ইরানে কেমন আছেন ইহুদিরা

ইরানে কেমন আছেন ইহুদিরা
ছবি: সংগৃহীত

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং নিয়মিত সংঘাতের আবহ বিরাজ করলেও ইরানের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ইহুদি সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন ও সামাজিক অবস্থানের চিত্র অনেকটাই ব্যতিক্রমী। ইসরাইলের বাইরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় ইহুদি জনসংখ্যার বসবাস ইরানেই, যেখানে প্রায় ১০ হাজার ইহুদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের ধর্মীয় আচার ও সংস্কৃতি রক্ষা করে টিকে রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে ইহুদিদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংঘাতের মধ্যেও তাদের টিকে থাকার বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়

প্রতিবেদনে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আব্রাহাম শামি সিনাগগ (ইহুদি উপাসনালয়)-এর দৃশ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে ইহুদি ধর্মাবলম্বীরা কোনো ধরনের বাড়তি পুলিশি নিরাপত্তা বা পাহারা ছাড়াই ভোরে জড়ো হয়ে তাদের নিয়মিত প্রার্থনা সম্পন্ন করেন। দেশটির প্রধান ধর্মীয় নেতা (চিফ রাব্বি) ইউনুস হামামি লালেজার জানান, ইরান ও ইসরাইল রাষ্ট্রের মধ্যকার তীব্র শত্রুতা সত্ত্বেও সাধারণ ইরানিদের কাছ থেকে তারা কোনো ধরনের হুমকি বা বৈরিতা অনুভব করেন না। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের কোনো বিশেষ প্রহরার প্রয়োজন হয় না বলেই জানান তিনি।

আইনি সুরক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রম

ইরানে ইহুদিদের বসবাসের ইতিহাস প্রায় ২,৭০০ বছরের পুরনো। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় স্পষ্ট ঘোষণা করেন—‘জায়নবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল এবং ইহুদি ধর্ম এক নয়’। সেই নির্দেশনার আলোকে দেশটির সংবিধানে ইহুদিদের সুরক্ষিত ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং জাতীয় সংসদে (মজলিশ) তাদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন বরাদ্দ থাকে।

বর্তমানে ইরানে কয়েক ডজন সিনাগগের পাশাপাশি ইহুদিদের পরিচালিত বেশ কিছু স্কুলও রয়েছে। তেহরানের এমনই একটি স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, ক্লাসরুমের দেয়ালে একদিকে ইহুদিদের ধর্মীয় বাতিদান ‘মেনোরাহ’, আর তার ঠিক পাশেই টাঙানো রয়েছে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি হিব্রু ভাষা ও ধর্মীয় অনুশাসন শিখছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ইহুদিদের পাশাপাশি মুসলিম শিক্ষকরাও পাঠদান করছেন। স্থানীয় ইহুদি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মুসলিমদের গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান রয়েছে।

সামরিক সংঘাতের প্রভাব ও ক্ষোভ

তবে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার সামরিক সংঘাতের ধাক্কা এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরও এসে পড়েছে। সম্প্রতি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে বিমান হামলায় পার্শ্ববর্তী স্থাপনার পাশাপাশি ঐতিহাসিক রাফিয়া সিনাগগ ধসে পড়ে। প্রার্থনালয়টি পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও ভেতরে কেউ না থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটেনি। ইসরাইলের এ ধরনের নির্বিচার হামলায় স্বয়ং ইহুদি উপাসনালয় ধ্বংস হওয়ায় স্থানীয় ইরানি ইহুদিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

যুদ্ধের এই কঠিন বাস্তবতা সত্ত্বেও ইরানের ইহুদিরা মনে করেন, তারা এই মাটিরই সন্তান। প্রাচীন পারস্যের সময় থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে তারা এই দেশকে নিজেদের ঘর মনে করেছেন এবং বাকি সাধারণ ইরানিদের মতোই তারাও মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ও স্থায়ী শান্তি চান।

সূত্র: সিএনএন

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন