শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধের তাগিদ

আমার দেশ অনলাইন
আমার দেশ অনলাইন

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধের তাগিদ
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: আল-জাজিরা

গত ১৪ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। এর আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধ এবং হত্যাকাণ্ড বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ইরানের শীর্ষ নেতারাও রয়েছেন। এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল। তবে পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তির জন্য ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বা ‘বৃহত্তর ইসরাইল’-এর বিপজ্জনক মতবাদ বন্ধ করা জরুরি।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ একটি নির্দিষ্ট দেশের সীমানা নয়, বরং একটি ধারণা। এই ধারণার কারণে ইরাক, গাজা, লেবানন, সিরিয়া এবং ইরানে একের পর এক যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই মতবাদ অনুযায়ী, ইসরাইলের সীমানা জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সমগ্র ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত হওয়া উচিত। ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ধারণার প্রতি তাদের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

এই মতবাদের পেছনে দুই ধরনের চরমপন্থি গোষ্ঠী রয়েছে। প্রথমত, নেতানিয়াহুর মতো ধর্মনিরপেক্ষ কট্টরপন্থিরা, যারা মনে করে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য নদী থেকে সাগর পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা উচিত এবং এর জন্য সেখানে থাকা ৮০ লাখ ফিলিস্তিনির ভাগ্যকে তারা পরোয়া করে না। দ্বিতীয়ত, ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের মতো ইহুদি আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী, যারা বিশ্বাস করে ঈশ্বর এই জমি কেবল ইহুদিদেরই দিয়েছেন।

স্মোট্রিচের মতে, ‘ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই।’

অতি সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ইসরাইল পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন বা সিরিয়ার ভূখণ্ডের সামরিক নিয়ন্ত্রণ ত্যাগ করবে না।

এই চরমপন্থি মতবাদটি কয়েক দশক আগে প্রত্যাখ্যান করা উচিত ছিল। কিন্তু নেতানিয়াহু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুটি পক্ষকে ইসরাইলপন্থি ইহুদি জায়নিস্ট এবং ‘এন্ড টাইমস’ বা শেষ জামানার ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাসী খ্রিস্টান জায়নিস্টদের ব্যবহার করে এটিকে টিকিয়ে রেখেছেন।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল এই ‘গ্রেটার ইসরাইল’ কল্পকাহিনীরই সর্বশেষ অংশ। ধারণা করা হয়েছিল, ৯০ লাখ মানুষের দেশ ইরানকে একদিনেই পতন ঘটানো যাবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি ও মার্কিন বোমায় ইরানের শীর্ষ নেতারা নিহত হলেও দেশটির পতন ঘটেনি। উল্টো হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে, হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়েছে এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে।

এর আগে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার মার্কিন-ইসরাইলি পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়েছে এবং দীর্ঘ ১২ বছরের যুদ্ধে দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ‘গ্রেটার ইসরাইল’ বিভ্রান্তিতে যোগ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ইরানের সাথে নতুন চুক্তিটি তার জন্য এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার একটি পথ। এই কারণেই ইসরাইলের ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পন্থি রাজনীতিকরা এই চুক্তিকে নস্যাৎ করতে চাইছে। চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও ইসরাইল লেবাননে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে, যার ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গত শুক্র ও শনিবার যথাক্রমে ৪৭ ও ৩২ জন নিহত হয়েছেন।

‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি ইসরাইলকে রক্ষা করছে না, বরং ধ্বংস করছে। বিশ্বজুড়ে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ধসে পড়েছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন ইসরাইলকে নেতিবাচকভাবে দেখে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ১০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৬ জনই ইসরাইলকে পছন্দ করেন না।

তাই পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি আনার একমাত্র উপায় হলো ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি বন্ধ করা। এর জন্য ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ করা, গাজায় গণহত্যা বন্ধ করা এবং পশ্চিম তীরের ওপর চাপ সৃষ্টি করা বন্ধ করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী ইসরাইলের পাশাপাশি ১৯৪তম জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। একই সাথে আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে লেবানন ও সিরিয়া থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আরব বিশ্ব এবং ইরানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এটি স্পষ্ট করতে হবে যে, ‘গ্রেটার ইসরাইল’ নীতি ত্যাগ করাই দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র পথ।

সূত্র: আলজাজিরা

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন