হোম > আমার দেশ স্পেশাল

২৬ বছরে দেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ

গাজী শাহনেওয়াজ

বাংলাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার বাড়ছে। এক বছরে নতুন করে ১ হাজার ৮৯১ জন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৫৩ জন বেশি। ২০০০ সালের পর থেকে এটিই দেশে এখন পর্যন্ত এইচআইভি সংক্রমণের হার সর্বোচ্চ। একই সময়ে এইডস-সম্পর্কিত অসুস্থতায় ২৫৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণার তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের পরীক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টি জেলায় এইচআইভি পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ সেবা রয়েছে। বাকি ৪১ জেলায় পর্যাপ্ত পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে যশোর জেলায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত রোগী সনাক্ত হয়েছে। এর পর নাটোর জেলায়। তৃতীয় সনাক্তকারী সীমান্তবর্তী জেলা চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সোনা মসজিদ এলাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, আগে স্কিনিং কম হতো, বর্তমানে বেশি হওয়ায় সংখ্যা বাড়ছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. খালিদ সাইফুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, পূর্বে ব্লাড ক্রস ম্যাচিং এবং এইচআইভি স্ক্রিনিং টেস্ট সঠিকভাবে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে করা হতো না। বর্তমানে এসব পরীক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়ায় এবং পরীক্ষার পরিধি বাড়ায় রোগী বেশি শনাক্ত হচ্ছে। ব্যাপকভিত্তিতে পরীক্ষা চালানো হলে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানান তিনি। চলমান জরিপ ও পরিদর্শনের হালনাগাদ তথ্যের বিষয়ে ডা. খালিদ সাইফুল্লাহ আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের জরিপ কাজ ও সরেজমিনে পরিদর্শন অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে যশোর জেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি নাটোর এলাকাতেও কিছু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্তবর্তী সোনা মসজিদ এলাকাতেও এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে বলে আমার দেশকে জানান তিনি। এ সময় মাঠ পর্যায়ে জরিপ ও পরিদর্শন শেষে আগামী ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত রিপোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানান তিনি।

সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ও জাতীয় পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন সংক্রমণ মূলত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি ঘনীভূত হচ্ছে। পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত পুরুষ (এমএসএম), ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে এসেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভির বিস্তার ঐতিহাসিকভাবে ০ দশমিক ০১ শতাংশের নিচে রয়েছে। তবে সংক্রমণ মূলত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে রয়েছেন ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্কে লিপ্ত পুরুষ, নারী যৌনকর্মী, ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী এবং অভিবাসী শ্রমিকসহ কয়েকটি জনগোষ্ঠী।

গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, এসব জনগোষ্ঠীর কাছে প্রতিরোধমূলক সেবা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্তভাবে পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক বৈষম্য, তথ্যের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশের প্রতিবন্ধকতার কারণেও অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তে বিলম্ব হতে পারে।

সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় ২০২৫ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আনুমানিক ১৭ হাজার ৪৮০ জন এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সূত্রে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ৩১৩টি নিবন্ধিত রোগীর তথ্য রয়েছে।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে গবেষণাটি কিছু অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেছে। তবে আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি রয়েছে। ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এইচআইভিতে আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশকে রোগ সম্পর্কে জানতে হবে, তাদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে এবং চিকিৎসা গ্রহণকারীদের ৯৫ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

এইডস রোগী কেনো বাড়ছে, - এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিজি হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী আমার দেশকে বলেন, জটিল ও সংক্রমিত রোগটির বিষয়ে আমাদের দেশে গবেষণা হচ্ছে না। এটা বাড়ার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, আগে যেখানে ৫০০ জন সনাক্ত হতো, বর্তমানে তা বেড়ে দ্বিগুন হয়েছে। অনেক রোগী সনাক্ত হলেও সরকার থেকে যে ওষুধ তাকে দেওয়া হয়, অনেক ক্ষেত্রে তা খেতে চায় না। এটাও একটা কারণ। তাই সঙ্গতভাবেই, রোগী বাড়ছে। অপরদিকে, এইডস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিদেশী সহায়তা কমছে। এখনিই বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগ না নিলে এইডস এর বিস্তার ঘটতে থাকবে। তখন নিয়ন্ত্রন করা আরও কঠিন হবে সরকারের জন্য বলে আগাম সতর্ক করেছেন এই অভিজ্ঞ চিকিৎসক।

বাংলাদেশের পঞ্চম জাতীয় এইচআইভি ও এইডস কৌশলগত পরিকল্পনা ২০২৪-২০২৮ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসেবে অবসানের বৈশ্বিক লক্ষ্য সামনে রেখে দেশীয় কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। পরিকল্পনায় প্রতিরোধ, রোগ শনাক্ত, চিকিৎসা এবং গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা সম্প্রসারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ব পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউএনএইডসের ২০২৬ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছিলেন। ওই বছর নতুন করে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ এইডস-সম্পর্কিত অসুস্থতায় মারা যান। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ মানুষ অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসা গ্রহণ করছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সংক্রমক ব্যাধী হাসপাতালের গবেষক ডা. শ্রীনিবাস পাল আমার দেশকে বলেন, নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ যৌন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা উপকরণ সরবরাহ। তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমের ফলে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলে তাঁর ধারণা। একই ধরনের কার্যক্রম অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন পরিবেশে পরিচালনা করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রসঙ্গে ডা. শ্রীনিবাস পাল বলেন, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরের পরিস্থিতি জনঘনত্ব ও অন্যান্য বাস্তবতার কারণে আলাদা। তাই ওই এলাকার পরিস্থিতিকে দেশের সামগ্রিক এইচআইভি পরিস্থিতির সঙ্গে একভাবে বিবেচনা না করে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বন্দর থেকে ভোক্তা, নিত্যপণ্যের কেজিতে বাড়ে প্রায় ৫০ টাকা

পাঁচ ছাত্র সংসদের পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা

শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি দেয়নি ভারত

সারা দেশে বেড়েছে খুন, সাত মাসে ২০৭৬ হত্যা

সার সংকট নিয়ে আতঙ্কের মধ্যেই মাঠপর্যায়ে অভিযান

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধসে বিপুল প্রাণহানি

শিল্পের চাকা সচল রাখতে গ্যাস রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি

সার সংকটে কৃষকের কাহিল অবস্থা, উৎপাদন ব্যাহত

গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে নাকাল মানুষ