হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর অবরুদ্ধ গাজায় আবারও বর্বর স্থল অভিযান শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। একইসঙ্গে তারা গুরুত্বপূর্ণ নেতজারিম করিডরের একটি অংশ নিজেদের দখলে নিয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে তারা ফের স্থল অভিযান শুরু করে।
ইসরাইলের নতুন করে বোমাবর্ষণ টানা তৃতীয় দিনের মতো অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ ও উত্তর গাজায় বৃহস্পতিবার রাত ও ভোরে কমপক্ষে ৭১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে একটি নবজাতকও রয়েছে। এ হামলায় আহত হয়েছেন আরো অনেকে। ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম কুদস নিউজ নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণের খান ইউনিসের বেশ কয়েকটি বাড়িতে হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হন। এদিকে, উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার পশ্চিমে আস-সুলতানপাড়ায় একটি বাড়িতে হামলার ফলে একই পরিবারের কমপক্ষে সাতজন নিহত হয়েছেন।
ইসরাইলি বাহিনী জানিয়েছে, বুধবার তারা নেতজারিম করিডোর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কারণ এটি গাজার উত্তর ও দক্ষিণাংশের মধ্যে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল ও আংশিক বাফার জোন’ তৈরি করবে। এই করিডোরটি গাজাকে দুইভাবে বিভক্ত করে। গত মাসে এই করিডোর থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছিল ইসরাইল। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ গাজার বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরতে শুরু করেছিল। তবে নতুন করে এটি পুনদর্খলের ফলে গাজাবাসীর চলাচল ব্যাহত হবে।
আলজাজিরার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ গাজা সিটি থেকে বলেছেন, এ এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর উপস্থিতি নতুন করে স্থল অভিযানের সমতুল্য। এটি স্পষ্ট যে, ইসরাইল এ অঞ্চলকে তাদের অভিযান চালানোর কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে চায়।
গাজায় স্থল অভিযান শুরুর আগে সেখানে ব্যাপকভাবে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সেই অভিযানে মঙ্গলবার এক দিনেই নিহত হয়েছে ৪০০’র বেশি ফিলিস্তিনি। ইসরাইলের অভিযোগ, হামাস যুদ্ধবিরতির একটি নতুন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তারা এ হামলা শুরু করে। নতুন এই চুক্তির আওতায় হামাসের কাছে জিম্মি থাকা ৫৯ বন্দিকে মুক্তি দিতে বলেছিল ইসরাইল। যাদের বেশিরভাগই মৃত বলে দাবি তাদের। কিন্তু এতে রাজি হয়নি হামাস। কারণ হামাসের বক্তব্য, ইসরাইল যুদ্ধ শেষ করতে সম্মত না হয়েই জিম্মিদের মুক্তি দাবি করেছে।
নতুন চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য হামাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইসরাইল এ মাসের শুরুতে গাজা উপত্যকায় সব ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
হামাস বলেছে, ইসরাইলের উচিত জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত মূল যুদ্ধবিরতি মেনে চলা। যেখানে উভয় পক্ষ অবশিষ্ট বন্দিদের হস্তান্তর, শত্রুতার স্থায়ী অবসান এবং গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা উল্লেখ ছিল। হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর প্রধানের মিডিয়া উপদেষ্টা তাহের আল-নোনো বলেছেন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের সামনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও কেন নতুন করে প্রস্তাব আনা হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রস্তাবও রয়েছে। হামাস সব ধরনের চুক্তিতে সম্মত হলেও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুই চুক্তি থেকে সরে এসেছেন। তাই চুক্তি মানতে হামাসকে নয়; বরং নেতানিয়াহুকে বাধ্য করতে চাপ দেওয়া উচিত।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার বেশ কয়েকটি ইসরাইলি বিমান হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে একজন বিদেশি জাতিসংঘ কর্মীও রয়েছেন। ইসরাইল বলেছে, তারা মধ্য গাজায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, নতুন করে ইসরাইলি অবরোধের মধ্যে হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এদিকে, ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ বুধবার এক ভিডিও বার্তায় গাজাবাসীকে হুমকি দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি ‘শেষ সতর্কবার্তা’। যদি সব বন্দিকে মুক্ত এবং হামাসকে নির্মূল না করা হয়, তাহলে ইসরাইল এমন মাত্রার আক্রমণ চালাবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরামর্শ গ্রহণ করে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে চলে যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

