তিউনিসিয়ায় জনরোষ তীব্র, দানা বাঁধছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা

তিউনিসিয়ায় জনরোষ তীব্র, দানা বাঁধছে আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা
চলতি বছরের শুরুতে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের বিরুদ্ধে একনায়কতন্ত্রের অবসান ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা বিক্ষোভ করেন

পাঁচ বছর আগে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের ক্ষমতা দখলের পর আপাত শান্ত তিউনিসিয়ার ভেতরে জমে উঠছে জনঅসন্তোষ। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, ক্রমাবনতিশীল অর্থনীতি, ভেঙে পড়া জনসেবা এবং দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও পানি সংকট দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

২০১১ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার প্রায় সব অর্জনই এখন ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নতুন সংবিধান ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে জনগণের অংশগ্রহণের যে প্রত্যাশা ছিল, তা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে। একসময় টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বিতর্কের যে প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, তার জায়গা নিয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠান।

সম্প্রতি রাজধানী তিউনিসে হাজারো মানুষ প্রেসিডেন্ট সাইদের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং জীবনযাত্রার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে সাইদের সমর্থকরাও পাল্টা সমাবেশ করে বিরোধীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে তাদের কারাবন্দি করার দাবি জানান।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তিউনিসিয়া পরিচালক সালসাবিল শেল্লালি বলেন, সরকারবিরোধী যেকোনো সমালোচনা এখন কার্যত অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, পাঁচ বছর আগে কাইস সাইদ তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক যাত্রাকে সমাপ্ত করে দেশকে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে ফিরিয়ে নিয়েছেন। আইনের শাসন দুর্বল করা, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। তার শাসনে কোনো সমালোচকই নিরাপদ নন।

তাপপ্রবাহে উন্মোচিত অব্যবস্থাপনা

তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানলে তিউনিসিয়ায় প্রায় ৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। ইতালি ও আলজেরিয়ার সহায়তা সত্ত্বেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা সামাল দিতে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও গ্যাস কোম্পানি এসটিইজি এ পর্যায়ক্রমিক লোডশেডিং চালু করেছে। এতে কৃষিজ ফসল নষ্ট হচ্ছে, শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। অনেক এলাকায় টানা ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।

তিউনিসের হাবিব বুরগুইবা অ্যাভিনিউতে (২৫ জুলাই, ২০২৬) জরুরি অবস্থা জারির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে ও দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সংসদ স্থগিতের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে মানুষ জড়ো হয়।
তিউনিসের হাবিব বুরগুইবা অ্যাভিনিউতে (২৫ জুলাই, ২০২৬) জরুরি অবস্থা জারির পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে ও দেশটির প্রেসিডেন্ট কাইস সাইয়েদের সংসদ স্থগিতের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে মানুষ জড়ো হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তিউনিসীয় বিশ্লেষক বলেন, গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা বাড়বে এটা সবাই জানে। কিন্তু তিউনিসিয়ায় নেই প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, নেই বিনিয়োগ, নেই অর্থ। তিনি আরো বলেন, সমস্যা শুধু অবকাঠামোর নয়; জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় পরিকল্পনারও চরম অভাব রয়েছে।

বিরোধীদের কারাবন্দি, গণমাধ্যমে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

দেশটির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সরকারবিরোধী নেতা হয় কারাগারে, নয়তো নির্বাসনে রয়েছেন। একসময়কার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এন্নাহদার অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বন্দি। দলটির ৮৫ বছর বয়সী নেতা রাশেদ ঘানুশিও কারাগারে রয়েছেন। গত মাসে অসুস্থ হয়ে কারাগারে অজ্ঞান হওয়ার পর থেকে তার অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে ‘ভুয়া খবর’ দমনের নামে প্রণীত কঠোর আইনের মাধ্যমে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ব্যঙ্গবিদ হাইথেম এল মেক্কিকে তিন বছর আগের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের কারণে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের গবেষক হামজা মেদদেব বলেন, সবখানেই সেন্সরশিপ চলছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গবাদিপশু মারা যাচ্ছে, রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অসুস্থ মানুষ কষ্ট পাচ্ছেন, এমনকি বয়স্কদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে।

তার মতে, মানুষের ক্ষোভ কখনও রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ও পানি কোম্পানির দিকে, কখনও সরকারের দিকে গেলেও, প্রকৃত ক্ষমতাকেন্দ্র প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে দায়ী করতে মানুষ ভয় পাচ্ছে।

সংস্কারের আশা ক্ষীণ

বিশ্লেষকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সাইদের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সমর্থনের কারণে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ইস্যুর চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও তিউনিসিয়া সরকারের সঙ্গে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি করেছে তারা।

প্রতিবেশী আলজেরিয়া ও লিবিয়াও সীমান্তে অস্থিতিশীলতা এড়াতে সাইদ সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুন সম্প্রতি তিউনিসিয়ার স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক রিকার্দো ফ্যাবিয়ানি বলেন, প্রেসিডেন্ট সাইদ এমন একটি মানসিকতায় পরিচালিত হচ্ছেন, যেখানে দেশের সব সমস্যাকেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেন। তার মতে, তিউনিসিয়ার প্রায় সব আন্তর্জাতিক অংশীদারই এখন দেশটির সংস্কারের আশা ছেড়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তিউনিসিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সূত্র: আল জাজিরা

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন