘাত থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে পারে।
আরএ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



-98ab00.jpg)
