হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজ নয়, সেনাদের বিশৃঙ্খলা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় যুক্তরাষ্ট্র
ছবি: সংগৃহীত।

দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে মানসিক স্বাস্থ্য ও রসদ সংক্রান্ত সমস্যার খবরের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠাচ্ছে। আব্রাহাম লিংকন রণতরীটি এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে সহায়তা করে আসছিল। খবর এনডিটিভির।

বিজ্ঞাপন

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ওয়াশিংটন বর্তমানে প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালিতে রয়েছে। সেখান থেকে রণতরীটিকে ভারত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছিল, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর একটিকে আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।

লিঙ্কন জাহাজে থাকা সৈন্যদের মনোবল নিয়ে উদ্বেগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে হরমুজ প্রণালীর ওপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তিনি তা ‘রক্ষা করবেন’।

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত উদ্বেগ

সাধারণত, মার্কিন নৌবাহিনীর মোতায়েন ছয় থেকে নয় মাসের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সংঘাতের সময় তা বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু এই সপ্তাহ পর্যন্ত লিঙ্কন ২৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রে রয়েছে, যা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন। এই জাহাজে মোতায়েন থাকা সৈন্যদের পরিবার এবং মার্কিন আইনপ্রণেতারা জাহাজে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার ফলে জানা গেছে যে একাধিকবার সেনাসদস্যরা জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সান দিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে লিংকন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছায়, এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়।

মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে যে এই সংঘাত একটি ‘অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ’ তৈরি করেছে, যেখানে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী সরবরাহ কেন্দ্রগুলো যুদ্ধকালীন কার্যকলাপের কারণে ব্যাহত হয়েছিল।’ নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, এর ফলে বিমানবাহী রণতরীটিতে ঘাটতি দেখা দেয় এবং চিঠিপত্র হারিয়ে যায়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, ‘নেতৃত্ব মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়েছে—প্রথমে খাবার, এরপর স্বাস্থ্যবিধির সামগ্রী এবং সবশেষে ডাক। এরপর আশ্বাস দেওয়া হয় যে, জাহাজের নাবিকরা এখন বিশুদ্ধ পানি এবং ‘স্বাস্থ্যকর খাবারের বিকল্প’ পাচ্ছেন।

উদ্বেগ খারিজ করে দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ লিঙ্কন জাহাজের খারাপ পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খারিজ করে দিয়েছেন এবং সেগুলোকে ‘সম্পূর্ণ ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে’ বলে অভিহিত করেছেন।

পানামা সফরের সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু এবং প্রতিটি ক্যাপ্টেনকে প্রতিটি মুহূর্তে যতটা সম্ভব সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করি। কিছু অভিযান অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়, এবং আমি সেই নাবিকদের প্রতি অন্য সবার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা পোষণ করি। উত্তাল সমুদ্রে, সেই কঠোর পরিস্থিতিতে এবং কম বন্দরে নোঙর করে তারা যা করে—তা অবিশ্বাস্য।’

তার এই মন্তব্যটি এসেছে দুটি সামরিক-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম, নেভি টাইমস এবং স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস-এর প্রতিবেদনের পর। যেখানে ৫,০০০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজটিতে আত্মহত্যার চেষ্টা এবং কর্মীদের মনোবল হ্রাসের খবর প্রকাশিত হয়। জাহাজটি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সমুদ্রে রয়েছে।

জবাবদিহির দাবি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের

হেগসেথের মন্তব্যের পর বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতা বিমানবাহী রণতরীটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে পেন্টাগনের কাছে জবাবদিহিতার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক আইনপ্রণেতারা জাহাজটির ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ে তদন্ত, আরও তথ্য এবং স্বচ্ছতার আহ্বান জানাচ্ছেন। জাহাজটির মূলত মে মাসে দেশে ফেরার কথা ছিল।

সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য, কানেকটিকাটের সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল নৌবাহিনীর নেতৃত্বকে লেখা এক চিঠিতে বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব চেয়ে লিখেছেন, ‘লিঙ্কনের এই দীর্ঘায়িত মোতায়েন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এটি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘটছে এবং এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপুল সংখ্যক মার্কিন নৌবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।’

অ্যারিজোনার সিনেটর রুবেন গ্যালেগো, যিনি মেরিন কোরের একজন সাবেক সৈনিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন তিনি দুই দলের আইনপ্রণেতাদের নিয়ে জাহাজটিতে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের পরিকল্পনা করছেন। তিনি আরো বলেন নাবিকদের সাথে যে আচরণ করা হচ্ছে তা ‘শুধু জঘন্যই নয়, বিপজ্জনকও।’

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ি থেকে দূরে থাকা সামরিক সদস্যদের উপর এর প্রভাব এবং সেইসাথে জাহাজ ও এর সরঞ্জামের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনী আবারও অবরোধ আরোপ করেছে। যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা জানায়নি। এমনকি প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অনির্দিষ্টকাল’ এই অবরোধ বজায় রাখতে পারবে।

এমএমআর

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন