বছর পার হলেও গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’

বছর পার হলেও গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’
দক্ষিণ গাজা উপত্যকার উপকূলে আল-মাওয়াসিতে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের তাঁবুর ক্যাম্প। ৭ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

গাজায় যুদ্ধ বন্ধ, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ কমানো এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘শান্তি বোর্ড’-এর এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই সময়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, ইসরাইলি বাহিনীর দখল বন্ধ করা কিংবা গাজায় ত্রাণ ও পুনর্গঠন নিশ্চিতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি বোর্ডটি। উল্টো ইসরাইলি হামলায় ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত রয়েছে। গাজার অধিকাংশ মানুষ ক্ষুধার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে গাজাবাসীর দুর্ভোগ কমেনি।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে শান্তি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, বোর্ডটি গাজায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ তৈরি করবে। একই বছরের ১০ অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বোর্ডটিকে গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

কিন্তু এক বছর পরও পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলা প্রায় প্রতিদিনই চলছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে এসব হামলায় ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। যুদ্ধ শুরুর পর তিন বছরে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজার ছাড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছেন আরও হাজারো মানুষ, যাদের মৃত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং আকাশপথে ও কামান দিয়ে হামলা বন্ধ করার কথা ছিল। কিন্তু এখন ইসরাইল গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা দখলে রেখেছে। দখল করা এলাকা চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা আরো ভেতরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে এবং তাদের বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হচ্ছে। হলুদ রেখা অজান্তে অতিক্রম করায় ফিলিস্তিনিদের গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।

ইসরাইল দাবি করে, তাদের হামলার লক্ষ্য হামাসের সদস্যরা। তবে হামাস এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। গত ডিসেম্বরে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ বলেছিলেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী কখনোই গাজা থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে না।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গবেষক মোহাম্মদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইল মূলত ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নির্মূল করার বৃহত্তর নীতি চালিয়ে যাচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘তারা জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে।’

তিনি বলেন, এসবই পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে।

ত্রাণ ও পুনর্গঠনেও অগ্রগতি নেই

গাজায় প্রতিদিন প্রায় ২২৭টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করছে। অথচ পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন ৬০০টি ট্রাক প্রবেশ করার কথা ছিল। খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইপিসির হিসাব অনুযায়ী, গাজার ১৪ লাখ ফিলিস্তিনি অন্তত ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষুধার ঝুঁকিতে থাকবেন। মে মাসের তুলনায় এই সংখ্যা ২ লাখ বেশি।

ইসরাইল তাঁবু ও ভেন্টিলেটরের মতো জরুরি সরঞ্জামসহ হাজারো পণ্যকে ‘দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এসব পণ্য সামরিক ও বেসামরিক—দুই কাজেই ব্যবহার করা যায়, এমন যুক্তিতে সেগুলোর প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। ফলে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও বাস্তব অগ্রগতি নেই। ফিলিস্তিনিরা এখনো ইঁদুর ও পোকামাকড়ে ভরা তাঁবুশিবিরে বসবাস করছেন। তীব্র গরম কিংবা বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও নেই তাদের।

যদিও শান্তি বোর্ডের প্রথম সম্মেলনে সদস্যদেশগুলো গাজার জন্য ৭০০ কোটি ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, মানবিক সহায়তাকারী সংস্থাগুলোর হিসাবে গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বোর্ড ২৪০ কোটি ডলারের ৬৬টি পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিকল্পনাও প্রকাশ করে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো গাজাবাসীর জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি।

গাজার শাসনভার ও নিরাপত্তা পরিকল্পনাও আটকে

শান্তি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে শাসনভার তুলে দেওয়ার আগপর্যন্ত শান্তি বোর্ড গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন হিসেবে কাজ করবে। এ জন্য জাতীয় গাজা প্রশাসন কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধান কমিশনার আলী শাথের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটিটি সরাসরি শান্তি বোর্ডের কাছে জবাবদিহি করবে। কিন্তু ইসরাইল এখনো তাদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। ফলে কমিটিকে মিসরের রাজধানী কায়রো থেকে কাজ করতে হচ্ছে।

হামাস গাজায় নিজেদের সরকার বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে ইসরাইল একে ‘লোকদেখানো পদক্ষেপ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, হামাস তাদের অস্ত্র জাতীয় গাজা প্রশাসন কমিটির কাছে হস্তান্তরে সম্মত হলেও নিরস্ত্রীকরণের শর্ত মানতে রাজি নয়।

তাদের যুক্তি, ইসরাইল হামলা বন্ধ করেনি এবং গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারও করেনি। ইসরাইল আবার বলেছে, হামাস নিরস্ত্র না হলে তারা শান্তি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে এগোবে না। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর। ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, আলবেনিয়া, কসোভো ও উগান্ডা বাহিনীটিতে সদস্য দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের নেতৃত্বে ২০ হাজার সেনা ও ১২ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়ে বাহিনীটি গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়নি।

জাতিসংঘের সংস্থার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

গাজায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, উন্নয়ন কর্মসূচি ও সামাজিক সেবা দিয়ে আসছে। সংস্থাটিতে প্রায় ১১ হাজার ফিলিস্তিনি কর্মী কাজ করেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ও শান্তি বোর্ড সংস্থাটির ভূমিকার বিরোধিতা করেছে। গত মাসে বোর্ড জানায়, তারা ইউএনআরডব্লিউএর সঙ্গে কাজ করবে না।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে শান্তি বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, ইউএনআরডব্লিউএর কর্মসূচিগুলো প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হলে সংস্থাটি গাজায় কাজ চালিয়ে যেতে পারে। তবে

তার ভাষায়, সংস্থাটির ‘দিন শেষ’। এ সিদ্ধান্তকে ‘যুক্তিসংগত নয়’ বলে মন্তব্য করেছে ইউএনআরডব্লিউএ।

গত জুনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রমের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে, শান্তি বোর্ডকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শান্তিপ্রক্রিয়া তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই সময় বোর্ডের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে জাতিসংঘ এর মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, শান্তি বোর্ড গাজার পুনর্গঠনের সব দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে পারে। ফ্রান্সসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ গাজায় জাতিসংঘের ভূমিকা প্রতিস্থাপনের যেকোনো উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে।

তবে এলমাসরির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতায় যেতে কোনো দেশই আগ্রহী নয়। তিনি বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক পক্ষ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে জড়াতে চায় না। এর ফলে গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষের ভবিষ্যৎ কার্যত ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন মাবনের মূল্যায়ন, শান্তি বোর্ড ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, গাজা সংঘাত বন্ধে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারা বোর্ডটির অকার্যকারিতা প্রমাণ করে। ইসরাইল এবং তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায় হলেও হামাসকে নিজেদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রাখতে পারেনি বোর্ডটি। এর ফলে গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রয়েছে।

শান্তি বোর্ডের এক বছরে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি, পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের উদ্যোগ দেখা গেলেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, গাজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি সামান্য। ফলে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে বোর্ড গঠিত হয়েছিল, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন