ইরান যুদ্ধ স্থায়ীত্বে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত হলেও এর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আগামী বহু বছর বজায় থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মাসব্যাপী এই সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ জন সেনাসদস্য এবং ইরানের ৩ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এছাড়া লেবাননে ৩ হাজার ৮২৬ জন, ইসরাইলে প্রায় ৬০ জন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
যুদ্ধটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করেছে এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। এর ফলে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং করতে হয়েছে এবং সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে সার পর্যন্ত সবকিছুর সরবরাহ চেইন ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ২.৫ শতাংশ করেছে, যা করোনা মহামারির পর সর্বনিম্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ক্ষতি
মুডিস অ্যানালিটিক্স-এর হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধ মার্কিন ভোক্তা ও করদাতাদের এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ক্ষতি করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের দাম ব্যাহত হয়ে গ্যালন প্রতি ৩ ডলারের পেট্রোলের দাম সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৫৬ ডলারে উঠেছিল। সর্বোচ্চ পর্যায়ে মার্কিন চালকদের প্রতিদিন পাম্পে অতিরিক্ত ৫০ কোটি ডলারের বেশি গুণতে হয়েছে। ডেসেল এবং জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় বিমান টিকিটের দাম গত বছরের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। সারের দাম ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিখাতে সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের অনিশ্চয়তায় দেশটিতে বন্ধকী ঋণের (মর্টগেজ) সুদের হার বেড়ে গড়ে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ হয়েছে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাব
যুদ্ধের ধাক্কায় মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে এ বছর মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে বিশ্বব্যাংক ধারণা করছে। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের পুনর্গঠনের জন্য চুক্তিতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, কাতারের অর্থনীতি সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইরানি হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানি ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ থাকায় গত মে মাসে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি হ্রাস পায়। তবে তেলের দাম বাড়ায় সৌদি আরবের কোম্পানি আরামকোর মুনাফা বছরের প্রথম তিন মাসে ২৬ শতাংশ বেড়েছে। বিমান যোগাযোগ খাতে দুবাইয়ের ফ্লাইট দুই-তৃতীয়াংশ এবং দোহার ফ্লাইট তিন-চতুর্থাংশ কমে গিয়েছিল। পর্যটন শিল্পও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামরিক ব্যয়
পেন্টাগন কমপট্রোলার জুলস হার্স্টের মতে, এই যুদ্ধের পরিচালন ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার। তবে এই হিসাবে কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, যুদ্ধবিমান ও রাডার মেরামতের খরচ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
রাজনৈতিক মূল্য
যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ধীরগতিতে হ্রাস পেয়েছে। মে মাসের শেষ নাগাদ ট্রাম্পের নিট জনপ্রিয়তা কমে মাইনাস ২২ শতাংশে নেমে আসে এবং তার জনপ্রিয়তা ৪০ শতাংশের নিচে চলে যায়, যা তার প্রথম মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
সূত্র: এনপিআর
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


