ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চিন্তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের

ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চিন্তা বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ইরানের সামরিক বাহিনী এখনও মারাত্মক আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রেখেছে। সম্প্রতি জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাটিতে ইরানি হামলায় ৩ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর এই বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

গত শুক্রবারের এ হামলাটি ছিল গত ১ মার্চের পর কোনো সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি আঘাতে মার্কিন সেনা নিহতের প্রথম ঘটনা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ না করলেও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ওয়াশিংটনের জন্য এটি এক নির্মম বাস্তবতার স্মারক। প্রতিনিয়ত মার্কিন বিমান হামলা চালানো হলেও ইরান নিজেদের অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পূর্ণ সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ'-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনোফার কাভানাঘ কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী। ধারণার চেয়েও দ্রুত তারা নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের হামলাগুলো আরো নিখুঁত হচ্ছে, যেখানে রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তা থাকার সম্ভাবনা প্রবল।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, পেন্টাগন দাবি করেছিল ইরানের সামরিক বাহিনী ‘যুদ্ধক্ষেত্রে অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে, কিন্তু বাস্তবতা তা বলছে না। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও তারা দ্রুত পরিস্থিতি থেকে শিখছে এবং নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

কিং'স কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ জানান, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবস্থান এবং সেগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতাই মূলত মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলছে।

বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সাধ্যের মধ্যে থাকা স্থায়ী ও উন্মুক্ত ঘাঁটিগুলোতে অবস্থান করছে। এসব ঘাঁটির আবাসন মূলত হালকা রকেট, মর্টার বা হাতে তৈরি বিস্ফোরক হামলা ঠেকানোর জন্য তৈরি; বড় ধরনের ওয়্যারহেড বহনকারী নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলা সহ্য করার মতো নয়।

সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ১ মার্চ কুয়েতের একটি ট্যাকটিক্যাল অপারেশন সেন্টার এবং সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ৭ সেনা নিহত হন। এ ছাড়া জর্ডানে নিহত ৩ জন ছাড়া বাকিদের মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত বা বিস্ফোরক ধ্বংসের মতো ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

গত ৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশটির প্রায় ২২০টি সামরিক অবকাঠামো, ভবন ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এয়ার ডিফেন্স অকার্যকর করার রণকৌশল

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন—‘প্যাট্রিয়ট’ এবং উচ্চ ওপরে আঘাত হানতে সক্ষম ‘থাড’ অকার্যকর করতে ইরান তাদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বহুমুখী ব্যবহার করছে।

ভিন্ন গতি ও ভিন্ন দিক থেকে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি সশস্ত্র ড্রোন ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। মূল অস্ত্রের সঙ্গে ভুয়া সংকেত বা 'ডিকয়' ব্যবহার করায় মার্কিন এয়ার ডিফেন্স অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে।

ক্রিগ বলেন, ‘অধিকাংশ অস্ত্র ধ্বংস করা গেলেও অল্প কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করতে পারলেই বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটে যায়।’

ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (সিএসআইএস)-এর মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, সংঘাতের শুরুর সপ্তাহের তুলনায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে ইরানের মধ্যে বেশি দৃঢ়তা দেখা গেছে। এটি হামলার তীব্রতা বৃদ্ধির এক নতুন ধারা।

ইতোমধ্যে টানা ১৩ দিন ধরে উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানের সেনাবাহিনী সম্প্রতি জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকারী সাইট ও হেলিকপ্টার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রও হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ইরানি সামরিক অবকাঠামো ও ড্রোন স্টোরেজে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।

পেন্টাগনের দাবি ও বাস্তবতার ব্যবধান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সম্প্রতি দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সামরিক বাহিনী ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে এবং তারা ‘যুদ্ধক্ষেত্রে অকার্যকর’। তবে মার্কিন সিনেটর জেন ওসফ এর সত্যতা নিয়ে গত মঙ্গলবার সিনেটে প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে তীব্র জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

সিনেটরের প্রশ্নের জবাবে হেগসেথ দাবি করেন, এটি এক ঐতিহাসিক সামরিক বিজয় এবং ইরানের নৌ, বিমান ও প্রতিরক্ষা শিল্প অকার্যকর করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা কখনোই ভাবিনি যে তাদের গুলি ছোড়ার সক্ষমতা একদম বন্ধ হয়ে যাবে।’

পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো জেসন ক্যাম্পবেল মনে করেন, মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্ব ইরানের সামরিক ক্ষয়প্রাপ্তির তথ্যকে অতিরিক্ত বাড়িয়ে বলছে।

ক্যাম্পবেল বলেন, ‘আমরা জানি যে সংঘাতের শুরুতে ইরান কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত ছিল, যা তারা পরে ব্যবহারের সুযোগ রেখেছিল। তারা এখন তাদের তুলনামূলক বড় ও শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিতে সক্ষম। জর্ডানের ঘটনায় তারা সেই সুনির্দিষ্ট নির্ভুলতারই প্রমাণ দিয়েছে।’

ইউনিভার্সিটি অব বাথ-এর সহযোগী অধ্যাপক এবং ন্যাটোর সাবেক গবেষণা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরি জানান, মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত হলেও খরচের দিক থেকে ইরান বড় সুবিধা পাচ্ছে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির খরচ অনেক কম, অথচ সেগুলো মাঝপথে ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন হয়, সেগুলোর খরচ বহুগুণ বেশি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পুরোপুরি পরাজিত করতে হবে না। মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ব্যাহত করতে এবং তাদের রাজনৈতিক ও মানবিক ক্ষতি বাড়াতে মাঝেমধ্যেই এই প্রতিরক্ষাব্যূহ ভেদ করাই ইরানের মূল লক্ষ্য।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন