হোম > আমার দেশ স্পেশাল

অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে দেশের শিশুরা

এমরানা আহমেদ

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী নিঝুম ইকবাল। রাস্তার পাশেই তার ফ্ল্যাট হওয়ায় প্রায় ২৪ ঘণ্টাই শব্দদূষণের শিকার হচ্ছে তার পাঁচ বছর বয়সি শিশু রাইমাসহ পরিবারের সদস্যরা। পরিবারটির প্রায় সবাই বর্তমানে শ্রবণশক্তি কমে যাওযার সমস্যায় ভুগছে। শিশুটির অবস্থাও তাদের মতো। আস্তে কথা বললে সে শুনতে পায় না বলে আমার দেশকে জানালেন শিশুটির মা।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তাদের রাস্তার পাশের ফ্ল্যাট ছেড়ে নিরিবিলি এলাকায় বাসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যথায় শিশুটি ভবিষ্যতে কানে আর কিছুই শুনতে পারবে না। এছাড়া অতিরিক্ত শব্দদূষণে তার ব্রেনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। শিশুটি শব্দদূষণ নামে পরিবেশগত অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত বলে তার পরিবারকে জানিয়েছেন‍ চিকিৎসক।

দেশে কত শিশু অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত, তার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুরা মূলত পরিবেশগত বিভিন্ন দূষণ, জিনগত কারণ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে অসংক্রামক রোগে মারা যায়। এটি একটি ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সমস্যা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসংক্রামক রোগ বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর প্রধান কারণ। এর জন্য বায়ু, শব্দ, পানিসহ পরিবেশের নানাবিধ দূষণ এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দায়ী। এছাড়া কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছেন তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর প্রধান কারণ অসংক্রামক রোগ, যা মোট মৃত্যুর শতকরা ৭১ ভাগের জন্য দায়ী।

আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, ২০১৯ সালের গ্লোবাল বার্ডেন রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সালে বিশ্বে ২১০ কোটিরও বেশি শিশু অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১০ লাখ শিশু মারা যায়। তবে বাংলাদেশে শিশুদের অসংক্রামক রোগসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য উপাত্ত নেই। ফলে এসব রোগের চিকিৎসা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে ঘাটতি রয়েছে বলেও সংস্থাটি মন্তব্য করেছেন।

ইউনিসেফ বলেছে, বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের চেয়ে অসংক্রামক রোগ বা জন্মগত ত্রুটি, সময়ের আগে জন্ম এবং জন্মসংক্রান্ত জটিলতার কারণে শিশুমৃত্যুর হার বেশি। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর এক লাখের বেশি শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিনের আগেই মারা যায়। এটি মূলত অসংক্রামক রোগ বা জন্মগত জটিলতার কারণে ঘটে থাকে।

শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছয়টি প্রধান অসংক্রামক রোগ চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। এগুলো হলোÑব্রংকিয়াল অ্যাজমা, জন্মগত হৃদরোগ, মৃগীরোগ (এপিলেপসি), থ্যালাসেমিয়া, কিডনি রোগ (নেফ্রোটিক সিনড্রোম) এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস। এসব রোগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ শিশু ব্রংকিয়াল অ্যাজমায় আক্রান্ত। এরপর থ্যালাসেমিয়া ও আয়রন ডেফিশিয়েন্সি অ্যানিমিয়াতে ২৮ শতাংশ, জন্মগত হৃদরোগে ১৯, মৃগীরোগে ১৪, নেফ্রোটিক সিনড্রোমে ২ এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ১ শতাংশ শিশু আক্রান্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০টি বড় রোগের কারণ ১২ ধরনের পরিবেশদূষণ। তার মধ্যে শব্দদূষণ অন্যতম। একাধিক জরিপে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের শব্দদূষণের মাত্রা ৬০ থেকে শুরু করে কোনো কোনো স্থানে ১০৬ ডেসিবল পর্যন্ত রয়েছে, যা মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বসতি এলাকায় দিনের বেলা ৫৫ ডেসিবল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবল হওয়া উচিত। বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৬৫ ও রাতে ৫৫ ডেসিবল, শিল্পাঞ্চলে দিনে ৭৫ ও রাতে ৬৫ ডেসিবলের মধ্যে থাকা উচিত। আর হাসপাতালে সাইলেন্স জোন বা নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবল শব্দমাত্রা থাকা উচিত। এর বেশি হলেই তা দূষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়।

রাজধানীতে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক জরিপে দেখা যায়, নীরব এলাকার আওতাভুক্ত হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতের আশপাশে দিবাকালীন শব্দের মাত্রা ৭৫ থেকে ৯৭ ডেসিবল, যা মান মাত্রার চেয়ে দেড় থেকে দুইগুণ বেশি।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবল।

বাংলাদেশে শিশুদের ওপর বায়ুদূষণজনিত রোগের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০২৪-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিবেশের বিভিন্ন ধরনের দূষণ, যেমনÑবায়ু, পানি ও মাটিদূষণ শিশুদের বিভিন্ন অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হাঁপানি, ফুসফুসে সংক্রমণ, কিডনি ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং ক্যানসার। শিশুরা দূষণের ঝুঁকিতে থাকে, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয় না এবং তারা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় বেশি শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়।

শ্যামলীর ২০০ শয্যার যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ডা. আয়শা আক্তার বলেন, দেশব্যাপী অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলছে। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত ব্যাপকহারে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারসহ নানা ধরনের অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। শিশু বয়সে হার্ট ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী অতীতে তেমন পাওয়া যেত না। বর্তমানে এমন শিশু রোগীর সংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন রোগে আক্রান্তদের মধ্যে ৭০ শতাংশই মারা যায় অসংক্রামক ব্যাধিতে এবং অসংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুর ৮০ ভাগই হয় স্ট্রোকের কারণে। অসংক্রামক ব্যাধির কারণে অকালমৃত্যুর হার বেড়ে চলেছে। কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে মনে করেন ডা.আয়শা আক্তার।

আইসিডিডিআর,বির অন্যতম সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশনসহ সবাইকে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অসংক্রামক ব্যাধি ব্যাপকহারে বৃদ্ধির কারণ, প্রতিকারের উপায় এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। এ রোগ সম্পর্কে জানা থাকলে কিংবা একটু সচেতন হলে অসংক্রমাক ব্যাধি রোধ করা সম্ভব।

এ বিষয়ে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, ভেজাল খাদ্য, পরিবেশ, ফাস্টফুডসহ নানা ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্য খাওয়ার কারণে অসংক্রামক ব্যাধিতে শিশু থেকে সব বয়সের মানুষ ব্যাপকহারে আক্রান্ত হচ্ছে। কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, স্ট্রোক, হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। শুধু স্বাস্থ্য সচেতন হলেই এসব রোগ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. মোসতাক হোসেন বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের জন্য উৎসাহিত করা উচিত। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য জরুরি স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম দেশব্যাপী ব্যাপকহারে বাস্তবায়ন শুরু করলে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি আহম্মেদ মোয়াজ বলেন, বায়ুদূষণ, পরিবেশ ও খাদ্যাভ্যাস, ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যের কারণে শিশুরা মায়ের গর্ভ থেকেই জটিল রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। অকালে শিশুমৃত্যুর হারও বেড়ে চলছে। কারণ চিহ্নিত করে রোগ প্রতিরোধ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি জানান।

প্রবর্তক সংঘের দখলে বনের দেড় হাজার কোটি টাকার জমি

ইউজিসির তদন্তে আটকা আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে জনবল নিয়োগ

চট্টগ্রাম বন্দর চালাবে বিদেশিরা, কমিশন যাবে শেখ পরিবারে

চট্টগ্রামে চার ‘নিষিদ্ধ এলাকায়’ খুন আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

‘নিরপেক্ষ’ ৬৩৯ ওসির সন্ধানে পুলিশ সদর দপ্তর

বন পাহাড় জলাশয় সবই খায় আবুল খায়ের গ্রুপ

বাউলবাদ চর্চার নামে ইসলামবিদ্বেষ

এনসিপির দ্বন্দ্বে শুরুতেই হোঁচট তৃতীয় শক্তির

ভূমিকম্পের পর ট্রমায় ভুগছে নারী-শিশুরা

স্বর্ণালংকার ছাড়াও মিলেছে হীরা-মুক্তাসহ দামি পাথর