আবার কেন যুদ্ধে ফিরল ইরান

আবার কেন যুদ্ধে ফিরল ইরান
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন সশস্ত্র সদস্য। ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে টানা কয়েক দিনের আপেক্ষিক শান্তি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু করেছে ইরান। নতুন করে কোনো মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং নিজ শর্তে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন করতে তেহরান নিজেই আবার হামলা শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই পদক্ষেপকে ‘অপ্রত্যাশিত হামলা’ বলে অভিহিত করেছে।

ইরানের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে সংঘাত বাড়ানোর পথ তৈরি করেছে। গতকাল বুধবার সকালে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হানব। তারা বেশ ভালো রকমের প্রহার সহ্য করতে যাচ্ছে।’

বিজ্ঞাপন

ইরানের জন্য এই হুমকি কোনো চমক ছিল না। মার্কিন বোমারু বিমানগুলো আবার ফিরে আসতে পারে জেনেও তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান ‘খুব সুন্দরভাবে অনুরোধ করেছিল’ এবং আলোচনা চেয়েছিল বলেই গত সপ্তাহে মার্কিন হামলা স্থগিত রাখা হয়।

ইরান প্রকাশ্যে কোনো বিরতির প্রতিশ্রুতি না দিলেও দেশটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাদের সশস্ত্র বাহিনী সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

তবে সাময়িক নিয়ন্ত্রণের বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকান বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় তেহরান। রাতে আবার মার্কিন বিমান হামলা শুরু হওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চাপ বাড়ানোর কৌশলটি বেছে নিয়েছে তারা।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদরেজা আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘ইরানের কৌশলে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। ইরান যদি মনে করে কোনো পদক্ষেপই একমাত্র উপায়, তবে তারা আগে থেকেই হামলা চালাতে দ্বিধা করছে না।’

হিসাব-নিকাশ বদলেছে যে কারণে

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের পরপরই ইরান এই হামলা চালায়। নেতানিয়াহু এই বৈঠককে ট্রাম্পের সঙ্গে তার 'অন্যতম সেরা আলোচনা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎস জানান, ইসরাইল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন তাদের আটকে দেয়।

গবেষক হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, ইরানের এই হামলাটি হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংকেত।

তার মতে, কৌশলগত পরিবর্তনের কারণে ইরান এখন আসন্ন কোনো হুমকির আভাস পেলেই আগেভাগেই হামলা চালাতে প্রস্তুত।

সংঘাত বিস্তার ও সৌদি আরবের অবস্থান

জর্ডানে ইরানি হামলার পরপরই মার্কিন ও সৌদি সামরিক বাহিনী যৌথভাবে ইরাকে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের ওপর হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) জানায়, জর্ডান হামলার বদলা হিসেবে নয়, বরং গত ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যুদ্ধ কীভাবে আরো ছড়িয়ে পড়ছে তা স্পষ্ট হচ্ছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তারা তিনটি দিক থেকে হুমকির মুখোমুখি—ইয়েমেনের হুতি, ইরাকের ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া এবং স্বয়ং ইরান।

ইসরাইলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিচ এক্সে লিখেছেন, ‘ওয়াশিংটন ও তার উপসাগরীয় সহযোগীদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ইরান বা তার আঞ্চলিক সহযোগীদের কেউই তাদের মূল কৌশলগত লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আসতে রাজি নয়।’

তিনি আরো জানান, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে অনড় তেহরান।

অন্যদিকে হুতিরাও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ না তোলা পর্যন্ত তারা হামলা বন্ধ করবে না।

লাল রেখা ও সার্বভৌমত্ব

জর্ডানে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি তেহরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ইরান হামলা বন্ধ রেখেছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা আবার সামরিক পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

গারিবাবাদি বলেন, হরমুজ প্রণালি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে গেলে ইরান নিজেকে বিজয়ী মনে করতে পারবে না। এই সমুদ্রপথ ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার মূল হাতিয়ার।

চলতি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও জিপিএস বন্ধ রাখার অভিযোগে বাণিজ্যিক জাহাজে কেন হামলা চালানো হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র প্রণালিটিতে বিকল্প নৌপথ তৈরির চেষ্টা করছে, যা ইরানের জন্য একটি 'লাল রেখা'। বিকল্প পথ চালু হলে এই সমুদ্রপথে ইরানের সার্বভৌমত্ব একটি 'কল্পনা'য় পরিণত হবে।

গারিবাবাদি আরো যুক্ত করেন, ‘বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে জিপিএস বন্ধের জন্য তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধ ডেকে আনা সামান্য বিষয়। কিন্তু নেপথ্যের ব্যবস্থাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, হরমুজ প্রণালির এই সিদ্ধান্তগুলোর ওপর ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নির্ভর করছে।’

সিট্রিনোভিচের মতে, তেহরানের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা স্থগিত রাখার বিষয়টি ছিল তাদের 'কৌশলগত দুর্বলতা', কোনো সংযম নয়। এই ধারণার কারণে ইরান হামলা বাড়িয়ে তাদের শক্তি দেখাতে চাচ্ছে, আর কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি হচ্ছে না।

ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে—ইরানের কিছু দাবি মেনে নেওয়া, অথবা বাণিজ্য পথ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত সহ্য করা।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন