যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ পরিচালনায় ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ‘গ্রক’ ব্যবহার করে মাত্র চার দিনের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে যুদ্ধাস্ত্র বর্ষণ করে মার্কিন বাহিনী।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের (পেন্টাগন) ডিজিটাল ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রধান ক্যামেরন স্ট্যানলির একটি লিখিত সাক্ষ্য থেকে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এবারই প্রথম ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মাস্কের এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি সরাসরি স্বীকার করা হলো।
মিসিসিপির উত্তর জেলা আদালতে পরিবেশবাদী সংগঠন এনএএসিপি বনাম মাস্কের প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’-এর চলমান একটি দেওয়ানি মামলায় ট্রাম্প প্রশাসনের হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে পেন্টাগন কর্মকর্তা ক্যামেরন স্ট্যানলি এই লিখিত ঘোষণা জমা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন সরকার ‘গ্রক গভ মডেল’ ব্যবহার করে, যা মূলত এক্সএআইয়ের বাণিজ্যিক সংস্করণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি পেন্টাগনের ‘ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেমস’ (এমএসএস)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সামরিক প্রস্তুতি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা মিশনে সহায়তা করছে।
স্ট্যানলির দেওয়া তথ্যমতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ চলাকালীন এই ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেমসের কার্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মার্কিন বাহিনী মাত্র চার দিনে ২,০০০টি যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করতে সক্ষম হয়। তবে এই প্রযুক্তি ঠিক কোন কোন তারিখে ব্যবহার করা হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন হামলায় ১২০ জন স্কুলশিক্ষার্থীসহ ১৫৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনার সঙ্গে এই প্রযুক্তির সরাসরি কোনো সংযোগ ছিল কি-না, তা স্পষ্ট নয়।
ইরানের ‘ফাউন্ডেশন অব মার্টিয়ার্স অ্যান্ড ভেটেরান্স’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ইরানি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
পেন্টাগনের এই স্বীকারোক্তিটি এসেছে মূলত এক্সএআই-এর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি পরিবেশগত মামলার সূত্র ধরে। গত ২৬ এপ্রিল এনএএসিপি পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের দায়ে এক্সএআই এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের অভিযোগ, টেনেসি অঙ্গরাজ্যের মেমফিসে অবস্থিত 'কোলোসাস ২' সুপারকম্পিউটার ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য মিসিসিপির সাউথহ্যাভেনে নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৭টি মিথেন গ্যাস টারবাইন চালানো হচ্ছে। এই টারবাইনগুলো থেকে নির্গত বিষাক্ত নাইট্রোজেন অক্সাইড ওই অঞ্চলের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। মামলার মাধ্যমে সংস্থাটি এই অবৈধ টারবাইন বন্ধ এবং এক্সএআই-এর ওপর আর্থিক জরিমানার দাবি জানিয়েছে।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন এই মামলার তীব্র বিরোধিতা করছে। পেন্টাগন কর্মকর্তা ক্যামেরন স্ট্যানলি আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন যে, সাউথহ্যাভেনের বিদ্যুৎ সংকটের কারণে যদি 'কোলোসাস ২' ডেটা সেন্টারের কার্যক্রম ব্যাহত বা বন্ধ হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং শত্রুদের চেয়ে প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ডেটা সেন্টারগুলোকে কেবল বাণিজ্যিক অবকাঠামো হিসেবে না দেখে সামরিক অস্ত্রাগারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
একই সুর মিলিয়ে মার্কিন বিচার বিভাগও (ডিওজে) জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই মামলাটি খারিজ করার জন্য আদালতের কাছে জোর আবেদন জানিয়েছে। বিচার বিভাগের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের প্রিন্সিপাল ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডাম গুস্তাফসন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো বেসরকারি সংস্থা পরিবেশগত আইন ব্যবহার করে দেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে-এমনটা মার্কিন সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


