ভারতে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ‘হেট স্পিচ’
ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ‘হেট স্পিচ’ (ঘৃণামূলক বক্তব্য)। মুসলিমদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানরাও এখন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। মসজিদ, গির্জা ধ্বংসের আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার তথা হত্যার আহ্বান জানানো হচ্ছে হেট স্পিচগুলোতে।
২০২৫ সালে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ‘হেট স্পিচে’র ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৩০০-র বেশি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি। এর বেশির ভাগ ঘটনা ঘটেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অব অরগানাইজড হেটের (সিএসওএইচ) একটি প্রকল্প ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের (আইএইচএল) বার্ষিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের ২১টি রাজ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে প্রায় এক হাজার ৩১৮টি ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২৪ সালের তুলনায় ‘হেট স্পি’ বেড়েছে ১৩ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় ৯৭ শতাংশ। এ সময় ৬৬৮টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল।
জাতিসংঘে ‘হেট স্পিচ’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে এসব বক্তব্য শ্রেণিবদ্ধ করে আইএইচএল। এর মধ্যে রয়েছে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের ব্যবহার, সহিংসতা ও অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান, সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে বয়কটের আহ্বান, উপাসনালয় দখল বা ধ্বংস করার দাবি ও ভাষার অবমাননা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট এক হাজার ২৮৯টি হেট স্পিচের ৯৮ শতাংশই মুসলিমদের লক্ষ্য করে করা হয়েছে। আর ১৩৩টি ক্ষেত্রে হয়েছে খ্রিষ্টানদের সঙ্গে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি।
বেশির ভাগ ঘৃণামূলক বক্তব্য ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে ঘটেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সব ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনার প্রায় ৮৮ শতাংশ (১ হাজার ১৬৪) বিজেপিশাসিত রাজ্যে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটশাসিত রাজ্য এবং বিজেপিশাসিত অঞ্চলগুলোতে ঘটেছে। ২০২৪ সালে এই অঞ্চলগুলোতে রেকর্ড করা ৯৩১টি ঘটনার তুলনায় এটি ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া উত্তর প্রদেশে ২৬৬, মহারাষ্ট্রে ১৯৩, মধ্যপ্রদেশে ১৭২, উত্তরাখণ্ডে ১৫৫ এবং দিল্লিতে ৭৬টি সর্বাধিকসংখ্যক ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা দেশব্যাপী সব ঘটনার ৬৫ শতাংশ।
বিপরীতভাবে, বিরোধী দল বা জোটশাসিত সাতটি রাজ্যে ২০২৫ সালে ১৫৪টি ঘৃণামূলক বক্তব্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা ২০২৪ সালে এই রাজ্যগুলোতে নথিভুক্ত ২৩৪টি ঘটনার তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দল— উভয়ই উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ২৮৯টি ‘হেট স্পিচে’র ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এর পরেই রয়েছে অন্তর্রাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি) ১৩৮টি।
২০২৫ সালে নথিভুক্ত সব ঘৃণামূলক বক্তৃতার প্রায় অর্ধেক (৬৫৬টি ঘটনা) ‘লাভ জিহাদ’, ‘ভূমি জিহাদ’ এবং ‘জনসংখ্যা জিহাদ’-এর মতো ষড়যন্ত্রতত্ত্বকে উসকে দিয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে, ৩০৮টি বক্তৃতায় সহিংসতার স্পষ্ট আহ্বান ছিল। এর মধ্যে ১৩৬টিতে সরাসরি অস্ত্র ব্যবহারের আহ্বান ছিল।
২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, প্রধানত মুসলিমদের বয়কটের আহ্বান জানিয়ে ১২০টি বক্তব্য এবং মসজিদ, মাজার ও গির্জা অপসারণ বা ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়ে ২৭৬টি বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।
হেট স্পিচগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে খ্রিষ্টানদের লক্ষ্যবস্তু করা হলেও মূল টার্গেট মুসলিমরা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মুসলিমবিরোধী হেট স্পিচ ৯৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হেট স্পিচগুলো প্রধানত আসছে নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি এবং সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে। এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রায়ই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করছে।
উগ্রবাদী হিন্দুদের দাবি, ‘ভূমি জিহাদে’র মাধ্যমে মুসলিমরা হিন্দুদের জমি দখল করছে। ‘জনসংখ্যা জিহাদে’র মাধ্যমে মুসলিমরা কৌশলগতভাবে হিন্দুদের তুলনায় জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যাচ্ছে। ‘লাভ জিহাদে’র মাধ্যমে মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ব্যবহার করে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার ডাক দেওয়া হচ্ছে। মুসলমানদের ‘বয়কট’ থেকে শুরু করে উপাসনালয় (মসজিদ) ধ্বংস করা, অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া এবং সহিংস আক্রমণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে ধর্মান্তরকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আইন পাস করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ভারতের এই আইনকে বৈষম্যমূলক বলে উল্লেখ করেছে।
সম্প্রতি মুসলিমদের পাশাপাশি সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও হেট স্পিচের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। খ্রিষ্টানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিনের আগের দিন ক্ষমতাসীন বিজেপিসহ কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো মধ্য ভারতের রায়পুর শহরে হরতাল ঘোষণা করে। তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ, মুসলিমদের মতো তারাও জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছে। উগ্রবাদী হিন্দুরা এ সময় খ্রিষ্টানদের চার্চে ব্যাপক হামলা চালায়। পুলিশ ৩০-৪০ জন অজ্ঞাত হামলাকারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। কিন্তু গ্রেপ্তার করা হয় মাত্র ছয়জনকে। তারা সবাই আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। তাদের ফুল দিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা বরণও করে নেয়, যার ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বড়দিনের সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে একটি ক্যাথলিক চার্চে যান, কিন্তু বড়দিন উপলক্ষে খ্রিষ্টানদের ওপর চালানো সহিংসতার কোনো নিন্দা জানাননি। বড়দিন উপলক্ষে ভারতজুড়ে বিশেষ করে রাজধানী দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ, আসাম, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং ছত্তিশগড়ে খ্রিষ্টানদের ওপর ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব রাজ্যে খ্রিষ্টানদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছেন অনেক খ্রিষ্টান। এসব আক্রমণের সঙ্গে বিজেপির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘসহ (আরএসএস) অন্যান্য উগ্রবাদী হিন্দুরা জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ধর্মীয় ঘৃণার বিরুদ্ধে রীতিমতো সংগ্রাম করছে। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিজেপির আদর্শিক পরামর্শদাতা আরএসএস বিশ্বাস করে, ভারতকে অবশ্যই একটি হিন্দু জাতি হতে হবে। হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের আদর্শিক নেতা বিনায়ক সাভারকর এবং এমএস গোলওয়ালকরকে প্রকাশ্যে সম্মান জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই দুই আদর্শিক নেতা প্রকাশ্যেই বলেন, মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের মতো সংখ্যালঘুরা ভারতে অবাঞ্ছিত এবং তারা ভারতের শত্রু। মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে স্থায়ী যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন এই দুই আদর্শিক নেতা।
দ্যা সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অব অরগানাইজড হেট (সিএসওএইচ)-এর রফিক নায়েক আলজাজিরাকে বলেছেন, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যগুলো বলছে— মুসলিম এবং খ্রিষ্টানদের দ্বৈত হুমকি হিসেবে মনে করছে হিন্দুত্ববাদীরা। তারা বলছে, এই দুই সম্প্রদায় বিদেশি পৈশাচিক শক্তি, যারা হিন্দুদের ক্ষতি করতে চায়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হেট স্পিচ ঘটনায় জড়িতদের বেশিরভাগই বিজেপির সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়া ১০টি হেট স্পিচের মধ্যে ৯টিই বিজেপি ও তাদের সহযোগীরা ঘটাচ্ছে। হেট স্পিচের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ ১০ জনের পাঁচজনই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। এদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির নাম উল্লেখযোগ্য।
ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রচারে কাজ করা একটি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর দ্যা স্টাডি অবসোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের সভাপতি রাম পুনিয়ানি আলজাজিরাকে বলেছেন, ধর্মীয় হেট স্পিচ সরাসরি বিজেপির নির্বাচনি ভাগ্যের সঙ্গে জড়িত। এটা সত্যিকার অর্থেই একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ, হেট স্পিচ দিনশেষে সহিংসতার দিকে পরিচালিত হয়।