ইরানের সঙ্গে ১৫ ঘণ্টার যুদ্ধে যে শিক্ষা পেল ইসরাইল

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

ইরানের সঙ্গে ১৫ ঘণ্টার যুদ্ধে যে শিক্ষা পেল ইসরাইল

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য রোববার ইরানের সঙ্গে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়াটা সাময়িকভাবে তার সমর্থকদের কাছে এই বার্তা দেওয়ার সুযোগ হতে পারে যে, তিনি এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়াতে সক্ষম। তবে সোমবার মাত্র ১৫ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে এই লড়াই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইসরাইল এবং এর বিপর্যস্ত নেতা এক বড় উভয়সংকটের মধ্যে পড়েছেন, যেখানে তাদের ট্রাম্পের ওপর আগের মতোই নির্ভরশীল মনে হচ্ছে।

নেতানিয়াহু যদি ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের চলমান শান্তি আলোচনা নসাৎ করার আশা করে থাকেন, তবে বিমান হামলা বন্ধে উভয় পক্ষের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের চাপ এবং সোমবার ইসরাইলের আরেকটি হামলার প্রস্তুতি থেকে পিছিয়ে আসা প্রমাণ করে যে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এই সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি লড়াইয়ে লিপ্ত পক্ষগুলোর একে অপরের হামলার প্রতিক্রিয়া দেখানোর সমীকরণ বদলে দিয়েছে, যা ইসরাইলের জন্য সুবিধাজনক নয়।

বিজ্ঞাপন

ইসরাইল এখন বুঝতে পারছে যে ইরান লেবাননে তার প্রক্সি বাহিনী হিজবুল্লাহকে দিয়ে উত্তর ইসরাইলের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালাতে পারে, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইলি পাল্টা হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে এবং ট্রাম্প ইসরাইলকে ইরানের বিরুদ্ধে খুব কঠোর বা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশোধ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেন।

তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ-এর ইরান কর্মসূচির পরিচালক রাজ জিমত বলেন, ‘এটি ছিল একটি বড় পরিবর্তন।’

তিনি উল্লেখ করেন, এটি প্রমাণ করে যে ইরানের কট্টরপন্থি সরকার আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এবং তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে যুদ্ধে জড়াতে চান না, তাই ইরান ও লেবাননের পরিস্থিতির এই পারস্পরিক সংযোগ বজায় রাখতে তারা কিছুটা ঝুঁকি নিতেই পারে।’

ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে একটি নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার কয়েক দিন পরই এই সাম্প্রতিক সহিংসতার সূত্রপাত হয়। হিজবুল্লাহ ওই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং ইসরাইল হুমকি দিয়েছিল যে হিজবুল্লাহ আবারো ইসরাইলি ভূখণ্ডে হামলা চালালে বৈরুতে পাল্টা আঘাত করা হবে। রোববার হিজবুল্লাহ ইসরাইলে রকেট হামলা চালালে নেতানিয়াহু বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি এবং হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি দাহিয়াহ-তে হামলার নির্দেশ দেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরান ইসরাইলে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এর জবাব দেয়। সোমবার ইরানের ইয়েমেনি মিত্র হুথিরাও ইসরাইলে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং লোহিত সাগরে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট জাহাজে হামলার হুমকি দেয়।

ইরান বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও অবসরপ্রাপ্ত ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ইরান ও ইসরাইল উভয়ই যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের নিজস্ব সমীকরণ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘ইসরাইল বলছে আমাদের শহর ও সীমান্ত এলাকায় যেকোনো হামলার কারণে দাহিয়াহ-তে হামলা চালানো হবে। কিন্তু হিজবুল্লাহর কাছে বিষয়টি তেমন নয়। হিজবুল্লাহর বক্তব্য হলো দাহিয়াহর বদলা তেল আবিব, আর তোমাদের উত্তরের গ্রামগুলোর বদলা আমাদের দক্ষিণের গ্রামগুলো।’

সোমবার সন্ধ্যায় এক ভিডিও বার্তায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরান ও হিজবুল্লাহর এই নতুন সমীকরণ অসহ্য এবং আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি বলেন, ‘শত্রুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারের ব্যাপারে আমি অনড়।’

রোববার ও সোমবারের ইসরাইলি বিমান হামলা নেতানিয়াহুকে অন্তত একটি রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। এটি তার রাজনৈতিক ভিত্তিকে দেখিয়েছে যে তিনি ট্রাম্পের মুখোমুখি দাঁড়াতে প্রস্তুত, যিনি দাহিয়াহ-তে বোমাবর্ষণের জন্য ইসরাইলকে তিরস্কার করেছিলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাহসিকতা দেখানো নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ কঠিন পুনর্নির্বাচনী লড়াইয়ের মুখে জনমত জরিপে তিনি পিছিয়ে আছেন। মাত্র এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প এক ক্ষুব্ধ টেলিফোন সংলাপে নেতানিয়াহুকে অপমান করেছিলেন, যা পরে ট্রাম্প নিজেই নিশ্চিত করে জানান তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেছিলেন।

তবে সোমবার নেতানিয়াহুকে আবারো ট্রাম্পের শান্তি আলোচনার ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে, যার মাধ্যমে এমন একটি চুক্তি হবে যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে নিশ্চিতভাবে বিরত রাখবে।

যদিও ইসরাইলি বিশ্লেষকদের মতে, এটি ক্রমশ অসম্ভব মনে হচ্ছে।

অনেক ইসরায়েলি আশঙ্কায় আছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চূড়ান্ত চুক্তিটি হয়তো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র হবে না, অথচ এটি ইরানের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে এবং এর ফলে অঞ্চলে তাদের প্রভাব বিস্তার ও ইসরাইলকে হুমকির মুখে ফেলার সক্ষমতা বাড়বে।

কিছু বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, নেতানিয়াহু হয়তো বিশ্বাস করেছিলেন ইরানের সঙ্গে নতুন করে লড়াই দ্রুত ও সহিংসভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা এই শান্তি আলোচনাকে নসাৎ করে দেবে। এর পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের একটি পোস্ট যেখানে তিনি ইসরাইল ও ইরানকে অবিলম্বে গোলাগুলি বন্ধ করার দাবি জানান এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে একটি ফোনালাপ এই লড়াইয়ের দ্রুত অবসান ঘটায়।

সিট্রিনোভিচ বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, এটি স্পষ্ট যে কৌশলগতভাবে ট্রাম্পের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর স্বার্থ রয়েছে।’

এটি সেই বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তোলে যা গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই অনেক ইসরাইলিকে ভাবিয়ে তুলছিল।

রাজ জিমত বলেন, ‘অবশ্যই এর অনেক সুবিধা ছিল, কারণ এটি ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু এর সবচেয়ে বড় অসুবিধা ছিল এই যুদ্ধ কখন এবং কীভাবে শেষ হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। ফলে যতক্ষণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে শত্রুতা পুনরারম্ভ করতে না চাইবেন, ততক্ষণ ইসরাইল আসলে কিছুই করতে পারবে না।’

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন