ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জটিল হলেও দিন শেষে দুই দেশ এক হবে বলে আশাবাদী মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। বাণিজ্য শুল্ককে ঘিরে চলমান টানাপোড়েনের মাঝে তার এই মন্তব্য দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারতের সরকারি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বার্তাসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে।
রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার জরিমানা হিসেবে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলৈন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আলোচনার পর দুই দেশ এই বিষয়ে সমঝোতায় আসতে পারে বলে ধারণা করা হলেও তা হয়নি।
ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে বিদেশনীতি, বাণিজ্য, শুল্ক ছাড়াও একাধিক বিষয় ঘিরে দূরত্ব বেড়েছে। এরই মাঝে রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে অনড় নরেন্দ্র মোদী। এদিকে, ২৭শে অগাস্ট থেকেই ট্রাম্প প্রাশনের তরফে ভারতের ওপর আরোপ করা ৫০ শতাংশ বাণিজ্য শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
মার্কিন শুল্কের কারণে ভারতের গয়না, রত্ন, সি-ফুড, পোশাক, চামড়ার জিনিসের রপ্তানির মতো একাধিক বাণিজ্যিক খাতে প্রভাব পড়বে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর সমাধান এবং বিকল্পপথ খুঁজতে বদ্ধপরিকর ভারত।
এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয় কি না এবং দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে গড়ায়, তা লক্ষ্যনীয়।
যা বলেছেন স্কট বেসেন্ট
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক, বাণিজ্য ঘাটতি, ও বাণিজ্য শুল্ক, তার কারণ, সে বিষয়ে দর কষাকষি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কোনদিকে যেতে পারে, এমন একাধিক বিষয়ে কথা বলেছেন বেসেন্ট।
তিনি বলেছেন, ‘যখন বাণিজ্য সম্পর্কের মধ্যে বিভেদ দেখা দেয়, তখন ডেফিসিট কান্ট্রির (বাণিজ্য ঘাটতিতে থাকা দেশ) সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে। এক্ষেত্রে সারপ্লাস কান্ট্রির (বাণিজ্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্বৃত্ত) চিন্তা করা উচিৎ।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভারতীয়রা আমাদের কাছে পণ্য বিক্রি করছে এবং তাদের শুল্ক বেশ চড়া। যুক্তরাষ্ট্র ডেফিসিট কান্ট্রি। আমি বরাবরই এই বিষয়ে বলেছি, বাণিজ্য নিয়ে আলোচনার সময়েও এটাই বলেছি।’
তবে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি... আমার মনে হয় দিনের শেষে আমরা এক হব।’
বেসেন্ট স্মরণ করিয়ে দেন বাণিজ্য চুক্তি পাকা করার বিষয়ে ভারতই প্রথমে আগ্রহী ছিল। কিন্তু মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করার বিষয়ে তারা ‘অনিচ্ছা’ প্রকাশ করেছে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কিনে চলেছে ভারত। এই সমস্ত কারণেই আলোচনা গতি পায়নি।
বেসেন্ট বলেছেন, ‘এটা একটা অত্যন্ত জটিল সম্পর্ক, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির মধ্যে সেই স্তরে খুব ভালো সম্পর্ক রয়েছে। (শুল্ক আরোপের বিষয়টা) শুধুমাত্র রাশিয়ান তেলের উপর নির্ভর করে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘লেবার ডে-র পরপরই ভারত শুল্ক নিয়ে আলোচনা শুরু করে কিন্তু এখনো আমাদের মধ্যে কোনো চুক্তি হয়নি। আমি ভেবেছিলাম মে বা জুন মাসের মধ্যে চুক্তি হয়ে যাবে। ভেবেছিলাম আগেভাগে চুক্তি হয়ে যাওয়া দেশের মধ্যে ভারত থাকবে।’
‘তবে বিষয়টা একরকম স্থবির হয়ে যায়, তার ওপর রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনার দিকটাও রয়েছে যেখান থেকে তারা লাভও করছে। এখানে বিভিন্ন স্তর রয়েছে।’
ভারতের অনড় অবস্থান:
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন ‘যদি রাশিয়া থেকে ভারতের তেল বা পরিশোধিত পণ্য কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে আমাদের কাছ থেকে কিনবেন না। কেউ আপনাদের জোর করছে না।’
চলতি সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী মোতিও জানিয়েছেন, কৃষক, গবাদি পশু, ক্ষুদ্র শিল্পের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত কোনোরকম আপোষ করতে রাজি নয়। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের উপর চাপ বাড়তে পারে, তবে আমরা সেটা সহ্য করব।’
আলোচনার রাস্তা খোলা আছে
ভারতের কাছে রপ্তানির দিক থেকে সবচেয়ে বড় বাজার হলো যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪-২৫ সালে ভারতের মোট ৪৩৭ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মূল্যের পণ্য রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছে। এই আবহে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে দুই দেশের মধ্যে সংলাপের পথ এখনো বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। বার্তাসংস্থা পিটিআই একজন সরকারি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, (নতুন শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর) পরিস্থিতি যতটা খারাপ হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা হবে না।’
ওই কর্মকর্তা এ-ও বলেছেন, বাণিজ্যের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার জন্য রাস্তা খোলা আছে।
নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাব
পোশাক তৈরি, গহনা ও রত্ন তৈরির ব্যবসা, সি-ফুড, চামড়ার পণ্য তৈরিসহ একাধিক সেক্টর চড়া শুল্কের কারণে প্রভাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিমধ্যে পোশাক ও গহনা তৈরি, হীরার কাটিং ও পালিশ করার কারখানা, চিংড়ির চাষের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু অর্ডার আটকে গিয়েছে বা বাতিল হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীর পক্ষেই চড়া শুল্ক বহন করে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য বিক্রি সম্ভব নয়। এই সেক্টরগুলোর সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাও নিজেদের জীবিকা নিয়ে চিন্তিত।
অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল মিথিলেশ্বর ঠাকুর পিটিআইকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ১০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের টেক্সটাইল রপ্তানি হয়। এই শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চামড়া রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, মার্কিন ক্রেতারা এখন ২০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দাবি করছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



