হোম > আমার দেশ স্পেশাল

২৬ মার্চ ঘিরে প্রত্যাবর্তনের ছক নিষিদ্ধ আ.লীগের

ওয়াসিম সিদ্দিকী

আগামী স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে- এমন আভাস মিলছে বিভিন্ন সূত্রে। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দিনটিকে ঘিরে সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। যদিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো দলের প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা দিবসের আবেগ ও জাতীয় চেতনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনীতিতে ফেরার সুদূরপ্রসারী ও বিতর্কিত পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দলটির নীতিনির্ধারকরা দিল্লি ও দেশের বিভিন্ন গোপন আস্তানা থেকে মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের সক্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। উদ্দেশ্য, ২৬ মার্চের প্রাক্কালে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে রাজনীতির ময়দানে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেওয়া। তবে পুলিশপ্রধান ইতোমধ্যে বলেছেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালানোর কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া জুলাইয়ের পক্ষ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোও এ ইস্যুতে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে। ফলে স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক উইং খুবই সক্রিয়। তারা জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকারকে টার্গেট করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা লুৎফর রহমান রিটনের একটি গানকে ‘জয় বাংলার গান’ নামে চিত্রায়ন করেছে। এতে মুজিবের মূর্তি ও ভাস্কর্য, গণভবন এবং ৩২ নম্বর ভাঙাসহ বিভিন্ন দৃশ্য রয়েছে।

মাঠপর্যায়ে ‘অফিস খোলার’ গোপন মহড়া

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের পরিত্যক্ত বা সিলগালা হওয়া দলীয় কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলার চেষ্টা চলছে। এ পর্যন্ত দেশের অন্তত ৩৯টি স্থানে প্রতীকীভাবে কার্যালয় খুলে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, রাজশাহী, যশোর, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, গাইবান্ধাসহ অন্তত ১৫ জেলায় ঝটিকা মিছিল ও কার্যালয়ের সামনে পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়েছে।

কয়েক দিন আগে খুব ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে দলীয় কার্যালয়ের ভাঙা গেটের সামনে মহিলা লীগের কয়েকজন সদস্য হাতে লেখা একটি ফেস্টুন ধরে ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেন। ছয়-সাতজন নারী স্বল্প সময়ের জন্য সেখানে অবস্থান করে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের নামে স্লোগান দিয়ে দ্রুত সটকে পড়েন। এর আগে গুলিস্তানের দলের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে চুপিসারে কয়েক ব্যক্তি একটি পতাকা টাঙিয়ে দেন। পরে অবশ্য ওই পতাকা সেখানে আর দেখা যায়নি। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলা হলেও প্রায় সব জায়গায়ই বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার ক্ষোভের মুখে আবার বন্ধ হয়ে যায়।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ২৬ মার্চের আগে অন্তত একবারের জন্য হলেও প্রতিটি জেলা-উপজেলায় কার্যালয় খুলে উপস্থিতির বার্তা দিতে চায় আওয়ামী লীগ।

দিল্লির বার্তা ও ২৬ মার্চের মাস্টারপ্ল্যান

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ২৬ মার্চের কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পলাতক মাঝারি ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের কৌশল হলো, দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তার হওয়া। এরপর জেলখানাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের আবেগ জাগিয়ে তোলা এবং আদালতের বারান্দায় হাজির হওয়ার সময় গণমাধ্যমের একাংশকে ব্যবহার করে একটি ‘মজলুম’ ইমেজ তৈরি করা। এছাড়া জেলে থাকা নেতাদের ঘিরে নিজ বলয়ের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করা এবং পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত জেলখানায় গিয়ে দেখা করার মাধ্যমে দলীয় যোগাযোগ বাড়ানো। আদালতে বিচার চলাকালীন পরিবেশ এবং আদালত থেকে কারাগারে আনা-নেওয়ার পথে তৈরি হওয়া নানামুখী আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু পত্রিকা ও টিভি চ্যানেল আবেগধর্মী রিপোর্ট প্রকাশ করা ইত্যাদি।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ২৬ মার্চকে বেছে নেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাওয়া। তবে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত এবং নিবন্ধন বাতিল হওয়া একটি দলের এমন তৎপরতাকে আইনিভাবে অপরাধ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সাদ্দাম ইস্যু ও মিডিয়া ট্রায়ালের ‘ভয়ংকর’ কৌশল

সম্প্রতি বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের ঘটনাটি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিশেষ নজরে এসেছে। বাগেরহাটের একটি উপজেলার ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি করা কয়েকটি গণমাধ্যমের পরিকল্পিত বয়ানের বিষয়ে সূত্রগুলো বলছে, সে সময় মূল ধারার বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম এ বিষয়ে মজলুম ইমেজকে ব্যবহার করে সংবাদটি প্রচার করে। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণা ছিল। অথচ ওই সাদ্দাম তার নিজ এলাকায় ত্রাস হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে একপর্যায়ে ওই উগ্র ছাত্রলীগ নেতা ও একাধিক মামলার আসামি সাদ্দাম জামিন পেয়ে যান। অথচ কারা কর্তৃপক্ষ সে সময় জানিয়েছিল, উগ্রতার কারণে কারাগারেও সাদ্দামকে আলাদা স্থানে রাখতে হয়েছিল।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো বলছে, এই সাদ্দামকে ঘিরে গণমাধ্যমের একটি অংশ যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছিল, তাতে একপর্যায়ে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিতে বাধ্য হয়। এতে বলা হয়, কারাবন্দি ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের পক্ষ থেকে প্যারোলের আবেদন না করায় তাকে সাময়িক সময়ের জন্য মুক্তি দেওয়া যায়নি। বরং সরকারের পক্ষ থেকে মানবিক বিবেচনায় কারাগারে লাশ নেওয়া হয় সাদ্দামকে দেখানোর জন্য। আইনানুগভাবে তৎকালীন সরকারের কোনো ত্রুটি না থাকলেও গণমাধ্যমের একটি অংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন প্রচার ও অপপ্রচারের কারণে সরকারের জন্য কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, বিদেশ থেকে দেশে ফিরে নেতারা জেলে গেলেও বহুমুখী কৌশলে আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান ও জনমত তৈরিতে রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক কৌশলে কাজ করবেন ভারতীয় আশীর্বাদপুষ্ট কিছু টকশো বক্তা, কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু বয়ান উৎপাদনকারী।

বিদেশি লবিং ও কূটনৈতিক তৎপরতা

এদিকে, রাজনীতির মাঠের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা হাইপ্রোফাইল নেতারা। সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী ভারত ও রাশিয়ার মতো দলের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে। তাদের মূল বয়ান হলো- একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। আওয়ামী লীগকে স্পেস দেওয়া না হলে ভারতের শক্তিশালী লবিস্ট গ্রুপকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বর্তমান সরকারকে ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রমাণের চেষ্টা চালানো হবে। বহির্বিশ্বে ভারতের লবি কাজে লাগিয়ে খুব দ্রুত রাজনীতিতে ফিরতে চায় পতিত ও গণহত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ।

যা বলছে পুলিশ ও বিএনপি

আওয়ামী লীগের এ তৎপরতা নিয়ে সদ্যবিদায়ী পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বা কর্মসূচি চালানোর কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব ও বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ ইস্যুটি সম্পূর্ণ আইনের আওতায় দেখা হচ্ছে।

সিদ্ধান্তহীনতায় সরকার

আওয়ামী লীগের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে- এ বিষয়ে এখনো সরকারিভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে উচ্চপর্যায়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র আমার দেশকে নিশ্চিত করেছে। উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের এ গোপন পরিকল্পনার কথা একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছে। সরকার এখনো চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণ করেনি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।

আইনজ্ঞদের মতে, নিবন্ধন বাতিল ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর দলকে পুনরায় সক্রিয় করতে হলে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণে বিকল্প নেই। আদালতের রায় বা সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ করে রাখা হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ও দেশীয় অনুমোদনপ্রাপ্ত আইনের আওতায় এবং আগেই নির্বাচন কমিশন থেকে দলটির নিবন্ধনও বাতিল হয়েছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২৬ মার্চের মতো আবেগঘন দিনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে জনমত আকর্ষণ করার চেষ্টা আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে।

আশ্রয়-খাদ্য সংকটে মানবেতর জীবন লেবানন প্রবাসী বাংলাদেশিদের

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জে নতুন সরকার

জ্বালানি সংকটে ৬৫ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত

চট্টগ্রামে গাড়ি কমেছে ৩০ শতাংশ, ভাড়া বেড়েছে ৪০ ভাগ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি আলোচনায় ‘অগ্রগতি’

জামায়াত ও কওমি দ্বন্দ্বের সিলসিলা

আওয়ামী আমলের পুরোনো পোশাকে ফিরতে চায় পুলিশ

পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা, নেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ

দিল্লির ‘আতিথেয়তায়’ দিল মজেছে হাসিনার, ছাড়তে নারাজ ভারত

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা