মাত্র নয় মাস আগে ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী জেলে পাড়ার পলাশ জলদাশের। স্ত্রী ভূমি রানী দাশের গর্ভে এখন তাঁদের প্রথম সন্তান। জীবনের নতুন আলো দেখার আগেই অন্ধকার নেমে এলো এই পরিবারে। গত শুক্রবার ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে কাজে গিয়ে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ হারান পলাশ জলদাশ। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ আর নিজের নিঃসঙ্গ জীবনের কথা ভেবে সাগরপাড়ে আহাজারি করতে দেখা যায় ভূমি রানীকে। শুধু স্ত্রী নয়, তার বোন, মা, ভাইসহ স্বজনের আহাজারিতে আকাশ বাতাশ ভারী হয়ে ওঠে। "আমার জীবন শেষ, অনাগত সন্তান নিয়ে এখন কোথায় দাঁড়াব?"—ভূমি রাণীর এ প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই কারও। পলাশের ভগ্নীপতি রনি জলদাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নিরাপত্তার বালাই ছিল না, একটা মাস্কও দেওয়া হয়নি ইয়ার্ডে। এটা দুর্ঘটনা নয়, আমার শ্যালককে খুন করা হয়েছে।"
একই দুর্ঘটনায় থমকে গেছে ১৭ বছরের কিশোর সানি জলদাশের স্বপ্নও। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করতে সামান্য বেতনে ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজে যোগ দিয়েছিল সানি। বুকভরা আশা ছিল মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর। কিন্তু মালিকপক্ষের অবহেলায় অকালেই ঝরে গেল সেই কিশোরের প্রাণ। শুক্রবার ছেলেকে হারিয়ে সানির বাবা-মা বলেন, আমাদের ছেলে পরিবারের অভাব দূর করতে কাজ নিয়েছিলেন। সেই শিপইয়ার্ডের কাজ জীবন কেড়ে নেবে কখনও ভাবিনি।
এই দুর্ঘটনায় শোকের মাতম চলছে ইয়ার্ডটির শ্রমিক আপন দুই ভাই নিহত নাছির উদ্দিন ও আবুল মনছুর আহমদের ঘরেও। নাছিরকে হারিয়ে বাক্রুদ্ধ তাঁর দুই মেয়ে ও স্ত্রী। আর মনছুরের অকালমৃত্যুতে দিশেহারা তাঁর স্ত্রী। স্বজনদের হারিয়ে ভাটিয়ারীর বাতাসে এখন শুধুই স্বজনহারাদের কান্নার রোল। তাদের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনা আঁচ করতে পেরেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি ইয়ার্ড মালিক। কয়েক শ্রমিক প্রাণে বাঁচতে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সিকিউরিটি গার্ড গেটের বাইরে যেতে দেয়নি। সেখানে কোন এম্বুলেন্স ও অক্সিজেন ছিল না। এমনকি গামবুট, মাস্ক, হেলমেট কিছুই রাখা হয়নি। গ্যাসমুক্ত না করেই জাহাজটি কাটা হচ্ছিল বলে জানান শিপইয়ার্ডের এই সাবেক শ্রমিক।
অভিযোগ উঠেছে, কথিত গ্রিন শিপইয়ার্ড ফেরদৌস স্টিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আইআরএস (ইন্ডিয়ান রেজিস্ট্রার অব শিপিং) থেকে সনদ নিয়েই নিজেদের গ্রিন দাবি করা শুরু করে। গ্রিন করতে হলে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন সেফটি ইস্যু নিশ্চিত করে জাপানের ক্লাস এনকেসহ একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সনদ থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তারা সেগুলো নেয়নি। দেড় বছর আগে সীতাকুণ্ডে আসা ৪০ টনের এলএনজি জাহাজটিকে গ্যাসমুক্ত না করেই কাটাকাটি করা হচ্ছিল।
এছাড়াও বিষাক্ত পার্লাইট পাউডারও সাগরে ফেলে আসছিল তারা। জাহাজের ভেতরে একাধিক ট্যাঙ্কে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস ছিল। গ্যাসের মাধ্যমে জাহাজ কাটতে গিয়ে ট্যাঙ্কে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস জাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৩০ জন শ্রমিক আক্রান্ত হন বলে জানা গেছে। তার মধ্যে ৯ জনের লাশ ও আহত ৪ জনকে উদ্ধার করা হলেও এবং এখনও নিখোঁজ ১৮ জন। স্থানীয়দের ভাষ্য তথাকথিত এই 'গ্রিন' শিপইয়ার্ডটি যেন শ্রমিকদের জন্য এক নির্মম মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা এই গুরুতর গাফিলতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

