যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি ইরান। তবে উভয় পক্ষের কট্টরপন্থী অবস্থান এবং কঠিন শর্তের কারণে সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর তিন মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ, ইরানের বন্দর অবরোধ, পারমাণবিক কর্মসূচি, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে মতবিরোধ বহাল রয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, এপ্রিলের শুরুতে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘন করছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে, তেহরানের আন্দিশেহ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনায় ইসরাইলি গণমাধ্যমে একজন আইআরজিসি জেনারেলকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করা হলেও ইরানি গণমাধ্যম এটিকে গ্যাস লিকজনিত দুর্ঘটনা বলে জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব একযোগে ‘আত্মসমর্পণ না করার’ বার্তা দিলেও তাদের অবস্থানে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মোজতবা খামেনির অবস্থান
নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনি বর্তমানে দেশটির ধর্মীয় ও সামরিক কাঠামোর শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে খুব কমই উপস্থিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লিখিত বার্তাগুলোতে মোজতবা খামেনি সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা না করলেও তিনি বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হবে যুক্তরাষ্ট্রমুক্ত এবং এ অঞ্চলের জনগণের অগ্রগতি, শান্তি ও কল্যাণের জন্য নিবেদিত।
তিনি ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে উল্লেখ করে এগুলো রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে সমর্থক ও সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে তিনি দেশকে আরো এক বছর ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ অনুসরণের জন্য প্রস্তুত থাকার কথাও বলেছেন।
প্রভাবশালী সামরিক ও নিরাপত্তা বলয়
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আইআরজিসি নেতৃত্বাধীন সামরিক ও নিরাপত্তা গোষ্ঠীর প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধ পরিচালনাকারী শীর্ষ কমান্ডাররা প্রকাশ্যে আলোচনার বিস্তারিত বিষয়ে মন্তব্য না করলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
সামরিক নেতৃত্বের অবস্থান মূলত কঠোর। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার আহমাদ বাহিদি তার বক্তব্যে প্রতিরোধ, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনে সংঘাত বাড়ানোর সক্ষমতার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ব্যর্থতার পথে থাকা পরাশক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেছেন, ইরান বিজয়ের পথে রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধ পুনরায় শুরু হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘ধ্বংসাত্মক ও নরকসম প্রতিক্রিয়া’ দেখানোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব আপাতত আলোচনার পথ খোলা রাখলেও জাতীয় নিরাপত্তা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। ফলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানো এখনো কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



ট্রাম্প-ইরান চুক্তির জন্য লেবানন কেন মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে?