* মহিউদ্দিন ৫ কোটি টাকার মাল আত্মসাৎ করছে, আমাকে ২ কোটি দিলে বিলে সই করব
* দুদকে আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ আছেÑদাবি প্রকৌশলীর
* ঘটনা সত্য হলে নিউজ করে দেন, কর্তৃপক্ষ সাসপেন্ড করলে একটু বিশ্রাম পাব
* আমি টাকা নিলে আপনি মাইন্ড করবেন? টাকা নিলে কিন্তু কাউকে ফেরত দিই না
‘আমার টাকা নেওয়ার ভিডিও প্রচার করলে আমার জন্য ভালো হতো। তাহলে কর্তৃপক্ষ আমাকে সাসপেন্ড করবে, আমি একটু বিশ্রাম নিতে পারব’—নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুস ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমীন। ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও নিয়ে তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রথমে সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে ভিডিওর আংশিক চিত্র দেখানো হলে সেটি প্রচারের জন্য আমার দেশের প্রতিবেদকের সহযোগিতা চান তিনি।
সম্প্রতি নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের কয়েকজন ভুক্তভোগী ঠিকাদার। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদারদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা নেন তিনি। কেউ দাবিকৃত টাকা দিতে ব্যর্থ হলে কাজের বিল আটকে দেওয়া হয়।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমার দেশ টাকা নেওয়ার একটি ভিডিও ক্লিপ পেয়েছে। ওই ভিডিওতে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে নুরুল আমীনকে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা নিতে দেখা যায়। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি টাকা নিলে আপনি কি মাইন্ড করবেন? আমি কিন্তু টাকা নিলে কাউকে ফেরত দিই না।’
নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ভুক্তভোগী ওই ঠিকাদার আমার দেশকে বলেন, লক্ষ্মীপুর পৌরসভার একটি লাইনের প্রায় ১৫ লাখ টাকার কাজের জন্য প্রথমে তার কাছ থেকে ৫ শতাংশ কমিশন নেওয়া হয়। কাজ শেষ হওয়ার পর বিল চূড়ান্ত করার আগে আরো সাড়ে ৪ লাখ টাকা দাবি করা হয়। ওই টাকা না দিলে বিল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই ঠিকাদার।
ঠিকাদারের দাবি, একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে তিনি ধাপে ধাপে দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করেন। সবশেষে ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দেওয়ার দৃশ্যই ভিডিওতে ধারণ করেছেন আরেক ঠিকাদার।
ভিডিওটি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট অফিসের ডরমেটরিতে ধারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আমীন নিয়মিত এই ডরমেটরিতেই অবস্থান করেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ঠিকাদারদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ঠিকাদারি কাজ ও বিলসংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে অর্থ আদায়ের ঘটনাও এই ডরমেটরিতে ঘটে থাকে।
ভিডিওটির বিষয়ে নুরুল আমীনের বক্তব্য জানতে চাইলে প্রথমে তিনি সেটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে ভিডিওর আংশিক চিত্র দেখানোর পর তার অবস্থান বদলে যায়। তিনি আমার দেশকে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে মামলা করুক। আপনি আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে সেটা দুদকে দেন। তাহলে দুদক আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আমার প্রশাসন আমাকে এখান থেকে সাসপেন্ড করে দেবে। আমি চাচ্ছি চাকরি থেকে সরে যেতে। আমার শরীর ভালো না। আমি বাসায় বিশ্রাম নিতে পারব।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার ভিডিওটা আপনি প্রচার করলে ভালো হতো। তাহলে আমি আমার স্যারকে বলতে পারতাম—স্যার, আমি অযোগ্য লোক, আমাকে দয়া করে এখান থেকে সরিয়ে দেন। আপনি নিউজ করলে আমার জন্য ভালো হবে।’
‘২ কোটি দিলে বিলে সই করব’
আমার দেশ-এর হাতে থাকা ভিডিও ক্লিপে নুরুল আমীনকে বারবার ‘মহিউদ্দিন’ নামে একজন ঠিকাদারের প্রসঙ্গ তুলতে দেখা যায়। সেখানে তার বক্তব্য অনুযায়ী, মহিউদ্দিনের প্রায় ৫ কোটি টাকার একটি বিলের বিপরীতে তাকে ২ কোটি টাকা দেওয়া না হলে তিনি ওই বিলে সই করবেন না বলে জানাচ্ছেন।
ভিডিওতে নুরুল আমীনকে বলতে শোনা যায়, ‘মহিউদ্দিন ৫ কোটি টাকার মাল আত্মসাৎ করছে—আমাকে ২ কোটি টাকা দিলে আমি বিল সই করে দেব।’
ভিডিওর আরেক অংশে নুরুল আমীনকে বলতে শোনা যায়, ‘মহিউদ্দিনের পজিটিভের বিল আটকায় দিয়েছি। ১২ হাজার কোটি টাকার বিল.. আমার একটি জেলার ছোট প্রকৌশলী, তার ১২ হাজার কোটি টাকার বিল আটকে দিয়েছি। তাহলে বুঝেন আমার পাওয়ার কত! আমার অনুমতি ছাড়া পিডি কোনো বিল দেবে না।’
তবে ভিডিওতে তার বলা ‘১২ হাজার কোটি টাকার বিল’ সংক্রান্ত বিষয়টি যাচাই করা যায়নি।
এদিকে মহিউদ্দিন নামের ওই ঠিকাদারের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। মহিউদ্দিনের বিষয়ে প্রকৌশলী নুরুল আমীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার পরিচয় দিতে অস্বীকৃতি জানান।
আরো অভিযোগ ঠিকাদারদের
একাধিক ভুক্তভোগী ঠিকাদার আমার দেশকে জানান, প্রায় তিন বছর আগে লক্ষ্মীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন নুরুল আমীন। তাদের অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন দাবি, বিল আটকে রাখা এবং অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে।
ঠিকাদারদের আরো অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর থেকে নোয়াখালী প্রধান সড়কের ৩৩ কেভি লাইন সংস্কারের পর পুরোনো লাইনের বিভিন্ন মালামাল, পিলার ও টাওয়ার ও তার বেহাত হয়েছে। তাদের দাবি, নুরুল আমীনের সহযোগিতায় এসব মালামাল বেহাত হয়েছে এবং এর বিনিময়ে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছেন।
তবে ঠিকাদারদের এসব অভিযোগ এবং পুরোনো বৈদ্যুতিক মালামাল বেহাত হওয়ার সঙ্গে নুরুল আমীনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার বিরুদ্ধে দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান বা তদন্তেই এসবের সত্যতা নির্ধারিত হবে।