ভারতে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করা তরুণদের আন্দোলনের দুই সপ্তাহ পরও পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতা গ্রহণের পর এ আন্দোলনকে তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
অনলাইনভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলন রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে শুরু হয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনটি সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের ক্ষোভ থেকে শুরু হলেও তা দ্রুত বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব ও মোদি সরকারের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে ওঠার বিরুদ্ধে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
আন্দোলনকারীরা তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের পর আন্দোলন স্থগিত রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বিশ্লেষণে এ আন্দোলনের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ ভারতের বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
আন্দোলনের মুখে গত ২৫ জুলাই ভারতের শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে নিজের দৃঢ় ভাবমূর্তি গড়ে তোলা প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি ছিল বিরল পশ্চাদপসরণ। এরপর থেকেই সরকার তরুণদের মন জয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের শাস্তি আরো কঠোর করেছে দেশটির সংসদ। এছাড়া বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলাও প্রত্যাহার করেছে পুলিশ। বিক্ষোভগুলো দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বাস্তবতাও সামনে এনেছে। বিক্ষোভকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন।
এক্সের নিয়মিত ব্যবহারকারী মোদি প্রথমবারের মতো তরুণদের পছন্দের প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হয়েছেন। সেখানে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
বিক্ষোভের সময় কর্তৃপক্ষ কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত ক্যামেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নজরদারি ও শনাক্ত করছে, তা-ও সামনে এসেছে। বিক্ষোভ চলাকালে ধারণ করা অনেক নারীর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তারা অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি ও অশালীন বার্তা পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্রের আশপাশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়। এতে তরুণদের যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে নতুন নতুন উপায় খুঁজে নিতে হয়।
ইন্টারনেট নজরদারি সংস্থা অ্যাকসেস নাউয়ের তথ্যানুযায়ী, গত বছর বিশ্বে ইন্টারনেট বন্ধের দিক থেকে ভারত ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে বিক্ষোভের সূচনা হয়। তবে খুব দ্রুত এর সঙ্গে যুক্ত হয় চাকরি, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার সংকট নিয়ে তরুণ ভারতীয়দের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ।
অনেক বিক্ষোভকারীর কাছে বছরের পর বছর পড়াশোনা এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এখন বৃহত্তর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এ কারণে মূল দাবির বাইরেও এ আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বিক্ষোভের পর অনলাইনে লাখো অনুসারী নিয়ে তরুণদের আন্দোলন গড়ে উঠেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, দীর্ঘমেয়াদে এটি রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে পারবে।
সিজেপি জানিয়েছে, তারা তরুণ ভারতীয়দের উদ্বেগ ও সমস্যার কথা শুনতে ‘দেশব্যাপী জনমত শোনার কর্মসূচি’ আয়োজন করবে। পাশাপাশি পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভের প্রতিও সমর্থন অব্যাহত রাখবে সংগঠনটি। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে এখনো বিক্ষোভ চলছে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা ও নিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধারে একটি গণআন্দোলন’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিক্ষোভ ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোকে তরুণ ভোটারদের চাহিদা ও দাবির দিকে আরো বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করতে পারে। ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বিশাল সম্ভাবনাময় ভোটারগোষ্ঠী। তবে বিক্ষোভের সময় তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও রাজনৈতিক শক্তিকে ভোটে রূপান্তর করা ভিন্ন বিষয়। এ পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলÑউভয় পক্ষই তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষোভ ও হতাশাকে নিজেদের নির্বাচনি স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

