কর্মচঞ্চল মহানগরী ঢাকায় প্রতিদিন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট। প্রতিদিনের যানজট রাজধানীবাসীর ক্ষোভ, বিরক্তি ও দৈনন্দিন দুর্ভোগের অন্যতম প্রধান কারণ। এর কারণে অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতাল—কোথাও সময়মতো পৌঁছানো ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। যানজটে প্রতিদিন হারিয়ে যাচ্ছে অগণিত কর্মঘণ্টা, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ।
রাজধানীতে প্রবেশের চারটি প্রধান পথেই প্রতিদিন লেগে থাকে দীর্ঘ যানজট। কর্মস্থল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে কাটাতে হচ্ছে। এ যানজট কখনো কখনো নগরীর সীমা পেরিয়ে ১০-১৫ কিলোমিটার দীর্ঘও হয়ে যায়। এসব যানজটে আটকে পড়লে সহজে মুক্তি মেলে না। বিশেষ করে রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে পড়লে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে ভয়াবহ—কখনো কখনো প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
যানজটের কারণে স্বাভাবিক সময়ে যা ১০ মিনিটের পথ, সেখানে সময় লেগে যায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা। যানজট নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও বাস্তব চিত্রে তেমন স্বস্তি মিলছে না। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, আনসারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে হিমশিম খেতে হয়। বিশেষ করে স্কুলসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুরু ও ছুটির সময় যানজট আরো তীব্র হয়। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সিএনজি, রিকশা ও বাসের ভাড়াও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
দিনের এ যানজট অনেক সময় রাত পর্যন্তও দীর্ঘ হয়। রাজধানীর অন্যতম প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ীতে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ রূপ নেয় যানজট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, জনপদ মোড় ও ধোলাইপাড় সড়ক থেকে প্রায় এক হাজার ৪০০ বাস দেশের বিভিন্ন রুটে ছেড়ে যায়। সন্ধ্যার পর একদিকে ঢাকায় প্রবেশকারী বাস, অন্যদিকে দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ায় সৃষ্টি হয় সীমাহীন দুর্ভোগ।
এমন চিত্র শুধু যাত্রাবাড়ীতেই নয়—মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ ও রামপুরাসহ রাজধানীর বহু এলাকায় নিয়মিত দৃশ্য। ঢাকার ৬০০ ট্রাফিক পয়েন্টের মধ্যে রাত ২টার পর মাত্র ৯টিতে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করে। ফলে দিনের দীর্ঘ যানজট গভীর রাত পর্যন্তও স্থায়ী হয়।
কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, আমিনবাজার ও বাংলামোটরে রাতে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপ প্রবেশ করায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। মালিবাগ মোড় থেকে কুড়িল বিশ্বরোড পর্যন্ত সড়কে সারা রাতই যান চলাচল ধীর থাকে। রামপুরা ব্রিজের পাশে বাঁশের দোকান ও মিরপুর-শাহআলীর কাঁচাবাজার রাতভর চালু থাকায় সেসব এলাকাতেও যানজট লেগেই থাকে।
এছাড়া বিভিন্ন বিক্ষোভ-সমাবেশের কারণেও ঢাকাবাসী ভয়াবহ যানজটের স্বাদ পায়। ঢাকার সড়কগুলোর অবস্থানগত নকশার কারণে ঢাকার কোনো এক প্রান্তে যানজট হলে তার প্রভাব পৌঁছে যায় নগরীর অন্য প্রান্তেও।
সংশ্লিষ্ট সংস্থা-সংগঠনগুলোর বক্তব্য
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতে, যত্রতত্র পার্কিং, যেখানে-সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো, ফুটপাত দখল, গাড়ির তুলনায় রাস্তার সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপকদের অদক্ষতা, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাব, আইনের বাস্তবায়ন না হওয়া, রাজধানীকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা স্থাপন এবং অফিস-আদালত ঢাকাকেন্দ্রিক বাড়তে থাকায় যানজটও ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে যাচ্ছে।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, ঢাকায় বাড়ছে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি, অটোরিকশা, রিকশা, মোটরসাইকেলের সংখ্যা। সড়কের তুলনায় যানবাহনের মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যাধিক্য এবং অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলই যানজট বাড়ার অন্যতম কারণ। আর এসব অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করায় তারা পুলিশ ছাড়া কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে না। যার ধকল পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
সিটি করপোরেশন আরো জানায়, রাজধানীর প্রায় ৫০ শতাংশ সড়ক ও ফুটপাত অবৈধ পার্কিং, হকার ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে মূল সড়কে হাঁটে, ফলে যানজটের সঙ্গে যুক্ত হয় জনজট। কোথাও কোথাও মূল সড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ দোকান ও খাবার হোটেল, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
একটি রিপোর্টে দেখা যায়, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ জায়গা দখলে রাখে প্রাইভেট কার। ফলে তৈরি হয় ভয়াবহ যানজট। সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় নগরীতে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহন খাতে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা যানজটের একটি বড় কারণ।
নগর পরিকল্পনার বড় দুর্বলতা
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার দেশকে বলেন, ট্রাফিক জ্যাম কমাতে কোনো বড় প্রকল্প নেই। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনার ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘক্ষণ যানজটে বসে থাকলে মানসিক চাপ, বিরক্তি ও শারীরিক ক্লান্তি বাড়ে, যা স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যার অর্থমূল্য তৈরি করা অসম্ভব। একটি আধুনিক শহরের জন্য মোট এলাকার অন্তত ২০ শতাংশ সড়ক থাকা প্রয়োজন, অথচ ঢাকায় তা ৭ শতাংশেরও কম।
তিনি আরো বলেন, একটি উন্নত ও সচল শহরের জন্য পর্যাপ্ত রাস্তাঘাট অপরিহার্য, যা ঢাকার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। ফলে যানজটসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, যা নগর পরিকল্পনার দুর্বলতা প্রকাশ করে।
সমাধানে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নগর পরিকল্পনাবিদরা যানজট নিরসনে আমার দেশ-এর কাছে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে তারা গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরানো, ফিটনেসবিহীন বাস অপসারণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের জন্য পৃথক পরিবহনব্যবস্থা, জোড়-বিজোড় ভিত্তিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল, রাস্তায় অবৈধ পার্কিং বন্ধ, নগর পরিবহনের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, সড়কে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করা, সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী আন্তঃটার্মিনাল সংযোগ তৈরি, নগরীর ট্রাফিক রুট পুনর্বিন্যাস, সড়ক ব্যবস্থাপনায় অধিক গুরুত্বারোপ, প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রত্যাহার, যানজট নিরসনে স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, বিআরটিসিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করে একক কোম্পানির মাধ্যমে নগরের বাস পরিষেবা চালু করা এবং ডিটিসিএর মাধ্যমে সমন্বিত মনিটরিং ব্যবস্থার সুপারিশ করেছেন।
ডিএমপির অবস্থান
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) বলেছে, যানজট কমাতে প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো পাবলিক ট্রান্সপোর্টের উন্নয়ন। গণপরিবহনকে গুচ্ছ মালিকানা ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা। একই রুটে এক কোম্পানির গাড়ি চলাচল করবে। চালক ও সহযোগীদের বেতন নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। সরকার এদিকে নজর দিলে যানজটের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডিসি মিডিয়া মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত কাজ করছে ডিএমপি। সম্প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনে পরীক্ষামূলক ডাইভারশন চালু করা হয়েছে, এতে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে।