পতিত আওয়ামী সরকারের ষড়যন্ত্রে ক্ষতিগ্রস্ত মাদরাসা শিক্ষাকে গতিশীল করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। তবে আওয়ামী সুবিধাভোগী চক্রের ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন জটিলতায় বিঘ্ন ঘটছে সে উদ্যোগে।
বিশেষ করে ঠিকানাবিহীন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত প্রক্রিয়ায় আড়াই মাসের বেশি সময় ধরে আটকে আছে জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া। এতে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন পরিকল্পনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে, আওয়ামী সরকারের সময় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো উদ্যোগ নেই। ইউজিসি থেকে তদন্ত করা হলেও রিপোর্ট অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তৎকালীন প্রশাসন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে পুরোনো দুর্নীতিবাজ ও আওয়ামী সুবিধাভোগীরা মিলে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী পরিচয়ে আব্দুল হান্নান নামে এক ব্যক্তি শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নজিরবিহীন দলীয়করণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিতকরণ, অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ’ শীর্ষক তিন পৃষ্ঠার ওই অভিযোগে অভিযোগকারীর কোনো পূর্ণ পরিচয়, ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর নেই। এতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামছুল আলম, ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ আলীসহ বেশ কয়েকজনের নাম জড়িয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়।
ওই অভিযোগের বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা উপদেষ্টার দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী অভিযোগটি আমলে নিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সহকারী সচিব নাঈমা খন্দকার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর। এতে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে তদন্তপূর্বক সুপারিশসহ মতামত দেওয়ার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।
এদিকে গত ১১ সেপ্টেম্বর ইউজিসির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত পত্র মারফত ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদ ও উপউপাচার্য মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে মাদরাসা পরিদর্শন অধিভুক্তি, প্রাথমিক পাঠদান অনুমোদন এবং নিয়োগ প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য ঘুস দাবির বিষয়টি তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনকে অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় জনবল নিয়োগে অনিয়মসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশ হলে এ বিষয়ে কমিশন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বিতর্ক এড়াতে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া সব পদের জনবল নিয়োগ আপাতত স্থগিতের জন্য অনুরোধ করা হয়।
সূত্রমতে, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রশীদ ও উপউপাচার্য মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদের দুর্নীতি তদন্তে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমানকে আহ্বায়ক করে প্রথমে ১৮ আগস্ট তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরে ফ্যাসিবাদী দোসরদের বিতর্কিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইউজিসি থেকে ৯ সেপ্টেম্বর ওই কমিটি পুনর্গঠন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। এছাড়া কমিটির টার্মস অব রেফারেন্স পরিবর্তন করে আগের উপাচার্য ও উপউপাচার্যের দুর্নীতির পাশাপাশি সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোও যুক্ত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কমিটির চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত গত এক বছরের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এজন্য এ তদন্তের উদ্দেশ্য নিয়ে তারা সন্দিহান। তবে আগামী রোববার সরেজমিন ডাকা বৈঠকে আগের সরকারের সময়ের দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আভাস দিয়েছেন।
আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগে জানা গেছে, যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে ইউজিসির অনুমোদনসাপেক্ষে সেকশন অফিসারসহ প্রায় ৮০ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে প্রায় ছয় হাজার প্রার্থী আবেদন করেন। কিন্তু আগের মতো নিয়োগ বাণিজ্যের সুযোগ পুরো বন্ধ করে দেওয়ায় মাদরাসা শিক্ষকদের একটি সংগঠন ও পত্রিকা বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যসহ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থাকা বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ দিয়ে মূলত তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের এনে ফের দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য বানাতে চায়। তাছাড়া বিগত দিনের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তও যাতে ঠিকমতো না হতে পারে, সেজন্য এসব ষড়যন্ত্র চলছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম আমার দেশকে বলেন, বেনামি অভিযোগ আমলে না নেওয়ার বিষয়ে সরকারের পরিপত্র আছে। অথচ নিয়োগ বাণিজ্য ও দলীয়করণের বেনামি ও ভিত্তিহীন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন এবং নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে, যা অমানবিক। আসলে নিয়োগ বন্ধ রাখার জন্যই এ ধরনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে।
জনবল নিয়োগ না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য নতুন জনবল জরুরি। তদন্তের নামে দীর্ঘ আড়াই মাসের বেশি সময় ধরে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চরম জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া নিয়োগ পরীক্ষার আগের দিন তা স্থগিত করায় আবেদনকারী প্রায় ছয় হাজার প্রার্থীর মাঝেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। আরবি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির সম্মিলিত শিক্ষার্থী ফোরাম।
ইউজিসি গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার আমার দেশকে বলেন, আমাদের তদন্তকাজ একটা পর্যায়ে চলে এসেছে। আগামী রোববার আমরা সরেজমিন যাব। এরপর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রিপোর্ট জমা দেব। এতে মূল ফ্যাক্ট তুলে ধরা হবে।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসি থেকে আমাদের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বিভিন্ন সাপোর্টিং বিষয়গুলো দিয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুদক থেকে একের পর এক অভিযোগ আসছে।
এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আবুল কালাম সরকার বলেন, নাম-ঠিকানাবিহীন এবং নাম দেওয়া ব্যক্তিদের অভিযোগ আছে। আমরা সেগুলো আমলে নিচ্ছি।
তবে অভিযোগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের দরকার নেই জানিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ের তদন্ত রিপোর্টও আমাদের পর্যবেক্ষণে থাকবে। তবে তাতে অনেক গ্যাপ আছে।